Jagonews24
পত্রিকার পাতায় ফুটফুটে একটা শিশুর ছবি। দেখেই মন ভরে যায়। হায়, কী দুর্ভাগ্য! এই শিশুটিকে ধর্ষণশেষে নির্মমভাবে খুন করেছে সোহেল রানা নামের এক বিকৃত মানসিকতার তরুণ। রোববার মিরপুরের এই তরুণের অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা হয় আদালতে। কাঙ্ক্ষিত রায়। সন্তোষ প্রকাশ করেছেন হত্যার শিকার শিশুর পিতা এবং তাঁর সঙ্গে প্রতিটি বিবেকবান মানুষ। আদালত প্রাঙ্গনে থাকা মানুষগুলোর চেহারায় স্বস্তির চিহ্ন। ঘটনার ১৯দিন পর এবং মাত্র ৬ কর্মদিবসে এত বড় চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণার পরও সঙ্গত কারণেই একটু থমকে যেতে হয়। রায় কার্যকর হবে তো? হলেও কত বছর পর শিশুটির পিতা দেখতে পাবেন, তাঁর কন্যার হত্যাকারীর বিচার পেয়েছেন তিনি? আদরের কন্যার দাফনের আগেই পিতা বলেছিলেন, তিনি বিচার চাইবেন না। ক্ষোভের কারণ ছিল-দেশে খুন ধর্ষণের বিচার হয় না,হলেও রায় কার্যকর হয় না। এমন যে পিতার ক্ষোভ সেই পিতাও প্রাথমিকভাবে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রায় পেয়ে। তবে নিশ্চিত বলা যায়-আবেগের সময়টা কেটে গেলে এই পিতা আগের কথাতেই ফিরে যাবেন। বলবেন, কী লাভ হবে বিচার চেয়ে? আপনারা কি শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবেন খুনির? মিরপুরের এই শিশুর হত্যার শাস্তি ভোগ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণ দেশের বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা। শুধু মিরপুরের শিশুটির পিতাই নয়,এমন ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ভাগ্যের লিখন মনে করে আদালতেও যায় না বিচার চাইতে। পরিসংখ্যান খুব একটা সুখকর নয়। বিচার হয়- রায় হয়, কিন্তু রায় কার্যকরের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে সবই থমকে দাঁড়ায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই দেশে গত ১০ বছরে ১১ হাজার ৯৩৪টি ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৬০৩১টি ( সূত্র- আইন ও সালিশ কেন্দ্র)। এটিই সঠিক সংখ্যা নয়। প্রায় অর্ধেক ঘটনায় বিচারও চায়নি। ভাবা যায়! বাবা মা কিংবা ধর্ষিতা নিজে এই নৃশংসতার জ্বালা নিজে সয়ে নেয়াকেই পরিণতি বলে মনে করতে বাধ্য হন। এই যে প্রায় ১২ হাজার ঘটনা, যা শুধু পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে, এতগুলো ঘটনায় মৃতের সংখ্যাও বিশাল। ৩১০ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা যে এর চেয়ে অনেক বেশি তা বলাবাহুল্য। এই মৃতদের অভিভাবক ও আত্মীয়-স্বজনের যে যন্ত্রণা তা নিরসনের কোনো পথই খোলা রইল না। এই প্রায় ১২ হাজার ঘটনার মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিলো সামান্য কিছু। তার মধ্যে মনে আসে ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলা। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ফেনির সোনাগাজীতে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাঁরই ছাত্রী নুসরাতকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এই ঘটনায় নুসরাতের মা মামলা করেন। প্রভাবশালী অধ্যক্ষ নুসরাতের মা-কে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। মামলা প্রত্যাহার না করায় অধ্যক্ষ নুসরাতকে প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নিয়ে হাত পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয় ১০ এপ্রিল। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ১৬ আসামীর সবাইকে আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন ওই বছরই অক্টোবর মাসে। সেই হিসাবে রায় হয়েছে ৭বছর আগে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে- এই ৭ বছরেও রায় কার্যকর হয়নি। উচ্চ আদালতে মামলা জটে আটকে আছে নুসরাতের খুনীদের রায় কার্যকর হওয়ার বিষয়টি। প্রায় ১২ হাজার মামলার মধ্যে কয়েকটি আছে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে নুসরাত কিংবা মাগুরার আছিয়ার মতো মামলাগুলো আছে। আছিয়াকেও কী নির্মমভাবে ধর্ষণ করে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিল হিটু শেখ নামের এক পাষণ্ড। