Jagonews24
সভ্যতার ইতিহাসে রেলপথ শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির বিকাশ পর্যন্ত রেলপথ মানুষের জীবনযাত্রা, বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের গতিপথ বদলে দিয়েছে। আজও বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রেলকে শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন, বাণিজ্য, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে। যে দেশ যত বেশি দক্ষতার সঙ্গে তার রেলব্যবস্থাকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে, সে দেশ তত বেশি টেকসই উন্নয়নের সুফল ভোগ করেছে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে রেলপথ আবারও জাতীয় উন্নয়ন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। জনসংখ্যার চাপ, ক্রমবর্ধমান যানজট, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে রেলকে ঘিরে নতুন করে সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের সময় দীর্ঘদিন পর ব্যাপক পরিসরে কোচ ও লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ সংগ্রহ, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে ১০০টি নতুন লোকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া এবং ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। রেলওয়েতে লোকোমোটিভ ও কোচ সংকট বহু বছর ধরেই একটি বড় সমস্যা। সেই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতেই সরকার নতুন বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৪২৮ কিলোমিটারের বেশি রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে মিটারগেজ, ব্রডগেজ এবং ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্ক বিদ্যমান। পাশাপাশি নতুন রেললাইন নির্মাণ, বিদ্যমান লাইনের উন্নয়ন এবং ব্রডগেজকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। রেল শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়; এটি হতে পারে দেশের শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পর্যটন বিকাশ এবং আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। সঠিক পরিকল্পনা, সুশাসন ও দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়েকে যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করতে পারে, তাহলে আগামী দিনের উন্নত, সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশের গল্পে রেলপথ একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেশের রেল যোগাযোগকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—শুধু নতুন কোচ, ইঞ্জিন এবং রেললাইন নির্মাণ করলেই কি বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি টেকসই ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে? নাকি অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আয় বৃদ্ধির নতুন ও কার্যকর পথও খুঁজে বের করতে হবে? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রেলওয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু অবকাঠামোগত নয়; আর্থিকও বটে। যাত্রী পরিবহন থেকে যে আয় আসে, তা দিয়ে বিশাল পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে রেলকে টেকসই করতে হলে উন্নয়নের পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বের সফল রেলব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের আয়ের প্রধান উৎস শুধু টিকিট বিক্রি নয়। জাপানের রেল কোম্পানিগুলো স্টেশনভিত্তিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে বিপুল আয় করে। বড় বড় স্টেশনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শপিংমল, অফিস কমপ্লেক্স, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন কেন্দ্র এবং বিজ্ঞাপন ব্যবসা। ফলে রেলস্টেশনগুলো কেবল যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চীনের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। বিশ্বের বৃহত্তম উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি তারা রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে নতুন নগর অর্থনীতি সৃষ্টি করেছে। স্টেশনের আশপাশে শিল্পাঞ্চল, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স এবং ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে তুলে বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের উদাহরণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করলেও ভারতীয় রেলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মালবাহী পরিবহন। কয়লা, খাদ্যশস্য, সার, সিমেন্ট, ইস্পাত এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহনের মাধ্যমে দেশটির রেলওয়ে বিপুল রাজস্ব অর্জন করে। ফলে যাত্রী পরিবহনে ভর্তুকি দিলেও সামগ্রিকভাবে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। বর্তমানে রেলওয়ের আয়ের বড় অংশ যাত্রী পরিবহননির্ভর। অথচ চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল এবং স্থলবন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী মালবাহী রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক দেশের মহাসড়ক ব্যবহার করছে। এতে যেমন পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ রেলে স্থানান্তর করা গেলে রেলের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রেলওয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আধুনিক ফ্রেইট করিডোর বা মালবাহী করিডোর গড়ে তোলার ওপর। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল, মোংলা বন্দর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য সমন্বিত রেল লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রাজস্ব আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আয় বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো রেলওয়ের বিশাল ভূমি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ রেলওয়ের হাজার হাজার একর জমি রয়েছে। কিন্তু এর একটি বড় অংশ অব্যবহৃত অথবা অবৈধ দখলের শিকার। এসব জমিকে পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি লিজ, শিল্পপার্ক, কনটেইনার ডিপো, গুদামঘর কিংবা বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে রূপান্তর করা গেলে বিপুল রাজস্ব অর্জন সম্ভব। স্টেশনভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনাও হতে পারে আয়ের নতুন উৎস। কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট কিংবা কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোকে আধুনিক বাণিজ্যিক হাবে পরিণত করা গেলে রেলের আয়ের কাঠামোই বদলে যেতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তিও রেলের রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা দুর্নীতি ও কালোবাজারি অনেকাংশে কমিয়েছে। এখন সময় এসেছে স্মার্ট রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, করপোরেট পার্টনারশিপ এবং তথ্যনির্ভর সেবার মাধ্যমে আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার। পর্যটন খাতেও রেলের সম্ভাবনা অপরিসীম। কক্সবাজার রেললাইন চালুর মাধ্যমে পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে বিশেষ পর্যটন ট্রেন চালু করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই এই খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এছাড়া আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ ভবিষ্যতের আরেকটি বড় সুযোগ। বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক সংযোগস্থলে অবস্থিত। ভারত, নেপাল, ভুটান এবং সম্ভাব্যভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে রেল সংযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য সুশাসন, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অতীতে রেলের অনেক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নতুন কোচ ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে রেলওয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর। বিশ্বের সফল রেলব্যবস্থাগুলো দেখিয়েছে, রেলকে শুধু যাত্রী পরিবহনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার সম্ভাবনার বড় অংশই অপূর্ণ থেকে যায়। বরং মালবাহী পরিবহন, লজিস্টিকস সেবা, স্টেশনভিত্তিক বাণিজ্য, পর্যটন, বিজ্ঞাপন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করলেই রেল হয়ে উঠতে পারে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ আজ রেলপথের এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশকের অবহেলার পর নতুন রেললাইন, আধুনিক কোচ, শক্তিশালী লোকোমোটিভ এবং আঞ্চলিক সংযোগের যে ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, তা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে এই বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত এবং কত দক্ষতার সঙ্গে রেলকে আয়-উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায় তার ওপর। পরিশেষে বলা যায়,রেল শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়; এটি হতে পারে দেশের শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পর্যটন বিকাশ এবং আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। সঠিক পরিকল্পনা, সুশাসন ও দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়েকে যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করতে পারে, তাহলে আগামী দিনের উন্নত, সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশের গল্পে রেলপথ একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।ahabibhme@gmail.com এইচআর/এএসএম
Go to News Site