Jagonews24
ফুটবলের রূপকথার গল্প বলতে গেলে আলফোনসো ডেভিসের নাম অবশ্যই সবার আগে আসবে। ঘানার একটি শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এক শিশু, যে পরে কানাডার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে উঠেছে। দুরন্ত গতি, অসাধারণ ড্রিবলিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের কারণে বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত ‘দ্য রোডরানার’ নামে। বর্তমানে বায়ার্ন মিউনিখ ও কানাডা জাতীয় দলের অধিনায়ক ডেভিসকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুল-ব্যাক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শরণার্থী শিবির থেকে কানাডায় আলফোনসো বয়েল ডেভিস জন্মগ্রহণ করেন ২০০০ সালের ২ নভেম্বর, ঘানার বুদুবুরাম শরণার্থী শিবিরে। তার বাবা ডেবেয়া ডেভিস ও মা ভিক্টোরিয়া ডেভিস লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়ার বাসিন্দা ছিলেন। দ্বিতীয় লাইবেরিয়ান গৃহযুদ্ধের সময় পরিবারটি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে তারা আশ্রয় নেন ঘানার শরণার্থী ক্যাম্পে। ২০০৫ সালে ডেভিস পরিবার কানাডায় পাড়ি জমায় এবং এডমন্টনে বসবাস শুরু করে। নতুন দেশে এসে ভাষা ও আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হলেও ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল আলফোনসোর অদম্য ভালোবাসা। এডমন্টনের দরিদ্র শিশুদের জন্য পরিচালিত `ফ্রি ফুটি‘ প্রোগ্রামের মাধ্যমে সংগঠিত ফুটবলে তার যাত্রা শুরু হয়। পরে তিনি এডমন্টন স্ট্রাইকার্স ও এডমন্টন ইন্টারন্যাশনালসে খেলেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসের রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে যোগ দিতে একাই ভ্যাঙ্কুভারে চলে যান। ২০১৭ সালের ৬ জুন তিনি কানাডার নাগরিকত্ব লাভ করেন। এর আগে তিনি ছিলেন লাইবেরিয়ার নাগরিক। ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপস থেকে বিশ্বমঞ্চে ২০১৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে আলফোনসো ডেভিস ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপস টুর হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক করেন। তখন তিনি ইউএসএল ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় ছিলেন। উল্লেখযোগ্য রেকর্ড * ১৫ বছর ৫ মাস বয়সে পেশাদার অভিষেক* ইউএসএল ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতা* এমএলএসে ২০০০ সালের পর জন্ম নেওয়া প্রথম ফুটবলার* এমএলএস ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ অভিষেককারী ২০১৮ মৌসুমে ভ্যাঙ্কুভারের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়েন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি ও লিভারপুলও তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। বায়ার্ন মিউনিখে উত্থান ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বায়ার্ন মিউনিখ ডেভিসকে দলে ভেড়ায়। ট্রান্সফার ফি ছিল প্রায় ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তখনকার এমএলএস ইতিহাসের রেকর্ড। ২০১৯ সালে বুন্দেসলিগায় অভিষেকের পর থেকেই তিনি নিজের প্রতিভার জানান দিতে শুরু করেন। উইঙ্গার থেকে তাকে লেফট-ব্যাকে রূপান্তর করেন কোচ নিকো কোভাচ। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তার ক্যারিয়ার। ২০১৯-২০ মৌসুম: বিস্ফোরক উত্থান এই মৌসুমে ডেভিস ছিলেন বায়ার্নের ট্রেবলজয়ী দলের অন্যতম সেরা তারকা। বায়ার্ন জয় করে- বুন্দেসলিগা, ডিএফবি পোকাল, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। চেলসির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তার দৌড়ে তৈরি করা গোলের অ্যাসিস্ট বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। আবার বার্সেলোনার বিপক্ষে ৮-২ জয়ের ম্যাচে তার অবিশ্বাস্য রান ও অ্যাসিস্ট ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে। ২০২০ সালে তিনি হন: * বুন্দেসলিগা রুকি অফ দ্য সিজন। * উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ার-এর সদস্য* ফিপ্রো ওয়ার্ল্ড একাদশের সদস্য* গোল্ডেন বয়-এর তৃতীয় স্থান অধিকারী গতির রাজা ডেভিসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গতি। বুন্দেসলিগায় তিনি ঘণ্টায় ৩৬.