Collector
নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, হুমকিতে ২০ গ্রাম | Collector
নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, হুমকিতে ২০ গ্রাম
Somoy TV

নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, হুমকিতে ২০ গ্রাম

স্বচ্ছ, শীতল ও সবুজ জলধারা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সুনামগঞ্জের রূপেশ্বরী যাদুকাটা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। রাতের আঁধারে এক শ্রেণির প্রভাবশালীদের মদদে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করায় হুমকিতে পড়েছে বিশ্বখ্যাত জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান, ঘাগটিয়া ও মানিগাঁওসহ পূর্ব-পশ্চিম তীরের ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের বসতভিটে, গাছপালা এবং পরিবেশ-প্রকৃতি।স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের মদদেই প্রতি রাতে ড্রেজার ও সেইভ মেশিন দিয়ে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে শত শত নৌযানে বালু ভর্তি করে পাচার করা হচ্ছে। ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প, কাঁচা-পাকা সড়ক, শিমুল বাগানসহ ফলদ ও বনজ গাছের বাগান নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত দুই মাস ধরে স্থানীয়ভাবে তৈরি মেশিন, বেলচা, বালতি ও শ্যালু মেশিনের সেইভসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে দিন-রাত নদীর তীর কেটে বালু বোঝাই করা হচ্ছে। কখনো রাতের আঁধারে ড্রেজার বা বোমা মেশিন, আবার কখনো দিনে তীরে নৌকা নোঙর করে বেলচা ও বালতি দিয়ে তীরে গভীর গর্ত করা হচ্ছে। এতে পুরো তীর ধসে পড়ছে। শত শত কাঠের তৈরি বারকি ও স্টিলের নৌকা তীরে জড়ো হয়ে দিন-রাত বালু তুলছে। এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীরের ঘাগটিয়া, মানিগাঁও, লামাশ্রম, রাজাগাঁও, সোহালা, মিয়ারচর, বারিকটিলা, লাউড়েরগড়, বিন্নাকুলি ও গড়কাটিসহ ২০টি গ্রাম এখন চরম ঝুঁকিতে। এসব গ্রামের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতু, কৃষিজমি এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে। নদীর পাড় ভাঙনের শিকার অনেক বাসিন্দা তাদের ভেঙে যাওয়া বসতঘরের পুরোনো মরিচা পড়া ঢেউ টিন, বাঁশ-পালা ও কাঠের চটিসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী নৌকায় বোঝাই করে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। প্রভাবশালীদের মদদে বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট গ্রামবাসীর বসতভিটের একদম সামনে থেকে তীর কাটায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিন্ডিকেটের ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের বসতঘর, গোয়ালঘর, খড়ের ঘর থেকে শুরু করে রান্নাঘর, কৃষিজমি ও বাঁশবাগান সবকিছু বিলীন হচ্ছে। আরও পড়ুন: কবে চালু হবে সুনামগঞ্জের আইএইচটি ও নার্সিং ইনস্টিটিউট? তীর কাটার ফলে বিভিন্ন গাছগাছালির শিকড় মাটির গভীর থেকে নদীর পানিতে দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও আস্ত বাঁশঝাড় ধসে পড়েছে নদীতে। এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে সবুজ বৃক্ষরাজি শোভিত যাদুকাটা নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো একসময় মরুপ্রান্তর হয়ে উঠবে। এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে দেশের বৃহত্তম জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগানও এখন বিলীন হওয়ার পথে। বাগানের কয়েক হাজার শিমুল গাছ ও লেবু বাগান নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বাগানের উত্তর ও পূর্ব দিকে নদী ক্রমশ এগিয়ে আসছে। পূর্ব দিকে আর মাত্র ১০০ মিটার তীর কাটলেই বাগানের সামনের অংশ নদীতে তলিয়ে যাবে। ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া যাদুকাটা নদীর প্রস্থ একসময় ছিল মাত্র ৫৭ মিটার। কিন্তু বিগত তিন দশকে অনবরত তীর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে নদীটির প্রস্থ সর্বনিম্ন ২০০ মিটার থেকে সর্বোচ্চ ১ কিলোমিটার ছাড়িয়েছে। নদী রক্ষা এবং বালু মহালের ইজারা বাতিল করে এই এলাকাকে পরিবেশ প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণার দাবিতে সুনামগঞ্জ ও সিলেটে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। তারা এই বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আরও পড়ুন: আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ঘোষণা তবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিবেশ দফতরের পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম আদালতের আদেশের অজুহাত দেখান। তিনি বলেন, ‘আদালতের আদেশের কারণে আমরা বোমা মেশিন, ড্রেজার ও সেইভ দিয়ে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছি না।’ সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, ‘তীর কেটে বালু উত্তোলন বন্ধ করা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।’ অবশ্য সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান নদীর পাড় কাটা বন্ধে সকল বাহিনী মিলে যৌথ অভিযানের উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এখন থেকে জরিমানার পরিবর্তে কারাদণ্ড দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (৫ জুন) যাদুকাটা নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের সময় তীর ধসে বালুচাপায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

Go to News Site