Collector
চাকার নিচে পিষ্ট ঢাকা | Collector
চাকার নিচে পিষ্ট ঢাকা
Jagonews24

চাকার নিচে পিষ্ট ঢাকা

নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপটে ক্রমেই বদলে যাচ্ছে ঢাকার সড়কচিত্র। মূল সড়ক-অলিগলির বড় অংশই এদের দখলে। আদালতের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পরও থামেনি এর বিস্তার। কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রতিদিন বাড়ছে সংখ্যা। এ শহরের বুকে রীতিমতো পাথরের মতো চেপে বসেছে এই ত্রিচক্রযান। চাকার নিচে যেন পিষ্ট হচ্ছে ঢাকা। ঢাকার মতো একটি গতিশীল শহরের মূল সড়কে এমন অবৈজ্ঞানিক যান্ত্রিক যান চলতে পারে কি না তা নিয়ে রয়েছে নানান মত, গবেষণা। কর্মসংস্থান, জীবিকার প্রশ্ন সামনে এলেও সাধারণ জনগণ, নগর পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্টদের বড় অংশই চান এর নিয়ন্ত্রণ। রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা আব্দুর রহমান। বয়স ৩৫ ছুঁইছুঁই। এক যুগ আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন একই মহল্লার রাফসানাকে। বিয়ের পর প্যাডেলচালিত রিকশায় স্ত্রীকে নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াতেন। রাজধানীর সড়ক ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে/জাগো নিউজ কয়েক বছর পর এলো ব্যাটারিচালিত রিকশা। কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ায় এটি তখন তার কাছে মনে হয়েছিল নতুন সম্ভাবনা। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই সে ভাবনায় ছেদ পড়ে। ঢাকার রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণহীন আধিপত্যে একসময়ের ভালো লাগার বাহনটি এখন আতঙ্কের প্রতীক। সাহস পান না স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে। বেপরোয়া চলাচল করায় আগে মাথায় আসে দুর্ঘটনার চিন্তা। ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে মানসিকতার এ পরিবর্তন শুধু আব্দুর রহমানের একার নয়, ঢাকার লাখো মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। ঢাকায় এখন কত রিকশা চলে? বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০ ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন দেয়। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬৪ লাখ। বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ তিনচাকার ছোট যানবাহন নিবন্ধন ছাড়া চলাচল করছে। এসব যান সরকারের কাছে অবৈধ। তালিকায় আছে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক, পাখি ও সবশেষ সংযোজন ব্যাটারি বা ইঞ্জিনচালিত রিকশা। বিআরটিএর অফিসিয়াল তথ্য (মে ২০২৬ পর্যন্ত) অনুযায়ী, শুধু ঢাকা মেট্রো এলাকায়ই মোট নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ২২ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৯টি, প্রাইভেটকার ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯১৫টি, মাইক্রোবাস ও জিপ ২ লাখ ৩ হাজার ৯৬টি, পিকআপ ১ লাখ ২৭ হাজার ৮২৮, বাস ও মিনিবাস ৫৫ হাজার ১০৮, কাভার্ডভ্যান ও ডেলিভারিভ্যান ৭৩ হাজার ৮৯১টি। তিন চাকার রিকশা-অটোরিকশার কোনো হিসাব বিআরটিএর কাছে নেই। তবে বিভিন্ন সংস্থার মতে এ সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ। আরও পড়ুন ঢাকার সড়কের ‘বিষফোড়া’ ব্যাটারিচালিত রিকশা বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও জাইকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার তথ্যমতে, বিআরটিএর নিবন্ধিত ২২ লাখ যানবাহনের বাইরেও ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ অবৈধ বা অনিবন্ধিত যানবাহন চলাচল করে (যার মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও লেগুনা অন্যতম)। রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নগর জীবনে যানজট ও শৃঙ্খলাহীনতা সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।-ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শহরের আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা দরকার। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র ৬-৭ শতাংশ। এই সড়কে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত যান চলাচল করে ৪০ লাখের বেশি। একটি সূত্র বলছে, প্রতি মাসে ঢাকার সড়কে অন্তত ১৫-২০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা নামছে। তবে এর পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য কেউ দিতে পারেনি। যত্রতত্র পার্কিং করে দখলে রাখে সব সড়ক/জাগো নিউজ অভিযোগ আছে, এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, পুলিশ, আনসার ও নামসর্বস্ব কিছু সাংবাদিক টিনশেড গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নামাচ্ছে। তবে বেশিরভাগ রিকশার মালিক দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ রিকশা চলাচল করছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির তথ্যমতে এই সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। তবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট বৈধ নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশা মাত্র ২ লাখ ১৩ হাজার। সংস্থাটির কাছে ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো তথ্য নেই। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি ইনোভিশন কনসালটিং নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকার রিকশা-সংক্রান্ত যানবাহনের ৯০ শতাংশের বেশি এখন আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের বাইরে। মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাজধানীতে বিভিন্ন নকশার প্রায় ৪০ প্রকারের ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। যার অধিকাংশই সাধারণ প্যাডেল রিকশাকে রূপান্তর করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর কোনো নিরাপত্তা মান নেই এবং চালকদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত সীমিত। দুর্ঘটনার শিকার হলেও মানুষ প্রয়োজনে চড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা/জাগো নিউজ রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম ব্যাটারিচালিত রিকশাকে শহরের ‘লাস্ট মাইল ভেহিক্যাল’ যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকাকে যানজটের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ খাতটি বর্তমানে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তারা জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। আদালতের নির্দেশনায়ও থামেনি ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য ২০২৪ সালের ১৫ মে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপদেষ্টা পরিষদ ঢাকার রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘোষণার পর সড়ক অবরোধ শুরু করেন চালকরা। ব্যাটারি-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ সমাবেশ করে ২০ মে। সংগঠনের আহ্বায়ক ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেকুজ্জামান লিপন ওই সময় জানান, ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। এদিনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। আরও পড়ুন রিকশা-অটোরিকশা নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে: ডিএসসিসি প্রশাসক ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা আরও বাড়তে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এদের শৃঙ্খলায় আনার বিষয়টি আবার সামনে আসে। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা তিন দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা আবার রাজপথে আন্দোলনে নামেন। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ২৫ নভেম্বর চেম্বার আদালত সেই আদেশ স্থগিত করা হয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি এবং বিষয়টি আইনি অনিশ্চয়তায় পড়ে। স্বপ্ন ও বাস্তবতার ফারাকে চিঁড়েচ্যাপ্টা ঢাকা মাত্র এক দশক আগেও প্যাডেলচালিত রিকশা ছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান ও তুলনামূলক নিরাপদ বাহন। মানুষ নিশ্চিন্তে রিকশায় চড়তো। মূল সড়কেও তাদের আনাগোনা অতিরিক্ত পর্যায়ে ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। বর্তমানে ইলেকট্রিক থ্রি–হুইলার বা ব্যাটারিচালিত রিকশা নগর পরিবহনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি তাদের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে। এ রিকশাগুলো রাস্তার নিয়ম না মেনে প্রায়ই উল্টাপাল্টা বা ভুল পথে চলাচল করে, যা ট্রাফিক পুলিশের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।-ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান  সহজলভ্যতা ও কম খরচে চলাচলের সুবিধায় এটির বিস্তার ঘটালেও নিয়ন্ত্রণহীন যানজট, সড়ক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পরিবেশগত চাপ তৈরি করে নগর ব্যবস্থাপনায় তৈরি করেছে নতুন সংকট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ রিকশাচালক জীবন মিয়া। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আগে প্যাডেল রিকশা চালানোর সময় কষ্ট হইতো, অহন চাবি ঘুরাইলেই রিকশা চলে। কিন্তু রাস্তায় নামলেই পুলিশের ভয়ে বুকটা ধড়ফড় করে।’ আরও পড়ুন জনদুর্ভোগের নতুন সংযোজন ব্যাটারিচালিত রিকশা মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় যানজটে আটকা পড়া রিকশাচালক ফয়সাল হোসেন (২২) বলেন, ‘দুই বছর আগে জমি বন্ধক রাইখা ঋণ কইরা রিকশা কিনছিলাম। ভাবছিলাম ভালো ইনকাম হইবো। ঋণ পরিশোধ কইরা বন্ধক ছুডামু, ছোট একটা বোনরে বিয়া দিমু। কিন্তু এত রিকশা নামছে যে আমার স্বপ্ন আর পূরণ করতে পারতাছি না।’ অধিক লাভের আশায় প্রশিক্ষণ না নিয়েই ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে নামছেন চালকরা/জাগো নিউজ পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারের মধ্যবয়সী চালক আলম মিয়া মাত্র তিন মাস আগে গ্রাম থেকে ভালো রোজগারের আশায় ঢাকায় আসেন। কিন্তু এখানে এসে দেখছেন তীব্র প্রতিযোগিতা, তেমন আয়-রোজগার নেই। জীবন, ফয়সাল কিংবা আলমের মতো লাখ লাখ রিকশাচালকের স্বপ্ন ও বাস্তবতায় এমন ফারাক। তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে রাজধানী শহরের জীবন ওষ্ঠাগত। চাকার ভারে দিন দিন ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে ঢাকা। কমিয়ে দিচ্ছে মূল সড়কের স্বাভাবিক গতি। গলির মুখগুলো বন্ধ করে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করছে জটলা। নীতিনির্ধারকরা কী করছেন? ঢাকা শহরের কোন সড়কে কোন ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারবে কিংবা পারবে না তা দেখভাল করে সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ। স্থানীয় সরকার বিভাগ আবার সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে রিকশাকে শৃঙ্খলিতভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে কাজ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সড়কের মাঝ দিয়ে দিব্যি চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা/জাগো নিউজ এ বিষয়ে কথা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নগর জীবনে যানজট ও শৃঙ্খলাহীনতা সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।’ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাজধানীতে শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রিকশা ও অটোরিকশাকে নিবন্ধন এবং লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি। ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ঢাকা শহরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলতে পারে না। দীর্ঘ যানজটে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রিকশা, অটোরিকশা কিংবা ভ্যান বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে এসব যানবাহন অবশ্যই নিয়ম ও শৃঙ্খলার আওতায় আনতে হবে। যথাযথ ফিটনেস ও লাইসেন্স ছাড়া হাজার হাজার রিকশা সড়কে চলায় রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই সমস্যাটি দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত।-নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. জোনায়েদ কবীর সোহাগ জানান, তাদের কাছে শুধু নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশার তথ্য রয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা এখনো সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকায় তারা সরকারের নীতিগত চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘উত্তর সিটি করপোরেশন এ যাবতকালে ২৮ হাজার প্যাডেলচালিত রিকশার লাইসেন্স দিয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো লাইসেন্স আমরা দিই না। উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত যত রিকশা চলছে সবই অবৈধ।’ তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের আফতাবনগর ও সাতারকুল এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যাত্রাবাড়ী ও ঝিগাতলায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তায় পাইলট প্রকল্পের আওতায় নির্মিত কিছু সংখ্যক (১০-১৫টি করে) রিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। রাজধানীর সড়ক ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে/জাগো নিউজ অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকার বিধিমালা প্রণয়ন করছে। বর্তমানে বিধিমালাটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে রয়েছে বলেও জানান মুহাম্মদ হাবিবুল আলম। বিধিমালা হলে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জানা যায়, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার বিভাগ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ব্র্যাক এবং বুয়েটকে সম্পৃক্ত করে চালকদের প্রশিক্ষণ, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ও কিউআর কোডভিত্তিক লাইসেন্সিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধাপে ধাপে প্রায় ১০ লাখ চালককে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা ছিল। তবে সেটাও আলোর মুখ দেখেনি। ব্যাটারিচালিত রিকশা ট্রাফিক পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি তাদের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে। এ রিকশাগুলো রাস্তার নিয়ম না মেনে প্রায়ই উল্টাপাল্টা বা ভুল পথে চলাচল করে, যা ট্রাফিক পুলিশের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।’ অটোরিকশাগুলোতে ব্যবহৃত হর্ন অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং যন্ত্রণাদায়ক, যা রাস্তায় দায়িত্বরত পুলিশ ও সাধারণ মানুষ উভয়ের জন্যই সমস্যার সৃষ্টি করে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এ রিকশাগুলোর কারণে মূল সড়কে অন্য যানবাহন চলাচল ও ট্রাফিক ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। যদি এগুলো মূল সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া যায় তবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও অনেক বেশি মসৃণ ও সুন্দর হবে। আরও পড়ুন ব্যাটারিচালিত রিকশা গলার কাঁটা, দিনে গিলছে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মো. আনিছুর রহমান এ সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ ও মূল সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন। ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মতিউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের উচ্ছেদ না করে একটি সিস্টেমের মধ্যে আনার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এজন্য প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ও ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীসময়ে সেই উদ্যোগ আর বেশিদিন এগোয়নি।’ তার মতে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এ খাত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ, এটি লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নতুন ধরনের ‘মধ্যবর্তী প্রযুক্তি’ অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নতুন ধরনের ‘মধ্যবর্তী প্রযুক্তি’ হিসেবে দেখছেন। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘গণপরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও দ্রুত যাতায়াতের চাহিদার কারণে এটি নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগে একজন চালক যত সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতেন এখন ব্যাটারিচালিত বাহনে তার চেয়ে বেশি সম্ভব হচ্ছে। ফলে এটি একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি করছে, অন্যদিকে নগর অর্থনীতির বাস্তব চাহিদাও পূরণ করছে।’ অননুমোদিত রিকশায় বিশৃঙ্খলা ‘বর্তমানে প্রধান সড়কগুলোতে অননুমোদিত রিকশার সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। এ খাত দীর্ঘদিন ধরে একটি অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে বিকশিত হওয়ায় কার্যকর নীতিমালা ও তদারকির অভাব এখন প্রকট।’ বলছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এহসান। ঢাকার সড়কে নেমেছে বিভিন্ন ডিজাইনের ব্যাটারিচালিত রিকশা/জাগো নিউজ নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘অসভ্য যান’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘যথাযথ ফিটনেস ও লাইসেন্স ছাড়া হাজার হাজার রিকশা সড়কে চলায় রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই সমস্যাটি দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করতে সরকারকে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন, ‘ড্রাইভার কার্ড’ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।’ টেকসই সমাধান অধরা এ বিষয়ে কথা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও যানবাহন নির্ভরতার ফলে দীর্ঘকাল লালিত নৈরাজ্যজনিত রোগের লক্ষণ মাত্র। ক‍্যানসারের চিকিৎসায় যেমন প‍্যারাসিটামল কোনো ফল দেয় না, তেমনি ব‍্যাটারিচালিত রিকশা লাইসেন্স বা পরিচালনে অনিয়ম মোকাবিলায় নীতি বা আইনি ঘাটতি পূরণ করে তার সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ নিশ্চিত করা যদিও বা সম্ভব হয়, তারপরও মূল সমস‍্যার টেকসই সমাধান অধরাই থেকে যাবে।’ ‘ভরসা’ থেকে শেষ পর্যন্ত ‘আতঙ্ক’ ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, উত্তরা ও পুরান ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে নিয়মিত তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই যানগুলোর দ্রুতগতি ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে রাস্তা পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে স্কুল ছুটির পর শিশুদের নিয়ে রাস্তা পার হতে অভিভাবকদের আতঙ্কে থাকতে হয়। লালবাগের আব্দুর রহমানের কথায় ফেরা যাক। সেদিন যে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে তিনি ‘নতুন সম্ভাবনা’ ভেবেছিলেন সময়ের পরিক্রমায় আজ সেটিই তার প্রতিদিনের যাতায়াতে আতঙ্কের কারণ। রাজধানীর সড়ক ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে/জাগো নিউজ আব্দুর রহমান জানান, সম্প্রতি স্ত্রী রাফসানাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের রিকশার সামনে চলে আসে। বড় দুর্ঘটনা না হলেও বুকটা কেঁপে উঠেছিল তার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটা বুঝি যে এ বাহনটির সঙ্গে অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে নিয়ম ছাড়া লাগামহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকলে একদিন এ শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। তখন এর দায় কে নেবে?’ প্রগতি সরণি দিয়ে প্রতিদিনের মতো ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন ইকরামুল হাসান। বেসরকারি এ চাকরিজীবী বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুত চলার জন্য বেশ পছন্দ করতাম। তাছাড়া বসার জায়গা বড় হওয়ায় বেশ আরামদায়ক। কিন্তু সেদিন ব্যস্ত সড়কে গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল একটি রিকশা। যাত্রী ছিল দুজন। এক পর্যায়ে গাড়ির সামান্য ধাক্কায় ছিটকে পড়ে দুই যাত্রী গুরুতর আহত হন। আরেকদিন তিনি একই সড়কে আরেকজনের মৃত্যুও দেখেছেন। এসব দেখার পর তিনি আর ব্যাটারিচালিত রিকশায় ওঠেন না। ভরসার জায়গা থেকে এটা তার কাছে আতঙ্কের বাহন। সাত পর্বের ধারাবাহিকের পরের পর্বে থাকছে: ঢাকার সড়কের নতুন ‘যমদূত’ এমইউ/এএসএ/এমএফএ

Go to News Site