Jagonews24
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অবিলম্বে বিএনপির সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। কেননা, এসব চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। রোববার (৭ জুন) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘দেশ বাঁচাও বন্দর বাঁচাও আন্দোলন’ আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় তারা এসব কথা বলেন। সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদার সভাপতিত্বে সবায় স্বাগত বক্তব্যে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সবচাইতে আধুনিক, নিউম্যুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচাইতে আয়বর্ধক এবং সবচাইতে গতিশীল একটা বন্দর। এই বন্দরকে এই মুহূর্তে কারও কাছে ইজারা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। ‘কারণ এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে এটি পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতেও এটা যে কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত করবে। বিদেশিদের হাতে বন্দর তুলে দিলে বন্দরের সার্বভৌমত্ব স্পর্শকাতর বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তাসহ বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দেশ থেকে চলে যাবে।’ তিনি বলেন, আমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাবো এবং আমরা সবসময় চাইবো যে দেশীয় যেসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে তাদের সক্ষমতা যাচাই করে এ বন্দরকে তাদের দ্বারা পরিচালনা করা হোক। বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আমরা চট্টগ্রাম বন্দরকে হ্যান্ডেল করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি, যা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এটি আমাদের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির একটি চালিকা শক্তি ও হৃৎপিণ্ড। এটা কোনোভাবেই আমরা বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে পারি না। তিনি বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকারকে এ বিষয়ে চুক্তি বাতিল করতে হবে। কথা পরিষ্কার। এমনিতেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনক প্রতিষ্ঠান। যদি কোনো সীমাবদ্ধতা থেকে থাকে তবে সেটি উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। এটি আমাদের শেষ জায়গা। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও উন্নত করতে যা করা দরকার করা হোক। কিন্তু কোনোভাবেই বিদেশিদের হাতে লিজ দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে চিঠি চালাচালির কোনো বিষয় নয়। আমি বিশ্বাস করি সংসদে দেশপ্রেমিক সদস্যরা আছেন তারা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। সাইফুল হক বলেন, আজ ডিপি ওয়ার্ল্ড নামে যে কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে সেই কোম্পানির সঙ্গে আমেরিকার নৌবাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে সেটিও দাসত্বের তথা অধীনতামূলক চুক্তি। গত ৫৫ বছরে এমন চুক্তি বাংলাদেশে হয়নি। আশা করি সরকার এসব চুক্তি নিয়ে একটি ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে সব গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নিয়ে সংসদে খোলামেলা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। ভারত দ্বিচারিতা করছে অভিযোগ করে সাইফুল হক আরও বলেন, তারা নিজেদের নাগরিকদের জবরদস্তি করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যা আগ্রাসী তৎপরতা ও অন্যায়। এ ধরনের আচরণ অব্যাহত রাখলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়তে পারে। পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশু হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে রায় হলো, ভালো কথা। কিন্তু এমন আরও শিশু হত্যার বিচার এখনো হয়নি। সেগুলো নিয়েও এমন গতিতে বিচার হওয়া উচিত। না হলে সামাজিক অনাচার বন্ধ করা যাবে না। তিনি বলেন, আজ বিএনপির সরকারের সময় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে সিনেমা প্রচার করতে দেওয়া হয় না। এটি অগ্রহণযোগ্য। এমন বিষবৃক্ষকে বাড়তে দেওয়ার অবকাশ নেই। এগুলো দুর্বৃত্তপনা হিসেবে চিহ্নিত করা দরকার। তবে আমরা কোনো সাম্প্রদায়িক উসকানিতে পা দেবো না। কেননা সরকারকে বিপজ্জনক জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা কোনো সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফাঁদে পা দিতে চাই না। জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অর্থনীতির প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। আমরা বহু বছর ধরে দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন করে আসছি। অন্তর্বর্তী সরকার তো স্বার্থবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দিতে চায়। তারা তো ছিল অনির্বাচিত। এখন নির্বাচিত সরকার কেন সেই চুক্তি বহাল রাখবে? তাহলে ভরসা ও জবাবদিহি কোথায়? দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কারণ তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ফলে সরকারের উচিত হবে এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমাদের দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে কি না, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না। চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের সার্বভৌমত্বের জায়গা। আজ বিদেশিরা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করতে চায়। আমাদের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে, আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের ধারাবাহিকতা মাত্র। তো অন্তর্বর্তী সরকারের দেশপ্রেম থাকলে সেই চুক্তি বাতিল করতো। কিন্তু তারা সেটি করেনি। সেজন্য তাদের আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে দোষী করা। সময় পেলে ওই সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। বর্তমান সরকারের আরও উচিত হলো ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দরের অব্যবস্থাপনা দূর করে আরও সময়োপযোগী করা। প্রয়োজনে সংসদে আলোচনা করুন। সেই সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছে সেটিও স্বার্থবিরোধী। ‘অতএব সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে চুক্তি বাতিল করুন। শুধু ক্ষমতা রক্ষার জন্য এসব করেন সেটি হবে ভুল। কারণ জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় থাকতে হবে। কোনোভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউম্যুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়া যাবে না। আগে যেমন বলা হতো ইউনূস সরকার ছিল আমেরিকার তৈরি। তা না হলে বুঝে নিতে হবে এই সরকারও মেইড ইন আমেরিকা।’ বাসদের বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, সীমান্তে পুশইনের মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা করছে প্রতিবেশী দেশ। যদি কেউ অবৈধভাবে থেকে থাকে সে বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা দরকার। সেই সঙ্গে আহ্বান থাকবে যেন বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে লিজ দেওয়া না হয়। সভাপতির বক্তব্যে দেশ বাঁচাও বন্দর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছে। অথচ সেখানে বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই এখন দেশে নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সবার আগে বাংলাদেশ এই নীতিতে এগিয়ে যাবো। যেখানে মূলত দেশের স্বার্থ প্রাধান্য থাকবে। আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও উন্নত করতে চাই। সভায় গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য সৈয়দ হাসান মারুফ রুমি ও সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বিএনপি নেতা রাশেদ খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। কেএইচ/ইএ
Go to News Site