৫১ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। এজন্যই তাকে `দ্য রোডরানার‘ বলা হয়। তার বৈশিষ্ট্য: বিস্ফোরক গতি, দুর্দান্ত ড্রিবলিং, আক্রমণাত্মক ওভারল্যাপিং রান, নিখুঁত ক্রস, রক্ষণ ও আক্রমণে সমান কার্যকর কানাডা জাতীয় দলের প্রাণভোমরা ২০১৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে কানাডার জার্সিতে অভিষেক করেন ডেভিস। এরপর থেকেই তিনি কানাডা ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকায় পরিণত হন। গোল্ড কাপ ২০১৭ ফ্রেঞ্চ গায়ানার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি হন: * কানাডার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা* গোল্ড কাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা* ২০০০ সালের পর জন্ম নেওয়া প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট গোলদাতা সেই টুর্নামেন্টে তিনি জেতেন: * গোল্ডেন বুট* ইয়াং প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট* বেস্ট ইলেভেনে জায়গা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কানাডার প্রথম গোল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কানাডার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি আসে আলফোনসো ডেভিসের পা থেকে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই হেড থেকে গোল করে ইতিহাস গড়েন তিনি। যদিও কানাডা ম্যাচটি ৪-১ ব্যবধানে হারে, তবু ডেভিসের সেই গোল কানাডিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। কানাডার অধিনায়ক ২০২৪ কোপা আমেরিকায় ডেভিস কানাডার অধিনায়ক হন। জেসি মার্শের অধীনে দলকে সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়েও ইতিহাস গড়ে কানাডা। ১৯৫৭ সালের পর এটি ছিল মার্কিন মাটিতে কানাডার প্রথম জয়। চোট, সংগ্রাম ও প্রত্যাবর্তন ডেভিসের ক্যারিয়ারে চোটও এসেছে বড় বাধা হয়ে। ২০২২ সালে কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর তার শরীরে মায়োকার্ডাইটিস ধরা পড়ে। পরে ২০২৫ সালে এসিএল ইনজুরিতে পুরো মৌসুমের বড় অংশ মিস করেন। তবে দুর্দান্ত মানসিক শক্তিতে তিনি আবার মাঠে ফেরেন এবং ২০২৬ সালে বায়ার্নের বুন্দেসলিগা শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন। বায়ার্নে সাফল্যের পরিসংখ্যান ক্লাব শিরোপা * বুন্দেসলিগা: ৭ বার* ডিএফবি পোকাল: ৩ বার* উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ: ১ বার* ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ: ১ বার* উয়েফা সুপার কাপ: ১ বার* ডিএফএল সুপার কাপ: ৩ বার ব্যক্তিগত অর্জন * কনকাকাফ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার: ২০২১, ২০২২* বুন্দেসলিগা রুকি অব দ্য সিজন: ২০১৯-২০* উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ার: ২০২০* ফিপ্রো বিশ্ব একাদশ: ২০২০* কানাডিয়ান প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার: একাধিকবার* আইএফএফএইচএস ওয়ার্ল্ড টিম: ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ মাঠের বাইরের মানুষ ডেভিস আলফোনসো ডেভিস শুধু ফুটবলার নন, মানবিক কাজেও তিনি অনুপ্রেরণা। তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রথম ফুটবলার অ্যাম্বাসেডর এবং প্রথম কানাডিয়ান প্রতিনিধি। নিজের শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য কাজ করেন। কানাডার ফুটবলের প্রতীক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের সঙ্গে আলফোনসো ডেভিসকে বর্তমানে কনকাকাফ অঞ্চলের সেরা দুই ফুটবলারের একজন হিসেবে ধরা হয়। বিশ্ব ফুটবলে কানাডার পরিচয় বদলে দিয়েছেন তিনি। শরণার্থী শিবির থেকে উঠে এসে ইউরোপের সেরা ক্লাবের তারকা হওয়া- ডেভিসের গল্প শুধুই ফুটবলের নয়, এটি সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সফলতার এক অনন্য উপাখ্যান।
Go to News Site