Collector
Giriş Yap
বাজেটে দাম কমতে ও বাড়তে পারে যেসব পণ্যের | Collector
বাজেটে দাম কমতে ও বাড়তে পারে যেসব পণ্যের

বাজেটে দাম কমতে ও বাড়তে পারে যেসব পণ্যের

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিপণ্যে কর-শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে, ফলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। অন্যদিকে সিগারেট, বিলাসবহুল গাড়ি ও আমদানি করা কাজুবাদামসহ কিছু পণ্যে করভার বাড়ানো হয়েছে, যা দাম বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ফলে কোন পণ্যে মিলবে স্বস্তি আর কোন খাতে বাড়বে খরচ—সেটিই এখন ভোক্তাদের প্রধান আগ্রহের বিষয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সংকটের মধ্যে দেশের মানুষ যখন স্বস্তির অপেক্ষায়, তখন আসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, চিকিৎসা সামগ্রী, প্রযুক্তিপণ্য ও পরিবেশবান্ধব খাতে খরচ কমে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যে করভার বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, সরকারের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। তবে একই সময়ে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বেশি। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমতে বা বাড়তে পারে— এর সম্ভাব্য পরিবর্তনের তালিকা প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসতে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ ব্যয় কমে দাম কিছুটা সহনীয় হতে পারে। আরও পড়ুন মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিলে গুনতে হবে বাড়তি কর শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া সব ধরনের মসলা ও খেজুর আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা হলে এসব পণ্যের দামও কমতে পারে। শিল্প খাতেও বড় ধরনের কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের স্তরও কমিয়ে আনা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং শিল্পপণ্যের মূল্যও কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভোজ্যতেল খাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১০ বছর করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হতে পারে। এর ফলে সরিষার তেলসহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে। আরও পড়ুন নজরদারি বাড়ছে ডিজিটাল লেনদেনে, আসছে টিআইএন-বিআইএন শর্ত স্বাস্থ্য খাতে একাধিক করছাড়ের প্রস্তাবে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমতে পারে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ওষুধ উৎপাদনের ৬৮টি কাঁচামালে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, ক্যানসারের ওষুধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে কর রেয়াত এবং হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট তুলে দেওয়ার প্রস্তাব চিকিৎসাসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে পারে। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করও ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের স্বস্তি আসতে পারে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনের ২২টি কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। মোবাইল সিমে ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট ভ্যাট বাতিল করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে নতুন সিমের দাম কমতে পারে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) রেভিনিউ শেয়ার ও লাইসেন্স ফির ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে কর ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো হলে টেলিকম খাতের ব্যয় কমবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নামানো হচ্ছে। রিফাইনারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে উৎসে কর ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানো হবে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আরও পড়ুন স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ছাড়া কোনো বাজেটই কার্যকর হবে না: শফিকুর রহমান নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহ দিতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, চার্জিং স্টেশন, ই-বাইক, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনেও ব্যাপক কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। সোনা ও স্বর্ণালংকার খাতে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তনের ফলে সোনার ব্যবসা আরও আনুষ্ঠানিক খাতে আসবে এবং বাজারে দামের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি, মনিটরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্যের আমদানিতে অগ্রিম কর কমানো হচ্ছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও কম্পিউটার উৎপাদনে কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব পণ্যের দাম কমবে না। স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যে করভার বাড়ানো হচ্ছে। আগামী বাজেটে সিগারেটের চারটি স্তরেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। নিম্নস্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চস্তরের ১৬০ টাকা এবং অতি-উচ্চ স্তরের ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর ওপরও উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে। আরও পড়ুন বাজেট ২০২৬-২৭ / ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিতে চায় সরকার দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় কাজুবাদাম আমদানির শুল্ক ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে আমদানি করা কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে। বিলাসবহুল পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলচালিত গাড়ির করভারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার গাড়ির করহার বৃদ্ধি ও অগ্রিম আয়কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশীয় মদের উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে সার্বিক শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে বাজেটে। বর্তমানে ইভির ক্ষেত্রে কর ভার প্রায় ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হারের প্রস্তাব আসতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। সেটিও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এছাড়া রড ও ইস্পাতজাত কিছু পণ্যে নির্দিষ্ট ভ্যাট বাড়ানো, আমদানি করা পাঙাশ ফিশ ফিলেটে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ, হেলিকপ্টারের ওপর বার্ষিক অগ্রিম আয়কর এবং জুয়ার আয়ের ওপর করহার ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে। আরও পড়ুন স্বাস্থ্যে বাড়তি বরাদ্দ, চিকিৎসার চিত্র বদলাবে কতটা সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপণ্য, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের করছাড় দেওয়া হলেও রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।  নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সংগতি রেখে বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে এনবিআরের কাঁধে তুলে দেওয়া হতে পারে ৬ লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের চাপ। বিগত অর্থবছরের অর্জন ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ এখন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ কারণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার একটা চাহিদা আছে। আর এই কারণেই সম্ভবত সরকার বিভিন্ন রকমের শুল্ক-কর ছাড়ের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। যদিও শুধু শুল্ক-কর ছাড়ই বিনিয়োগ বাড়ানোর একমাত্র নির্ণায়ক নয়। সেই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার, জ্বালানি সরবরাহ, জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা, লাইসেন্স ও নিবন্ধন পাওয়ার বিষয়গুলো সহজ করে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। এজন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে শুল্ক-কর ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু করছাড়ই যথেষ্ট নয়, ব্যাংক সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং লাইসেন্স-নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করে বিনিয়োগের বাধা দূর করাও জরুরি।— সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জাগো নিউজকে জানান, এক বাক্যে বললে, এবারের বাজেটে দেশের মানুষের জন্য শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটাই হলো মূল। দেশের মানুষকেই বাজেটের মূল ফোকাসে রাখা হয়েছে। মানুষের যাতে অসুবিধা না হয় ও বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের যে চাপ, সেটা যাতে কিছুটা হলেও কমাতে পারি সেটিই আমাদের লক্ষ্য। এবারের বাজেটে জনগণকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো এবং জীবনযাত্রা সহজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।— এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এসএম/এমএএইচ/

Go to News Site