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে গত বছরের ১৭ মে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। তখনও বিক্ষুব্ধ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছিল দ্রুত বিচারের রায় হওয়ার কারণে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ডেথ প্যানাল্টিগুলোর শুনানি হতে সময় লেগে যায় অনেক। বছরের পর বছর পরে থাকে উচ্চ আদালতে। আদালতে মামলা জট লেগেই আছে দীর্ঘদিন ধরে। সেখানে বছর ধরে শুনানী হয়। আইনি জটিলতার ফেরে অনেক আসামী আবার শাস্তি ভোগ করার পরিবর্তে সরকারি খাবার খেয়ে কারাগারে দিনাতিপাত করে। আদালতের পর্যবেক্ষণটি সাধারণ মানুষের অন্তস্থলে থাকা অনুভূতিরই বহিপ্রকাশ। শুধু মিরপুরের শিশুই নয় অতীতে এমন প্রতিটি ঘটনাতেই মানুষের মনকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। সমাজকে নাড়া দিয়েছে। আবার বিচার না হওয়া কিংবা বিলম্বিত হওয়ার কারণে সমাজে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হয়েছে। এই দেশকে সভ্য মানুষের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য করার প্রয়োজনে এই মুহূর্তে দ্রুত বিচার ও দ্রুত শাস্তি কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। আদালত নিজ গতিতে চলবে এটা স্বাভাবিক। ঘটনার বিষয় আদালতের চলার পথে তাগাদা দিতে পারে না। আদালত বছর ধরে শুনানী করে থাকে। আগের শুনানী বাদ দিয়ে নতুন শুনানী করতে চান না আদালত। আর এতেই ব্যত্যয় ঘটছে বিচার পাওয়ায়। আমাদের প্রচলিত আইন পথ বাতলে দেয় কিন্তু বাস্তবায়ন করার বিয়য়ে সরকার, আদালত জড়িত। আদালতের আবার সীমাবদ্ধতা আছে আইনের কাছে। কিন্তু সমাজে বিচারহীনতার কারণে এমন নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ছেই। দুয়েকটা ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে সেগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে একটু হৈচৈ হয় আবার কিছুদিন গেলে হৈচৈ বন্ধ হয়ে যায়। যেন কিছুই ঘটেনি। এমন পরিস্থিতিতে বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। আইনে বাধা না থাকলে আলাদা বেঞ্চ গঠন করে অন্তত ১০বছরের মধ্যে যেসব চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হয়েছে সেগুলোর শুনানীর ব্যবস্থা জরুরি। দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য হলেও ১০বছরের ১০টি মামলাকে বাছাই করে একবারে শুনানী এবং রায় কার্যকর করতে পারলে অধিক ফল পাওয়া যেতে পারে। হয়তো সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হলে আগামীতে ধর্ষণ কিছুটা হলেও কমে যেতে পারে। এসব নৃশংসতাগুলো সাধারণ মানুষকেই শুধু নাড়া দেয় না আদালতের পর্যবেক্ষণেও স্পষ্ট হয়। আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রায়েও তার প্রতিফলন ঘটেছে আদালতের দেওয়া পর্যবেক্ষণে। আদালত বলেছেন, ‘শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এ মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।’ আদালতের পর্যবেক্ষণটি সাধারণ মানুষের অন্তস্থলে থাকা অনুভূতিরই বহিপ্রকাশ। শুধু মিরপুরের শিশুই নয় অতীতে এমন প্রতিটি ঘটনাতেই মানুষের মনকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। সমাজকে নাড়া দিয়েছে। আবার বিচার না হওয়া কিংবা বিলম্বিত হওয়ার কারণে সমাজে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হয়েছে। এই দেশকে সভ্য মানুষের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য করার প্রয়োজনে এই মুহূর্তে দ্রুত বিচার ও দ্রুত শাস্তি কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। লেখক : সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। এইচআর/এমএস
Go to News Site