Somoy TV
সরকারের প্রথম ১০০ দিন সাধারণত কোনো মন্ত্রীর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের একটি প্রাথমিক সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং জনসেবার জন্য নেয়া সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হলো - এসবের ভিত্তিতে প্রাথমিক বিশ্লেষণ করা হয়।সেই দিক থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে যেমন কিছু সাফল্য আছে, আছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাও। বাংলাদেশের সড়ক খাত দীর্ঘদিন ধরে যানজট, দুর্ঘটনা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সমালোচিত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে বছরে জিডিপির প্রায় ৫.১ শতাংশ ক্ষতি হয়। ফলে নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বড় পরীক্ষা ঈদযাত্রা দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক মাসের মধ্যেই পবিত্র ঈদুল ফিতরের যাত্রা ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তখনো নতুন সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি এবং বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এমন পরিস্থিতিতে কোটি মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখা কঠিন হলেও আগাম প্রস্তুতি, মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, টোল প্লাজা ও ফেরিঘাটে বিশেষ ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে ঈদুল ফিতরে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এর কয়েক মাস পর ঈদুল আজহার যাত্রা ব্যবস্থাপনাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়। আরও পড়ুন: চালকের অদক্ষতা ও ত্রুটিযুক্ত গাড়ির কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা: সেতুমন্ত্রী বিশ্লেষকদের মতে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—দুই উৎসবেই মহাসড়ক সচল রাখা এবং পদ্মা ও যমুনা সেতুতে বিপুল যানবাহনের নির্বিঘ্ন পারাপার নিশ্চিত করা শেখ রবিউল আলমের প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কোরবানির পশু পরিবহনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কেবল সাধারণ মানুষের চলাচলই নয়, কোরবানির পশু পরিবহন ব্যবস্থাপনাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, হাওর অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী জেলা থেকে লাখ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া দেশের বিভিন্ন হাটে আনা হয়। এ অবস্থায় ভারি যানবাহনের চাপের মধ্যেও বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি ও হয়রানি প্রতিরোধ, এবং ফেরিঘাট ও সেতুগুলোতে পশুবাহী যানবাহনের অগ্রাধিকারভিত্তিক পারাপারের কারণে বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই পরিবহন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। পদ্মা ও যমুনা সেতুতে রেকর্ড টোল আদায় সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে পদ্মা ও যমুনা সেতুর ঈদকেন্দ্রিক যানবাহন ব্যবস্থাপনা। আরও পড়ুন: সময় মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে তা অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়: সড়কমন্ত্রী বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২১ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ১০ দিনে পদ্মা সেতু দিয়ে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫১৫টি যানবাহন পারাপার হয় এবং টোল আদায় হয় ৩৬ কোটি ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৯০০ টাকা। একই সময়ে যমুনা সেতু দিয়ে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৮২টি যানবাহন চলাচল করে এবং টোল আদায় হয় ২৭ কোটি ৬৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ দুই সেতু মিলিয়ে মাত্র ১০ দিনে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। ঈদযাত্রার সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে পদ্মা সেতু দিয়ে ৪৫ হাজার ৬০২টি যানবাহন পারাপার হয়, যার বিপরীতে ৫ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪৫০ টাকা টোল আদায় হয় যা সেতুটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ একদিনের টোল আদায়ের রেকর্ড। অন্যদিকে যমুনা সেতুতে একই দিনে ৫৬ হাজার ২৩৯টি যানবাহন পারাপার হয়ে ৩ কোটি ৮২ লাখ ৯৭ হাজার ৫০ টাকা টোল আদায় হয়। টোল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা শেখ রবিউল আলমের মেয়াদে টোল আদায়ে স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে ডিজিটাল টোল ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। টোল ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ এবং ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার কারণে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতাও বেড়েছে। মহাসড়কে যানজট ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি মন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু করিডর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং পদ্মা সেতু সংযোগ সড়কে যান চলাচল সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সক্রিয় দেখা গেছে। আরও পড়ুন: ধানমন্ডি এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে: সড়কমন্ত্রী যদিও রাজধানীর যানজট এখনো বড় সমস্যা, তবুও ঈদকেন্দ্রিক সময়ে মহাসড়কগুলোতে অতীতের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনার চেষ্টা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করে আসছে। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আধুনিক ও কার্যকর যোগাযোগ অবকাঠামো অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় শেখ রবিউল আলম চলমান সড়ক ও সেতু প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তদারকি, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের গতি বেড়েছে এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতিও সন্তোষজনক। নিরাপদ সড়ক এখনো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তবে সড়ক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখনো দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন এখনো প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি নিশ্চিত করা, পদ্মা ও যমুনা সেতুতে রেকর্ডসংখ্যক যানবাহন পারাপার ও প্রায় ৬৪ কোটি টাকার টোল আদায়, মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে গতি সৃষ্টিকে। তবে নিরাপদ সড়ক, দুর্ঘটনা হ্রাস, রাজধানীর যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে শেখ রবিউল আলমের পারফরম্যান্সকে ‘আশাব্যঞ্জক সূচনা’ বলা যায়।
Go to News Site