Collector
Giriş Yap
বিশ্বকাপ ফুটবল: নন্দন থেকে বন্ধনের বিষাদযাত্রা | Collector
বিশ্বকাপ ফুটবল: নন্দন থেকে বন্ধনের বিষাদযাত্রা

বিশ্বকাপ ফুটবল: নন্দন থেকে বন্ধনের বিষাদযাত্রা

ফুটবল খেলার ইতিহাস হচ্ছে নন্দন থেকে বন্ধনের এক বিষাদযাত্রা। যখনই খেলাটি পরিণত হলো ইন্ডাস্ট্রি তথা শ্রমশিল্পে, তখন থেকে সৌন্দর্য হারাতে থাকে ফুটবল। কেউ কেউ আবার বলেন, ঘটনাবলীর সমষ্টিতেই ফুটবল, গোল হচ্ছে খেলাটির প্রাণবিন্দু।কবির ভাষায় সবুজ মাঠই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চ, যেখানে ২২ জন শিল্পী মাটিতে আঁকেন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর চিত্রকলা। লাতিন ফুটবল আর ইউরোপীয় ফুটবলের লড়াইটা সেই আদিকালেরই। বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল এগিয়ে গেছে খানিক ব্যবধানে। তবে ইতিহাস বলে ঔপনিবেশিক অঞ্চল ছাপিয়ে বিশ্বের বুকে রাজত্ব কায়েম করার ইতিহাস আছে লাতিন ফুটবলের শৈল্পিকতার সৌন্দর্য্যেরও।শৈল্পিক কারিকুরির নান্দনিকতায় পূর্ণ লাতিন ট্যাকটিক্স, নাকি গতির ঝড় তোলা ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল? ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বে সেরা কারা, যে বিতর্ক চলমান সেই শতবর্ষ ধরেই। মহাদেশীয় ফুটবল ইতিহাসে লাতিন ফুটবলে আছে বনেদিয়ানা। যেখানে ফুটবলের মাঠেও পায়ের কারুকার্যে বেজে ওঠে শৈল্পিকতার সুর। আর ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলে আক্রমণ আর গতির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেয়ার মানসিকতা।জীবন ও ফুটবলের মধ্যে দারুণ মিল দেখেন আর্জেন্টাইন গ্রেট ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তার আত্মজীবনী ‘এল ডিয়েগো’তে তিনি লিখেছেন—‘জীবনের ব্যাপারে যেভাবে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ফুটবল মাঠে খেলার সময়ও একইভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়; এটা অনেকটা দুজনের মাঝে একজনকে বাছাই করে নেওয়ার মতো।’আর ব্রাজিলিয়ান গ্রেট পেলের ভাষায়, ফুটবল হলো জাদুকরী এক বিষয়। নিজের আত্মজীবনী ‘পেলে’তে তিনি লিখেছেন—‘ফুটবল সবসময়ই আলাদা। এটা দলীয় খেলা, এককভাবে কখনো খেলা যায় না। দলীয় সমন্বয়ের মাঝে একটা জাদুকরী ঐকতান সৃষ্টির মাঝেই এ খেলার সৌন্দর্য নিহিত।’ফুটবলপ্রেমী সাহিত্যিকদের তালিকা কিন্তু কম দীর্ঘ নয়। এ তালিকায় প্রথমেই আসবে আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যুর নাম। আলজেরিয়ার বস্তিতে কাটানো কঠিন শৈশবেই তিনি প্রেমে পড়েন ফুটবলের। স্কুলের বুট পায়ে দিয়ে তিনি যেন ফুটবল না খেলেন এ নিয়ে তার দাদির ছিল নিষেধাজ্ঞা। কারণ, দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারটির পক্ষে আরেক জোড়া স্কুল বুট কেনার সক্ষমতা ছিল না বললেই চলে। তবুও তিনি ফুটবল খেলতেন। গোলকিপার হিসেবেই সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে ১৭ বছর বয়সে আলজিয়ার্স রেসিং বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে খেলে আলোচনায় আসেন। কিন্তু সেই সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে চিরতরে ফুটবলকে বিদায় বলতে হয় এ মহান সাহিত্যিককে। ফুটবল নিয়ে তার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—‘নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদে আমার যা জ্ঞান, তার জন্য আমি ফুটবলের কাছে ঋণী।’