Jagonews24
মারকুইজ স্ট্রিটের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছি। আরও সহজ করে বললে কস্তুরির সামনে। লেইনের ফাঁকা জায়গাগুলো সাদা ট্যাক্সির দখলে। এগুলো মারুতি ব্র্যান্ডের। ইশারা দিলেই গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। কিন্তু আমার তো মন আটকে আছে হলুদ ট্যাক্সিতে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই একসঙ্গে কয়েকটা হলুদ ট্যাক্সি হাজির। এক চালকের সঙ্গে আলাপ চললো। ভিক্টোরিয়া পার্কে যেতে ১৮০ রুপি চাইলেন। শেষ পর্যন্ত ১৬০ রুপিতে রাজি হলেন। তবে ট্যাক্সির অবস্থা শোচনীয়। মধ্য দুপুরটাই মগজ গলা গরম। গাড়িতে নেই এসি। চালকের মুখের সামনে ছোট্ট একটা ফ্যান ঘুরছে। মিটার দেখেও ভাড়া অনুমানের সুযোগ নেই। ভাঙাচোরা মিটার, তা থাকার চেয়ে না থাকাই শ্রেয়। জানালা খুলে দিয়ে গাড়ি চালানোর অনুরোধ করলাম। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে চৌরঙ্গি লেন পেরিয়ে পার্ক স্ট্রিটের দিকে এগোচ্ছে ট্যাক্সি। আপাতত বাইরের পরিবেশে মনোযোগ নেই। শুনেছি কলকাতার ঐতিহ্যে মিশে থাকা হলুদ ট্যাক্সি স্ক্র্যাপ করবে সরকার। এরই মধ্যে অনেক গাড়ি বসেও গেছে। বাকি যা রাস্তায় চলছে সেটাও চালক-মালিকদের অনুরোধে। গাড়িতে বসার পর থেকেই চালকের সঙ্গে হলুদ ট্যাক্সির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ চলছে। ভাঙা ভাঙা কলকাতার অ্যাকসেন্টে চালককে প্রশ্ন করছিলাম। কিন্তু সব কথার উত্তর আসছে হিন্দিতে। এ বাংলায় ইদানিং ভাষার ব্যারাম হয়েছে! কেন্দ্রীয় সরকার আর বোম্বের মতো মান পেতে হিন্দিতে কথা বলা শুরু করেছে বাংলার মানুষ! তরুণরা তো বাংলার ধারেও ঘেঁষছে না। শুনেছি, বাংলা নাকি ঢাকার ভাষা, এ ভাষা ভারতীয়দের নয়! হলুদ ট্যাক্সি বন্ধ হচ্ছে? কালো গোফওয়ালা চালককে সে কথা জিজ্ঞেস করতেই ছ্যাত করে উঠলো! পাল্টা প্রশ্ন আমার দিকে ছুটে এলো! কে বলেছে তোমাকে? আর হলেও তো ২০২৭ সালের আগে সম্ভাবনা দেখছি না। চৌরঙ্গি লেন থেকে হলুদ ট্যাক্সি মেরামতের আদি নিবাস উচ্ছেদ হয়েছে। যত্ন ছাড়া অবহেলায় তো পুরোনো গাড়িগুলো আর ফেরানো সম্ভব না। নিজেই গদগদ করে বললেন কথাগুলো। সময় তো আর কম হলো না! উনিশ শতকের শুরুতে অর্থাৎ ১৯০৮-১৯০৯ সালের দিকে কলকাতার চৌরঙ্গি লেনে প্রথম মিটার ট্যাক্সি পরিষেবা চালু হয়েছিল। এই বাহনগুলো দিয়ে সাধারণ যাত্রীদের শহরের একস্থান থেকে অন্যস্থানে পরিবহন করা হতো। কলকাতা শহর থেকে দমদম, ব্যারাকপুর, বজবজে সেগুলো চলাচল করতো। সেই সীমা এখন অনেকটাই কমে স্রেফ শহরকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সময়ের পরিক্রমায় এই ট্যাক্সিগুলোই তিলোত্তমা কলকাতার অবিচ্ছেদ্য প্রতীক—হলুদ ট্যাক্সি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে বাহনটি গুরুত্বের বাহুডোরে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে গেলে অন্তত একবার হলেও হলুদ রঙের যানটিতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেন পর্যটকরা। কোভিড মহামারির