Collector
মেসি আছেন, ক্ষুধা কি আছে? আর্জেন্টিনার সামনে বড় প্রশ্ন | Collector
মেসি আছেন, ক্ষুধা কি আছে? আর্জেন্টিনার সামনে বড় প্রশ্ন
Jagonews24

মেসি আছেন, ক্ষুধা কি আছে? আর্জেন্টিনার সামনে বড় প্রশ্ন

১৯৩০ সালে শুরু হয় ফুটবল বিশ্বকাপ। এখন পর্যন্ত ২২টি আসর মিলিয়ে মাত্র ৮টি দেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে। এর মধ্যে শুধু ব্রাজিল ও ইতালি টানা দুইবার শিরোপা জিততে পেরেছে। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮, দুই আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি। আর ব্রাজিল টানা দুইবার শিরোপা জেতে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে। গত আসরে টানা দ্বিতীয় ফাইনাল খেললেও শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি ফ্রান্স। এবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল ও ইতালির পর লিওনেল মেসিদের সামনে এখন টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতার হাতছানি। কিন্তু উপরের পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়, ফুটবল বিশ্বকাপে টানা দুইবার শিরোপা জেতা কতটা কষ্টকর। ২০২২ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। এর আগে তারা ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে শিরোপা জিতেছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিরোপার মধ্যে ৩৬ বছরের ব্যবধান ছিল, যা বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ অপেক্ষা। এর চেয়েও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল শুধু ইতালিকে—১৯৩৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত, মোট ৪৪ বছর। তবে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল আন্দ্রেস মেসি নিজেই তো সব অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ার কারিগর! তাইতো ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের কেন্দ্রীয় চরিত্র, নিজ দলের প্রানভোমরা। গত তিন বিশ্বকাপের ২টাতেই আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলছে, একটা জিতেছেও। এছাড়া টানা দুইবার কোপা আমেরিকা জিতেছে, মাঝে আবার ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে উড়িয়ে ফাইনালিসিমায়ও জিতেছে মেসি-মার্টিনেজরা। ফলে আর্জেন্টিনা দলকে ঘিরে প্রশ্ন এখন অবধারিত, তারা কি বর্তমান আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল, নাকি শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে থাকা এমন এক চ্যাম্পিয়ন, যারা ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! বিশ্বকাপ শিরোপা রক্ষার মিশনে নামার আগে আর্জেন্টিনা ঠিক এমনই এক আকর্ষণীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে আলবিসেলেস্তেরা কাতার বিশ্বকাপ জিতে ৩৬ বছরের অপেক্ষার ইতি টেনেছে। এর সঙ্গে দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপাও নিজেদের করে নিয়েছে তারা। সেই সফল দলের মূল কাঠামো এখনও অটুট, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, টুর্নামেন্ট চলাকালীন ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া মেসি আগের মতো প্রভাবশালী নন। গত ৩ বছর ধরে খেলছেন অখ্যাত মার্কিন লিগ মেজর লিগ সকারে (এমএলএস)। আরেকটি প্রশ্নও রয়েছে- আগের আসরে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারও কি একই ক্ষুধা ও তাড়না নিয়ে মাঠে নামতে পারবে দলটি? ফলে প্রশ্ন উঠছে- দলে তারকার অভাব না থাকলেও, দীর্ঘদিনের এই ‘নিয়ন্ত্রক’কে পূর্ণ ছন্দে না পেলে আর্জেন্টিনা কি আগের মতোই ভয়ঙ্কর শক্তি হয়ে থাকতে পারবে? এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন আনহেল ডি মারিয়াও। ফলে এবার দলের অন্যদের সামনে নিজেকে আরও বেশি প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে। এটা সত্য যে, মেসির প্রভাব কিছুটা কমলেও গোল করার মতো খেলোয়াড়ের অভাব নেই আর্জেন্টিনার। হুলিয়ান আলভারেজ ও লওতারো মার্টিনেজ বড় মঞ্চে নিজেদের কার্যকারিতা বহুবার দেখিয়েছেন। মাঝমাঠে সৃজনশীলতার বড় উৎস এনজো ফার্নান্দেজও আছেন দুর্দান্ত ছন্দে। এ ছাড়া তরুণ নিকো পাজ ও ভ্যালেন্তিন বার্কো বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। গত আসরে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পিছনে রক্ষণভাগের অন্যতম অবদান ছিল। রদ্রিগো ডি পল, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজরা মিলে রীতিমতো আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। এর সঙ্গে গোলপোস্টে দেয়াল বানানো এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তো ছিলেনই। তবে এবার রক্ষণভাগ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ আছে। চোটের কারণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, ফলে সেন্টার-ব্যাকে কে খেলবেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিয়মিত লেফট-ব্যাক নিকোলাস তালিয়াফিকোরও মৌসুমের শেষটা খুব একটা ভালো কাটেনি। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজও সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত ভুল করেছেন। এমনকি ডান হাতে চোট নিয়েই বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। তবে দৃঢ় মানসিকতা এমিকে বাকিদের চেয়ে অনেকখানিই এগিয়ে দিয়েছে। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক টাইব্রেকারে ৩৩টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে তিনি ১০টি ঠেকিয়েছেন, আরও দুটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। গত বিশ্বকাপেও তার বদৌলতে কোয়ার্টার ফাইনাল ও ফাইনালে টাইব্রেকারে জিতেছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে অধিনায়ক লিওনেল মেসি এবার খেলতে যাচ্ছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, যা পুরুষ ফুটবলে একটি রেকর্ড। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও একই কীর্তিতে নাম লেখাবেন। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে দাপটের সঙ্গে খেলেছে আর্জেন্টিনা। তারা দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইকুয়েডরের চেয়ে ৯ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব পালমেইরাসের ফরোয়ার্ড হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ গত ২০ বছরে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পাওয়া প্রথম ব্রাজিল-ভিত্তিক আর্জেন্টাইন ফুটবলার। এর আগে সর্বশেষ এই কীর্তি গড়েছিলেন কার্লোস তেভেজ ও হাভিয়ের মাসচেরানো, যারা তখন করিন্থিয়ান্সে খেলতেন। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে লিওনেল মেসি বলেছিলেন, সেটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু কোচ স্কালোনি তখনই ভিন্ন সুরে কথা বলেছিলেন। ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর তিনি বলেছিলেন, ‘মেসির জন্য দরজা সবসময় খোলা থাকবে।’ মেসি এরপর আর অবসর নেননি, নেতৃত্ব দিবেন এই বিশ্বকাপেও। তবে এর মধ্যেও আর্জেন্টিনাকে নানা বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, দলটি প্রস্তুতিতে কিছুটা আত্মতুষ্টির পরিচয় দিয়েছে। মার্চের আন্তর্জাতিক বিরতিতে তারা প্রীতি ম্যাচ খেলেছে মৌরিতানিয়া ও জাম্বিয়ার বিপক্ষে, যাদের র‌্যাংকি ছিল যথাক্রমে ১১৫ ও ৯১। বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচগুলোও তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ হন্ডুরাস ও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে। জাম্বিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর এক সাংবাদিক প্রতিপক্ষের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে সংবাদ সম্মেলন থেকে বের করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ২০২৩ সাল থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ঘিরে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও একটি বিতর্কে জড়িয়ে আছে। অতীতে এমন অস্থির সময়ে দল মাঠে ও মাঠের বাইরে মেসির দিকেই তাকিয়ে থাকত। তবে এবার মনে হচ্ছে, এই বিশ্বকাপই হতে পারে নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের মঞ্চ। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে দল কতটা সফলভাবে মানিয়ে নিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে শিরোপা রক্ষার সম্ভাবনা। এসকেডি/আইএইচএস/

Go to News Site