Jagonews24
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে নতুন দিগন্ত খুলেছে। এতে যাতায়াতের যেমন সময় কমেছে, তেমনি বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যাও। তবে সেই বাড়তি চাপ সামলানোর মতো সক্ষমতা তৈরি হয়নি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটিকে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের এখনও কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে মাদারীপুর অংশের সরু মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার লাখো মানুষ। বিশেষ করে মাদারীপুরের ৪৭ কিলোমিটার অংশ এখন দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। একদিকে সরু সড়ক, অন্যদিকে অবাধে চলাচল করছে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মাহিন্দ্র ও নসিমনের মতো ধীরগতির যানবাহন। ফলে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। ফাইলে বন্দি ৬ লেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। ২০১৮ সালে এ প্রকল্পের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়। তবে কয়েক হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিদেশি অর্থায়ন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা অর্থায়নে এগিয়ে না আসায় প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। আরও পড়ুনশেরপুরে সড়ক-সেতুর অভাবে দুর্ভোগে ৫০ হাজার মানুষউন্নত যোগাযোগে বিপন্ন পরিবেশস্বস্তির ঈদযাত্রায় বাধা ছয় লেন প্রকল্প এদিকে অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে সড়কের প্রস্থ ২৪ ফুট থেকে ৩২ ফুটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সেই কাজও কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। পদ্মা সেতুর পর বেড়েছে যানবাহনের চাপ সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর সেই সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩২ হাজারে পৌঁছেছে। কিন্তু যানবাহনের চাপ বাড়লেও মাদারীপুর অংশের ৪৭ কিলোমিটার সড়কের প্রস্থ এখনও মাত্র ২৪ ফুট। অথচ ফরিদপুর ও বরিশাল অংশে সড়কের প্রস্থ ৩২ ফুট। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, মহাসড়কের এ অংশই বর্তমানে পুরো রুটের ‘বটলনেক’ হিসেবে কাজ করছে। ফলে যানজট, ধীরগতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তিন চাকার দৌরাত্ম্যে বাড়ছে দুর্ঘটনা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশে প্রতিদিনই চলাচল করছে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মাহিন্দ্র ও নসিমন। দ্রুতগতির বাস ও ট্রাকের সঙ্গে এসব ধীরগতির যানবাহনের গতি পার্থক্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক সময় ওভারটেক করতে গিয়ে কিংবা সাইড দিতে গিয়ে দুর্ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। ট্রাকচালক জাহিদ হোসেন বলেন, এই সড়কে গাড়ি চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সরু রাস্তা, তার ওপর তিন চাকার যানবাহনের কারণে প্রায়ই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সড়কটি দ্রুত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এছাড়া চলতি বছরের শুরু থেকেই মহাসড়কের মাদারীপুর অংশে দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত ১৮ জানুয়ারি সদর উপজেলার ঘটকচরে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় ইজিবাইকের ৭ আরোহী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন নারী। এর এক সপ্তাহ আগে, ১৩ জানুয়ারি তাঁতিবাড়ি এলাকায় কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় দুই নারীসহ তিনজন নিহত হন। স্থানীয় সূত্র বলছে, গত পাঁচ মাসে মহাসড়কের মাদারীপুর অংশে অন্তত ৩০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩৫ জন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়রা মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। আরও পড়ুন৮৬ কোটি টাকার সেতুতে দুইবারে ভেঙে পড়লো ৭ গার্ডারউন্নয়নে ‘সমন্বয়হীনতার’ মাশুল গুনছে বান্দরবান পৌরবাসী ঢাকা থেকে মাদারীপুরে আসা যাত্রী ওহিদুজ্জামান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই এ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার দাবি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদিন মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।’ আরেক যাত্রী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মাদারীপুর অংশে রাস্তা অনেক সরু। আবার অনেক জায়গায় সড়কের পাশে মাটিও নেই। ফলে গাড়ি সাইড দিতে গেলেই সমস্যা হয়। এ কারণেই দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে।’ মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন আল রশিদ বলেন, মহাসড়কে নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। যাত্রী ও চালকদের সচেতনও করা হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটিভাগে ভাগ হয়ে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে আর্থিক জরিমানাও আদায় করছে। ভূমি অধিগ্রহণে ধীরগতি সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে মাদারীপুর অংশে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২৫৮ কোটি টাকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে সড়ক সম্প্রসারণের কাজও পিছিয়ে যাচ্ছে। মাদারীপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্সি মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জেলা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে টেকেরহাট থেকে ৬ কিলোমিটার অংশ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি অংশও করা হবে।’ মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ) জুয়েল আহমেদ বলেন, ঢাকা-বরিশাল সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে করে এই সড়কের দুর্ঘটনা কমে আসবে। এওয়াইএসএ/কেএইচকে/এমএস
Go to News Site