Jagonews24
ময়মনসিংহে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পরও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। সবশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম উপসর্গ নিয়ে এক হাজার ৯৬০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক হাজার ৮০০ জন। বর্তমানে ১১২ জন চিকিৎসাধীন। একই সময় মারা গেছে ৪৮ জন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোলাম মাওলা বলেন, ‘টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অভিভাবকদের অসচেতনতা ও টিকা গ্রহণে অনীহার কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিকা নেওয়ার পরেও যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়নি কিংবা মায়ের দুধ ঠিকমতো খায়নি। শিশুদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে।’ চিকিৎসকদের মতে, ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৯৫ শতাংশই হাম প্রতিরোধী টিকা নেয়নি। এছাড়া শারীরিকভাবে দুর্বল কিছু শিশু দ্বিতীয়বারও সংক্রমিত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। হামের বিস্তার ঠেকাতে গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ময়মনসিংহ জেলায় টিকার লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ ডোজ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫৮ হাজার ৬৬৮ ডোজ। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, ফুলপুর ও মুক্তাগাছা উপজেলাকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত তিন মাসে সদর উপজেলায় আক্রান্ত হয় ৪১৬ শিশু। এদের মধ্যে মারা যায় ছয়জন। এছাড়া ত্রিশালে আক্রান্ত ১৩৯ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের; ফুলপুরে আক্রান্ত ৭৩ জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং মুক্তাগাছায় আক্রান্ত ৮৩ শিশুর মধ্যে তিনজন মারা গেছে। জেলা ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন, জেলায় লক্ষ্যমাত্রার ১০১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০৬ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এরপরও সংক্রমণ কমেনি। হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে ১১০ জনের বেশি শিশু ও কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক ভর্তি রয়েছেন। শয্যা সংকটের কারণে অনেককে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এসময় রোগীর স্বজনরা ওষুধের সংকট ও চিকিৎসাসেবায় নানা ভোগান্তির অভিযোগ করেন। সদর উপজেলার চরভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা রীতা ভৌমিক বলেন, ‘চার বছরের ছেলে নির্বাককে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘টিকার গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে সময়মতো টিকা দিলে হয়তো এই কষ্ট পেতে হতো না।’ সদর উপজেলার দাপুনিয়া গ্রামের দেড় বছরের শিশু আব্দুল্লাহ ঈদের আগে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ১ জুন আবার হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার বড় চাচা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘টিকা দেওয়ার পরেও সে আবার আক্রান্ত হয়েছে। তবে এখন কিছুটা সুস্থ। হাসপাতালে এসে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।’ শেরপুরের সাজিদা আক্তার পাঁচ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি জানান, বয়স ছয় মাস না হওয়ায় টিকা দিতে পারেননি। পরে শিশুটি হামে আক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির প্রচারণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন ছিল। প্রচারণার ঘাটতি এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।’ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ কে দেবনাথ দাবি করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এখনো টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। হোসাইন সুলভ/এসআর/জেআইএম
Go to News Site