Jagonews24
জায়গাটা এমন, অনেক দূর থেকে চোখে পড়বে বিশাল এক নীল জলাশয়। হ্যাঁ, দূর থেকে নীলই মনে হবে, যেন এক টুকরো আকাশ খসে পড়েছে মাটির কোলে। মনে হবে সাগর কিংবা সমুদ্র। কাছে গেলে দেখতে পাবেন, জলের বুকে ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে, তরুণ-তরুণীরা সেই জলরাশিতে নেমে হাসিমুখে সেলফি তুলছেন, কেউ নৌকায় ভাসছেন, কেউবা বর্ষার পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তায় হেঁটে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন। পাশেই মেলা, নাগরদোলায় শিশুদের কিলবিল হাসি, চরকির ঘূর্ণন, আর কেউ ওয়াটার রোলার বল-এ রোমাঞ্চকর যাত্রা। সব মিলিয়ে মনে হবে কোনো পর্যটন কেন্দ্র। এটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বা মানুষের ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি কোনো সাধারণ লেক নয়, এটি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির লেক, যেখানে একসময় ছিল জিগাগাড়ি নামের একটি গ্রাম। সকাল হলে মানুষ কাজে বের হত, শিশুরা স্কুলে যেত, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত। বড়পুকুরিয়া খনির ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলনের ফলে মাটি ধসে (অবনমন) গ্রামের বাড়িঘরসহ ৪০০ একর জমি তলিয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেখানেই সৃষ্টি হয় বিশাল জলাধার, যা আজ স্থানীয়দের কাছে ‘বড়পুকুরিয়া লেক’ নামে পরিচিত। কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মসজিদ আর কয়েকটি নারিকেল-খেজুর গাছ, যেন বলছে, এখানেও ছিল জীবন, ছিল স্বপ্ন। এক সময় যেখানে ছিল মানুষের বসতি, ফসলের মাঠ আর গ্রামীণ জীবনের কোলাহল, সেখানে এখন সারা বছর ঢেউ খেলে যায় নীল জলের বুকে। বর্ষায় বেড়ে যায় জলাধার। পার্বতীপুর উপজেলা শহর থেকে ১৩.২ কিলোমিটার এবং ফুলবাড়ী উপজেলা শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে, পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই জলাশয় এখন প্রকৃতি প্রেমিকদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বিশাল জলরাশি, সবুজের চাদর, আর নির্মল বাতাস-মিলে তৈরি করেছে এক অপরূপ দৃশ্য। সরকার এরই মধ্যে জলাশয়টির একাংশকে ‘মৎস্য অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করেছে, যেখানে বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের কাজ চলছে। প্রকৃতিপ্রেমীদের পছন্দের স্থানে পরিণত হয়েছে এই লেক। বিনোদনের খোরাকে পরিণত এই লেকে ছুটছে হাজারো মানুষ। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা থেকে আসা রাফিউল ইসলাম ও শমসের আলী বলেন, ‘জায়গাটি সত্যিই দারুণ সুন্দর। এতদিন শুনেছিলাম এখন বন্ধু-বান্ধব মিলে সবাই খুব উপভোগ করছি। পার্বতীপুর ঘেষা রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে আসা তাসকিনা আকতারের কণ্ঠেও একই সুর, ‘এত সুন্দর একটি জায়গা আমাদের পাশের উপজেলায় আছে, তা না দেখলে বিশ্বাসই হতো না! সত্যি অসাধারণ।’ জলাশয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে পানিতে নেমে সেলফি তুলছিলেন দিনাজপুর শহর থকে আসা সুইট ও সজল। তারা বলেন, ‘সাগরের মতো ঢেউ না হলেও, এই ছোট ঢেউগুলো পায়ে আছড়ে পড়ার অনুভূতিই আলাদা। নৌকায় ঘুরেছি, স্পিড বোটে চড়েছি-পুরোটা সময়ই মন্ত্রমুগ্ধের মতো কেটেছে। একটি অসাধারণ লেক।’ শিশুরা খেলছে মুক্ত পরিবেশে, তরুণ-তরুণীরা ব্যস্ত ছবি তোলায়, কেউ বা আবার সিনামাটিক ভিডিও স্যুাট করতে ব্যস্ত। আর বয়স্করা বসে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অপার লীলাভূমি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লেকপাড়ে গড়ে তুলেছেন ছোট্ট মেলা-নাগরদোলা, চরকি, ওয়াটার রোল, বাঁশের সাঁকো, চা-নাশতার দোকান-সব মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য তৈরি হয়েছে আনন্দের এক অফুরান ভাণ্ডার। তবে সবকিছু যে শতভাগ তা নয়। দর্শনার্থীদের দাবী, এখানে পর্যাপ্ত বসার জায়গা, স্যানিটেশন সুবিধা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা গেলে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি পুরোপুরি বিনোদন স্পট। এলাকার বেসরকারি চাকুরিজিবি জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর দুই ঈদে ও পূজায় এই লেক মুখরিত হয়ে ওঠে দর্শনার্থীদের পদচারণায়। যদি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে-বসার বেঞ্চ, টয়লেট, তথ্যকেন্দ্র, লাইফগার্ডের ব্যবস্থা করে-তাহলে এটি দেশের অন্যতম পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। সরকারও এ থেকে রাজস্ব আয় করতে পারবে।’ বর্ষাকালে এই জলাশয় যেন যৌবন ফিরে পায়, রূপবতী হয়ে ওঠে। চারপাশের সবুজ, জলের কলতান, আর আকাশের মেঘ মিলে তৈরি করে এক স্বপ্নিল পরিবেশ। সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বড়পুকুরিয়ার হারানো জিগাগাড়িগ্রাম লেক শুধু একটি দর্শনীয় স্থানই নয়, হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ইকো-ট্যুরিজমের একটি মডেল। প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের স্মৃতির এক অনন্য মিলনস্থল মানুষের সৃষ্টি এই লেক। ঈদের আনন্দে মুখর এই লেকপাড় যেন নতুন করে জানান দিচ্ছে, প্রকৃতি কখনো কখনো হারানোর মাঝেও সৃষ্টি করে অপার সৌন্দর্যের নতুন অধ্যায়। আরও পড়ুন ঐতিহ্যবাহী যত প্রাচীন দিঘির জনপদ ফেনী দারভাঙ্গা খাল: জোয়ার-ভাটার নীরব স্বর্গ এমদাদুল হক মিলন/কেএসকে
Go to News Site