Jagonews24
তিনটিতে ধস শুরু, ঝুঁকিতে যানবাহন চলাচল চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডে খাঁড়াভাবে কাটা ১৬ পাহাড় রক্ষায় অনিশ্চয়তা কাটছে না। পরিবেশ অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চিঠি চালাচালিতে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে পাহাড়গুলো। এর মধ্যে তিনটি পাহাড়ে শুরু হয়েছে ধস। পাহাড় ধসে সলিমপুর সংযোগ মুখে সড়কটির একপাশ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। সিডিএ বলছে, প্রকল্প শেষ হলেও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ধসের মুখে থাকা ১৬ পাহাড় ব্যবস্থাপনা ঝুলে আছে। জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরের যানজট নিরসনের জন্য প্রায় ২৯ বছর আগে মূল শহরের প্রবেশদ্বারের সঙ্গে সংযুক্ত করে বাইপাস সড়ক করার উদ্যোগ নেয় সিডিএ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট টোল রোডের মুখ থেকে বায়েজিদ বোস্তামী পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের অংশ হিসেবে অধিগ্রহণ করা হয় ৯২০ কাঠা জমি। পাহাড় ধসের কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে সড়কের একাংশ/জাগো নিউজ দীর্ঘ সময় পরে মূল বাইপাস সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হলে ২০১৯ সালের ১২ মে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকল্পটির জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়। প্রকল্পের আওতায় একটি রেলওয়ে ওভারব্রিজসহ ছয়টি ব্রিজ এবং কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যেই প্রকল্পের ছয় কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য কাটা হয় ১৬টি পাহাড়। তবে শহরের একপ্রান্তে অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় পাহাড়গুলো কাটার প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সমালোচনা ছিল না। পরবর্তীসময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেপরোয়া পাহাড় কাটার তথ্য উঠে এলে নড়েচড়ে বসে পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০২০ সালের শুরুতে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানতে পারেন, একেবারে নতুন রাস্তাটি নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিলেও অনুমোদনের চেয়ে চারগুণ বেশি পাহাড় কেটে ফেলে সিডিএ। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে আড়াই লাখ ঘনফুট পাহাড় কাটার অনুমোদন নিয়ে ১০ লাখ ৩০ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটে সিডিএ। ওই ঘটনায় ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি সিডিএকে শুনানিতে ডাকে পরিবেশ অধিদপ্তর। শুনানিতে অনুমোদনের চেয়ে বেশি পাহাড় কেটে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, পাহাড়ের উপরিভাগের মাটি ও ভূমির বাইন্ডিং ক্যাপাসিটি নষ্টসহ পরিবেশ-প্রতিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় কয়েক মাস আগে মন্ত্রণালয়ের এক মিটিংয়ে সিডিএ প্রেজেন্টেশন দেয়। কীভাবে পাহাড়গুলো না কেটে বৈজ্ঞানিক পন্থায় ঝুঁকিমুক্ত ও সংরক্ষণ করা যাবে সে বিষয়ে সিডিএ মতামত দেয়। কিন্তু সিডিএ থেকে মন্ত্রণালয়ে ডিটেল আবেদন চেয়েছে। এখনো ওই অবস্থায় আছে।-পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা শুনানি শেষে সিডিএকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা করেন অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) রুবিনা ফেরদৌসী। পরে জরিমানার বিষয়টি নিয়ে বন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আপিল করে সিডিএ। খাঁড়াভাবে কাটা পাহাড়গুলো হুমকির মুখে/জাগো নিউজ সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড়গুলো ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটা হয়। খাঁড়া অবস্থার কারণে নতুন করে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। পাহাড়গুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে ফের তিন লাখ ৩২ হাজার ঘনমিটার পাহাড় কাটার অনুমতি চায় সিডিএ। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তরে নতুন করে আবেদন করে সংস্থাটি। এসময় ১৬টি পাহাড় ২২ দশমিক ৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটার জন্য প্রস্তাবনা দিলেও তা না করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। পরে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অনুমোদন চাওয়া হলেও ২২ দশমিক ৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে পাহাড় কাটার অনুমতি মেলেনি। এরপর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো কাটা ও সংরক্ষণ কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ প্রতিবেদন চায় পরিবেশ অধিদপ্তর। আরও পড়ুন পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে সব জীবকেই বাঁচার সুযোগ দিতে হবে পরিবেশ আর উন্নয়ন কী পরস্পরের শত্রু? পরিবেশ বাঁচান, সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ুন পরিবেশ দূষণ নিয়ে যে কোনো অভিযোগ জানানো যাবে ৩৩৩ নম্বরে পরে ওই সময়ের সিডিএর প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে প্রকল্পটির পরিচালক ও চুয়েটের দুই শিক্ষকের সমন্বয়ে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর কমিটির সদস্য চুয়েটের দুই শিক্ষক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তীসময়ে পরামর্শকসহ পুরো কাজের জন্য সিডিএকে আর্থিক প্রস্তাবনা দেয় চুয়েটের বিশেষজ্ঞ টিম। তবে চুয়েটের ওই বিশেষজ্ঞ টিমের এ ধরনের কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় নতুন করে বিএসআরএম-মেগাফেরি জেভি নামে আরেকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেয় সিডিএ। সিডিএতে পাহাড় কাটা নিয়ে কোনো কাজ নেই। বায়েজিদ লিংক রোডে সড়ক নির্মাণের সময় সিডিএ পাহাড়গুলো কেটেছে। এগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এখনো সিডিএর। এমন তথ্য দিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।-সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ ১৬ পাহাড় ৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটার পরামর্শ দেন। এরপর পরামর্শকের প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় সিডিএ। ওই পর্যায়েও পাহাড়গুলো ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীসময়ে পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সিডিএ নতুন করে দৌড়ঝাঁপ করলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। খাঁড়াভাবে কাটা পাহাড়গুলো হুমকির মুখে/জাগো নিউজ পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৬ মে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আপিল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. ফারহিনা আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বোর্ডে সিডিএ পাহাড় কাটার মামলাটি শুনানি হয়। শুনানি শেষে আগের ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা কমিয়ে ৫ কোটি টাকা জরিমানা পুনর্নির্ধারণ করে আপিল বোর্ড। সরেজমিনে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়গুলো অনেক স্থানে ধসে পড়ছে। বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধসের মাটি ফুটপাতসহ মূল সড়কে চলে এসেছে। এর মধ্যে জঙ্গল সলিমপুর প্রবেশের মুখের সামনের চার লেনের সড়কটির একটি লেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ধস হতে থাকা পাহাড়টির পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহনগুলো। জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বাসিন্দা আলী আহমদ। সড়কটির মুখে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা শহর থেকে বায়েজিদ হয়ে সলিমপুরে নিয়মিত যাতায়াত করি। এখানে একেকটি খাঁড়া পাহাড়ের উচ্চতা একশ ফুটেরও ওপরে। বিশেষ করে বায়েজিদ থেকে ফৌজদারহাটগামী সড়ক অংশের লাগোয়া কয়েকটি পাহাড়ের মধ্য অংশ ধসে মাটি রাস্তায় নেমে এসেছে। এতে পাহাড়ের ওপরের অংশে আরও বেশি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যে কোনো সময় ওপর থেকে পাহাড়ের ধস শুরু হলে নিচে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। পাহাড় কাটা সংক্রান্ত সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি/জাগো নিউজ বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা নিজ কার্যালয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বায়েজিদ লিংক রোডের সড়ক নির্মাণের সময়ে ১৬টি পাহাড় সিডিএ কেটেছিল। পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় কয়েক মাস আগে মন্ত্রণালয়ের এক মিটিংয়ে সিডিএ প্রেজেন্টেশন দেয়। কীভাবে পাহাড়গুলো না কেটে বৈজ্ঞানিক পন্থায় ঝুঁকিমুক্ত ও সংরক্ষণ করা যাবে সে বিষয়ে সিডিএ মতামত দেয়। কিন্তু সিডিএ থেকে মন্ত্রণালয়ে ডিটেল আবেদন চেয়েছে। এখনো ওই অবস্থায় আছে।’ ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল। প্রায় ছয় মাসের বেশি সময় তিনি দায়িত্বে থাকলেও বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডের ধস শুরু হওয়া পাহাড়গুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। গত মঙ্গলবার (২ জুন) এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিডিএতে পাহাড় কাটা নিয়ে কোনো কাজ নেই।’ বায়েজিদ লিংক রোডে সড়ক নির্মাণের সময় সিডিএ পাহাড়গুলো কেটেছে। এগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এখনো সিডিএর। এমন তথ্য দিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিডিএর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে প্রায় ছয় বছর ধরে ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কাটা পাহাড়গুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এর মধ্যে কয়েকটি পাহাড় ধসে পড়ছে। পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য সিডিএর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মন্ত্রণালয়ের নানান অসহযোগিতার কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না।’ পরে কথা হয় সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমের সঙ্গে। তিনি ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সিডিএতে যোগ দেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাকালীন পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কয়েকটি মিটিং হয়েছিল। সিডিএর পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে পাহাড়গুলো যে অবস্থায় আছে, তা রক্ষা করতে গেলেও পাহাড় কিছুটা কাটা লাগবে। এখন খাঁড়া অবস্থায় আছে। পাহাড় ঝুঁকিমুক্ত করতে এগুলো ঢালু করতে হবে।’ মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে পাহাড় কিছুটা কাটার কথা উঠলে উপদেষ্টা তখন বিষয়টি আটকে দেন বলে জানান সিডিএর এ চেয়ারম্যান। তবে পাহাড়গুলো রক্ষায় উপদেষ্টা কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা নতুনভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছি। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, যাতে সমস্যাটির সমাধান করা যায়।’ এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ
Go to News Site