Collector
ব্লান্ডার-জুগজুয়াং-স্টেলমেট: তিন শব্দে ইরান বনাম মার্কিন যুদ্ধ | Collector
ব্লান্ডার-জুগজুয়াং-স্টেলমেট: তিন শব্দে ইরান বনাম মার্কিন যুদ্ধ
Jagonews24

ব্লান্ডার-জুগজুয়াং-স্টেলমেট: তিন শব্দে ইরান বনাম মার্কিন যুদ্ধ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে তেল বাণিজ্যে বাধা থামিয়ে দিয়েছে সভ্যতার চাকা, স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেলের দাম বেড়েছে, কমেছে নাগরিক জীবনের গতি। তবে, স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? তাই ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ সাহস নিয়ে লড়েছে ইরান। এই যুদ্ধ যেন বিভক্ত ইরানিদের একতাবদ্ধ করেছে। আজ ইরান বনাম ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের ১০০তম দিন। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ইরান বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ক্ষেত্র সাজানোর কাজ শুরু ২০১৮ সাল থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ মে ইরানের সঙ্গে ওবামা প্রশাসনের করা পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করা হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫ দেশ, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (P5+1 + EU) সঙ্গে এই চুক্তি করেছিল ইরান। এরপর ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর পরমানু ইস্যুতে হুমকি দিতে থাকেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছর জুনে ১২ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও চলতি বছর তা দ্বিগুন আকারে ফিরে আসে। এই বছরের গোড়ার দিকে ইরানে আন্দোলন শুরু হলে নতুন একটি সুযোগ পায় যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিকল্পনা ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিলে আন্দোলনকারীরা ক্ষমতার আসনে বসতে পারবে। তবে, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এই পরিকল্পনায় সম্মতি না দিলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে বসেন ট্রাম্প। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ‘এপিক ব্লান্ডার’ ‘ব্লান্ডার’ শব্দটি দাবা খেলায় বহুলভাবে ব্যবহৃত হয় যা মারাত্মক কোনো ভুল চালকে নির্দেশ করে। প্রতিপক্ষের ট্যাকটিক্যাল হুমকি বুঝতে না পারা, গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি অকারণে হারিয়ে ফেলার মাধ্যমে পুরো গেমের ফলাফল বদলে দেয়।পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি অভিযোগ এনে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথবাহিনী। জেনেভা শহরে আলোচনার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের চালানো এই অভিযানের নাম রাখা হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। তবে যুদ্ধের প্রথম দিনই যুদ্ধাপরাধের মতো ঘটনা ঘটিয়ে তা ‘এপিক ব্লান্ডারে’ পরিণত করে যুক্তরাষ্ট্র। মিনাব শহরে অবস্থিত শাহজারাহ তায়্যিবাহ স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ট্রাম্প প্রশাসন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৮ জন শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়। এর ফলে যুদ্ধের শুরুতেই বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। একই দিনে আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ বেশকিছু শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা একটি ‘ক্ষমার অযোগ্য যুদ্ধাপরাধ’ বলে বিবৃতি দেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই। এদিকে, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই সীমান্তবর্তী লেবাননে পুরো মাত্রায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল যা এখন পর্যন্ত চলছে। ইরানের সাহসী প্রতিরোধ কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার শক্তিই হয়ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সঙ্গে যুদ্ধে নামার জন্য ইরানিদের সাহস যুগিয়েছিলো। ইরান ২৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন ট্রু প্রমিজ নামে পাল্টা হামলা শুরু করে। যুদ্ধের শুরুতেই দক্ষতার সাথে বেশ কৌশলি অবস্থান নেয় ইরানে সামরিক বাহিনী। দেশটি নিজেদের তৈরি সস্তা ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলে মুহুর্মুহু হামলা চালায়। এই সস্থা ড্রোন হামলা ঠেকাতে আয়রন ডোম ও থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যা দিন বাড়ার সাথে সাথে খরচের পাল্লাও ভারী করতে থাকে। তবে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পিছপা হয় ৮ মার্চের পর থেকে। ৮ থেকে ১১ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ও মিত্র ঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এসব হামলায় মার্কিন