ফুটবলের প্রতি তার অগাধ প্রেমের কারণে অনেকে তাকে ‘নোবেলজয়ী একমাত্র সাহিত্যিক ফুটবলার’ও বলে থাকেন। মৃত্যুর আগে আত্মজৈবনিক উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছিলেন কাম্যু, উপন্যাসের এক বালক চরিত্রের নাম ‘জ্যাক’। জ্যাকের জীবনে ফুটবলই ছিল সব। বলার অপেক্ষা রাখে না, জ্যাক আসলে কাম্যুরই শৈশবের প্রতিচ্ছবি।ফুটবল ভালোবাসতেন নোবেলজয়ী জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসও। আক্রমণভাগেই খেলতে পছন্দ করতেন তিনি। যদিও খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। ফুটবল নিয়ে তার আলোচনা-সমালোচনা ছিল সবসময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানির মানুষদের টিকে থাকার লড়াইকে ফুটবল খেলার সঙ্গে তুলনা করতে ভালোবাসতেন তিনি।শার্লক হোমসের স্রষ্টা ব্রিটিশ সাহিত্যিক আর্থার কোনান ডয়েলও জীবনের একটা সময়ে খেলেছেন ফুটবল। পোর্টসমাউথ অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাব নামের একটি অপেশাদার দলের গোলকিপার ছিলেন তিনি। ফুটবলের পাশাপাশি ভালো ক্রিকেটারও ছিলেন আর্থার কোনান ডয়েল। এ সময়ের আরেক পাঠকপ্রিয় বৃটিশ সাহিত্যিক জে কে রাউলিংও ভালোবাসেন ফুটবল। ইংলিশ লিগের দল ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেডের পাঁড় ভক্ত তিনি। প্রিয় দলের খেলা দেখতে মাঠে নিয়মিতই যান।ফুটবল নিয়ে বিরক্তি ছিল ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের। তিনি খেলাধুলা ভালোবাসলেও ফুটবলের সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদের সম্পৃক্ততাকে দেখতেন ঘৃণার চোখে। তার ভাষায় পৃথিবীকে অশান্তিতে ভরিয়ে দিতে চাইলে কয়েকটি রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে এক লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করলে সেটাই হবে যথেষ্ট! ফুটবল প্রসঙ্গে আইরিশ নাট্যকার অস্কার ওয়াইল্ডের কথাটিও মজার। তিনি বলেছেন, ‘ফুটবল হলো ভদ্রলোকের খেলা, কিন্তু এটি খেলে এক দল বর্বর অসভ্য মানুষ!’ফুটবলপ্রেমী আরও সাহিত্যিকের তালিকায় আছেন আরও অনেক নাম। যেমন—জ্যঁ পল সার্ত্রে, জ্যাক কেরুয়্যাক, অ্যান্থনি বার্গেস, ওয়াল্টার স্কট, ভ্লাদিমির নবোকভ, মার্টিন এমিস, সালমান রুশদি, জুলিয়ান বার্নসসহ আরও অনেকে। বিখ্যাত ফুটবলার ও কোচরা তাদের বর্ণাঢ্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন পাঠকপ্রিয় বেশ কিছু আত্মজীবনী। এসব গ্রন্থ পাঠকপ্রিয়তা যেমন পেয়েছে, তেমন তাদের লেখায় ধরা পড়েছে নিকট অতীতের না বলা ইতিহাস ও দ্রুত পরিবর্তনশীল আধুনিক সমাজের অনালোকিত কিছু অধ্যায়। এসব গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম ইয়োহান ক্রুয়েফের ‘মাই টার্ন’, জর্জ বেস্টের ‘ব্লেসড’, রয় কেনের ‘দ্য সেকেন্ড হাফ’, পাওলো মালদিনির ‘মুন্দেয়াল’, অ্যালেক্স ফার্গুসনের ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’, আর্সেন ওয়েঙ্গারের ‘মাই লাইফ ইন রেড অ্যান্ড হোয়াইট’ ইত্যাদি।কবি-সাহিত্যিকদের বেশ সমাদার পেরুতে। স্প্যানিশ ভাষার অন্যতম সেরা কবি সিজার ভায়েয়ো ও ষোড়শ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ গার্সিলাসোর নামে দুটি প্রথম সারির ফুটবল ক্লাব আছে দেশটিতে।লেখক: ইউনুস রাজু, চিফ অফ আউটপুট, সময় টেলিভিশন

Go to News Site