আগেও কলকাতা শহরে দাপিয়ে বেড়াতো প্রায় ১৮ হাজার আইকনিক হলুদ ট্যাক্সি। অবশ্য এখন কমেছে এই যানের দৌরাত্ম্য। রাজ্য সরকারের তথ্যমতে, শহরে এখন ৭ হাজারের মতো অ্যাম্বাসেডর মিটারের ট্যাক্সি চলছে। শিগগিরই হয়তো সেই সংখ্যাটাও কমে আসবে। অতিরিক্ত ভাড়া, যাত্রী রিফিউজ, ম্যানুফ্যাকচার কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উবার-ওলার আগমনে হলুদ ট্যাক্সি এখন বিলুপ্তির আশঙ্কায়। অ্যাম্বাসেডর মিটার ট্যাক্সিটির রেজিস্ট্রেশনের সময় ধরলে, সেটির বসে যাওয়ার কথা ২০২৭ সালে। এরপরই হয়তো চিরতরে মুছে যাবে কলকাতার অন্যতম এই লাইফলাইন। অ্যাম্বাসেডর মিটারের হলুদ ট্যাক্সি বন্ধ হলেও বিকল্প সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। শহরে এ ট্যাক্সির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কেউ সেডান কিংবা হ্যাচব্যাক হলুদ রং করলে তাতে আবেদনের ভিত্তিতে মিটার বসানোর অনুমতি দেবে সরকার। তাতে অবশ্য দুধের সাধ ঘোলে মেটানো যাবে। আর সেটাতেই হয়তো তৃপ্তির ঢেকুর তুলবে নতুন প্রজন্ম। আলাপ শেষ হতেই হলুদ ট্যাক্সির ইঞ্চিন বন্ধ হলো। চালক জানালেন-নেমে যাও! এটাই ভিক্টোরিয়া পার্ক। বিল পরিশোধ করে রাস্তা থেকে ভিক্টোরিয়ার বিশাল সাম্রাজ্যের দিকে তাকিয়ে আছি। সার্কভুক্ত দেশের পর্যটকদের ১০০ রুপি গুনতে হয়। আর ভারতীয়দের মাত্র ৩০ রুপি। অনেক পর্যটকই কৌশল অবলম্বন করেন। কলকাতার টোনে কথা বলে বুথ থেকে টিকিট সংগ্রহ করেন। বিদেশি পর্যটকরা লোকাল গাইডকে হায়ার করলে তারাও একই কাজ করেন! তাতে আর অতিরিক্ত রুপি গুনতে হয় না। কিন্তু ধরা পড়লে ইজ্জত শেষ! টিকিট বুথে ভিড় নেই। ভরদুপুর হওয়ায় অলস সময় কাটাচ্ছেন কর্তারা। টিকিট নিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। সাদা মাকরানা মার্বেলের বিশাল স্থাপনাটি দূর থেকেই চোখে পড়ে। দুপুরের আলোয় এর গায়ে এক ধরনের শান্ত ঔজ্জ্বল্য খেলা করছে। প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দুপাশে বিস্তৃত সবুজ লন, জলাশয় আর সারিবদ্ধ বৃক্ষ যেন কলকাতার ব্যস্ততাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে দেয়। রোদটা এখনো খা খা করছে। গরমে শরীর চিটচিট শুরু করেছে। পানি তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ। পানির সন্ধান পাওয়া গেল না। চোখ থেকে ব্ল্যাক সানগ্লাসটা নামিয়ে বুকের কাছে ঝুলিয়ে দিলাম। রোদের তীব্রতা ঠেলে প্রধান ফটক পেরোতেই চোখে পড়লো গাঢ় বাদামি রঙের একটি বিশাল ভাস্কর্য। দূর থেকে ঠিকঠাক কিছু বোঝা গেল না। কাছে গিয়ে নামফলকে চোখ রাখতেই পিলে চমকে গেল। রানি ভিক্টোরিয়ার ভাস্কর্য! সিংহাসনে বসে থাকা সম্রাজ্ঞী যেন এখনো সাম্রাজ্যের স্মৃতি আগলে রেখেছেন। একটু দূরেই বিভিন্ন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ও প্রশাসকের ভাস্কর্য। এদের প্রত্যেকেই একসময় ভারত শাসনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। সিংহাসনে বসে থাকা রানি ভিক্টোরিয়ার প্রধান ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জ ধাতু দিয়ে নির্মিত। এজন্য মূর্তিটির রং দেখতে গাঢ় বাদামি থেকে কালচে-বাদামি মনে হয়। তবে অনেক সময় আবার ভাস্কর্যটিকে কালো বা গাঢ় ধূসর দেখায়। কারণ ব্রোঞ্জের ওপর সময়ের প্রভাব, আলো-ছায়া এবং আবহাওয়ার কারণে এর রং পরিবর্তন হয়ে থাকে। এর ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চাইছিলাম। কিন্তু কাউকে চোখে পড়ছিল না। ভিক্টোরিয়া ভাস্কর্যের ছায়ায় বসে রইলাম। আমার কাছাকাছি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক যুগল। বয়সে খুবই তরুণ। ওদের জিজ্ঞাসা করলাম আমার কিছু ছবি তুলে দিতে পারবে কি না? সঙ্গে সঙ্গে একফালি হাসি দিয়ে জানালো, কেন না? ফোনটা এগিয়ে দিলাম। তবে ছবির কোয়ালিটি তাদের মনে ধরলো না। এরপরই ওদের ফোনের ক্যামেরা থেকে আমাকে ছবি তুলে দিলো। পরিচয়পর্বে ওরা জানালো, দুজনের বাসাই নদীয়া জেলায়। দুজন দুজনকে পছন্দ করেন। বান্ধবী কলকাতা শহরে পড়ে। প্রিয়তমাকে দেখতেই মূলত দুদিনের জন্য কলকাতায় আসা ছেলেটির। এরপর তাদের নিয়ে পুরো ভিক্টোরিয়া এক্সপ্লোর শুরু করলাম। ধীরে ধীরে মূল ভবনের দিকে এগোচ্ছি। সাদা মার্বেলের দেওয়াল, খিলান, গম্বুজ আর চারপাশের চত্বর; মুহূর্তের জন্য তাজমহলের কথা মনে করিয়ে দেবে। কিন্তু কাছে গেলে সেই ধারণা বদলে যাবে। কারণ এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের স্থাপনা। ইউরোপীয় রেনেসাঁ ধারা, মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়া এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী মহিমার অদ্ভুত সংমিশ্রণ। গম্বুজের সর্বোচ্চ চূড়ায় ঘূর্ণায়মান ব্রোঞ্জের ‘অ্যাঞ্জেল অব ভিক্টরি’ বাতাসের সঙ্গে ঘুরে কলকাতার আকাশরেখাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। প্রধান দরজা দিয়ে ভবনে ঢুকতেই পৌঁছে যাই সেন্ট্রাল হলে। মাথার ওপর বিশাল গম্বুজ। চারদিকে মার্বেলের স্তম্ভ। ওপরের অংশে রানি ভিক্টোরিয়ার জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার চিত্রকর্ম। জায়গাটির নীরবতা আর বিশালত্ব এক ধরনের রাজকীয় অনুভূতি তৈরি করেছে। এখানে আগে থেকে অনেক পর্যটকের ভিড়। শিল্পকর্মগুলোর যেন কোনো ক্ষতি না হয়; সেজন্য তাদের কড়া নিরাপত্তা দিচ্ছে কর্তারা। সেন্ট্রাল হল পেরিয়ে প্রবেশ করি রয়্যাল গ্যালারিতে। এখানে রানি ভিক্টোরিয়ার জীবন, শাসনভারের অভিষেক, বিবাহ, শাসনকাল এবং সাম্রাজ্যের বিস্তারের নানা চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতি, প্রিন্স অ্যালবার্টের ছবি, জুবিলি উদ্যাপনের দৃশ্য এবং রাজপরিবারের বিভিন্ন স্মারক স্থান পেয়েছে গ্যালারিতে। কিছু ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীও সংরক্ষিত আছে। পরের গ্যালারিগুলোতে ঠাঁই হয়েছে অসংখ্য প্রতিকৃতির। ব্রিটিশ শাসক, সামরিক কর্মকর্তা, প্রশাসক এবং ভারতীয় অভিজাতদের নানা তেলচিত্র যেন একেকটি সময়ের দলিল। প্রতিটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি যুগের