রাডার ও নজরদারি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হলে অক্ষ শক্তি মূলত অন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই মার্কিন রণতীর পারস্য উপসাগর এবং আরব সাগর থেকে দূরে সরে যায়। এরপর হামলা পাল্টা হামলা মধ্য দিয়ে মার্চ মাস পার হয়। এপ্রিলের শুরুর দিকে যুদ্ধ বিরতির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের তোড়জোড় শুরু হয়। যুদ্ধের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান টানা ৩৯ দিন দুর্বিষহ যুদ্ধে পর ৭ এপ্রিল ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি হয়। নিজেদের ১০ দফা প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে বিজয় হিসেবে উদ্‌যাপন করে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ইরানের বিজয় বলে একই বার্তা দেয় তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এবং হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন । বুধবার (৮ এপ্রিল) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, ইরানের শর্তে আলোচনায় রাজি হওয়া ‘ইরানের বিজয়’। এই চুক্তির মাধ্যমে সর্বপ্রথম ‘সাধারণ বুদ্ধির’ জয় হয়েছে। এরপর ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আলোচনায় বসে ইরান-মার্কিন প্রতিনিধি দল। তবে, সরাসরি বৈঠকে জন্য ইরান দুটি পূর্ব শর্ত দেয়। এই পূর্ব শর্তে, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত এবং অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স সহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি করা হয়। যুদ্ধবিরতি ও ‘জুগজুয়াং’ পরিস্থিতি দাবায় ‘জুগজুয়াং (Zugzwang)’ শব্দটি দ্বারা এমন এক জটিল পরিস্থিতিকে বুঝায় যেখানে চাল দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও খেলোয়াড়ের প্রতিটি সম্ভাব্য চাল তার অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তোলে। অর্থাৎ, যদি চাল না দিতে হতো তবে অবস্থান ভালো থাকত, কিন্তু বাধ্য হয়ে চাল দেওয়ার কারণেই বিপদ তৈরি হয়। সাধারণত এন্ডগেইমে এই কৌশলগত পরিস্থিতি বেশি দেখা যায়। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে আলোচনায় মতভেদ দেখা দিলে জুগজুয়াং পরিস্থিতিতে পরে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি নামে হরমুজ প্রনালিতে অবরোধ আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে বিশ্বব্যাপী তেল সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। ফলে, জুগজুয়াং পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করে যুদ্ধের সমাপ্তির পথে হাটতে বাধ্য করে। তবে, এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা পারমাণবিক ইস্যুটি বেশ উপযুক্ত। ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে এই শব্দের যথার্থতা রয়েছে। ইরান তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে যুদ্ধের এই অজুহাতকে মার্কিনিদের সামনে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ‘স্টেলমেট’ ও যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা দাবা খেলায় ‘স্টেলমেট (Stalemate)’ বলতে এমন একটি পরিস্থিতি নির্দেশ করে যেখানে যার চাল দেওয়ার পালা থাকে তার রাজা চেকের মধ্যে থাকে না, কিন্তু কোনো বৈধ চালও অবশিষ্ট থাকে না। সাধারণত চেকমেট করতে হলে রাজাকে চেকের মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু স্টেলমেটে রাজা চেকে না থেকেও চাল দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে খেলাটি জয়-পরাজয় ছাড়াই ড্র হিসেবে শেষ হয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে স্টেলমেট (stalemate) বলছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন বুঝাতে চাচ্ছে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে কোনো পক্ষই পুরোপুরি জিতছে না, আবার হারছেও না। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই বড় ক্ষতি করতে পারলেও ইরান টিকে আছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রঅ নিজেদের ক্ষতি মেনে পরাজয় মেনে নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পুরোপুরি দমন বা সরকার বদলাতে পারেনি। তাই সিদ্ধান্তমূলক জয় নেই। কেউই ‘ফিনিশিং ব্লো’ দিতে পারছে না। তাই যুদ্ধ এখন মধ্য পর্যায়ের স্থবির অবস্থায় আছে যা ট্রাম্পের ভাষায় লাইফ সাপোর্টে আছে। এই যুদ্ধে ইসরায়েলের ১৬ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন নিহত এবং ৩২৬ জন সেনা আহত হয়েছে। এদিকে ইরানের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন। বিশ্লেষকরা বলছে, এটা এখন নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ নয়, আবার শান্তিও নয়-একটা ধূসর (gray zone) অবস্থা। কেএম/ইফতেখার আলম

Go to News Site