গল্প। স্কাল্পচার গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। এ গ্যালারিতে মার্বেল, ব্রোঞ্জ ও অন্যান্য উপাদানে নির্মিত ভাস্কর্যসমূহ। কিছু ভাস্কর্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি, আবার কিছু শিল্পমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর্মস অ্যান্ড আর্মারি বিভাগে আছে বিভিন্ন যুগের অস্ত্র, তরবারি, আগ্নেয়াস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম। এগুলো শুধু যুদ্ধের স্মারক নয় বরং ক্ষমতা ও শাসনের ইতিহাসও তুলে ধরছে। ভিক্টোরিয়ায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে কলকাতা গ্যালারিটি। এখানে চিত্র, মানচিত্র, নথি, মডেল ও আলোকচিত্রের মাধ্যমে কলকাতার জন্ম, বিকাশ, বাণিজ্যিক উত্থান, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং নগর পরিকল্পনার দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতার তিন গ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক মহানগর হয়ে ওঠার গল্প এখানে জীবন্ত। গ্যালারিগুলো ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ে থমাস ড্যানিয়েল ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলের বিখ্যাত চিত্রকর্ম। ঔপনিবেশিক ভারতের শহর, নদী, মন্দির ও স্থাপত্যের বহু দৃশ্য তাঁদের তুলিতে সংরক্ষিত হয়েছে। মিউজিয়ামটিতে প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি শিল্পকর্ম, নথি ও ঐতিহাসিক বস্তুগুলো স্থান পেয়েছে। ব্রিটিশরা ভারত ছেড়েছে তবে উপহমহাদেশে তাদের কর্মযজ্ঞের বিশাল স্মৃতিভাণ্ডারগুলো আজও জীবন্ত করে রেখেছে। ভিক্টোরিয়া পার্ককে ঘিরে আশেপাশেই আরও বেশকয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। একদম কাছেই রয়েছে সেন্ট পল ক্যাথেড্রেল। যার গথিক স্থাপত্য কলকাতার অন্যতম পরিচিত নিদর্শন। যিশুখ্রিষ্টের অনুসারীদের জন্য এটা বড় আবেগের স্থাপনা। বিভিন্ন সিনেমার শুটিংয়ে স্থাপনাটি গুরুত্বের তালিকায় থাকে। এর কিছুটা দূরেই বিস্তৃত ময়দান, যাকে কলকাতার ফুসফুস বলা হয়। তার সামনেই জওহরলাল নেহেরু রোডে আছে বিড়লা প্লানেটেরিয়াম। এটা এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম তারামণ্ডল পর্যটনকেন্দ্র। আরও একটু এগোলে পাওয়া যাবে রবীন্দ্র সদন এবং নন্দন। ভিক্টোরিয়া থেকে বেরিয়ে এলাম। নদীয়ার বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়েছি। ঢাকায় আসার নিমন্ত্রণ জানালাম। ওরাও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা দিলো, খুব শিগগিরই তোমার দেশে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। নতুন গন্তব্য হাওড়া ব্রিজের দিকে ছুটলাম... চলবে... আরও পড়ুনকলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১ কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ২ কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৩ কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪ এসইউ
Go to News Site