Somoy TV
সুদূর আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল রা. কৃতদাস হয়ে এসেছিলেন আরবের অত্যচারী নেতা উমাইয়ার ঘরে। নবীজি সা. নবুয়ত লাভের পর আবু বকর রা. বেলাল রা. এর কাছে দাওয়াত পৌঁছালে কালবিলম্ব না করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে চলে আসেন বেলাল রা.।বেলাল রা. এর সাথে আবু বকরের মেলামেশা উমাইয়াকে সন্দিহান করে তুলে। এক পর্যায়ে তার ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারলে তার উপর নেমে আসে বর্বর উমাইয়ার পাশবিক নির্যাতনের স্টিম রোলার! কখনো দিনের প্রখর রোদে, মরুভূমির জলন্ত বালিতে শুয়াইয়ে, কখনো পাথর চাপা দিয়ে, কখনো বা গলায় রশি দিয়ে মক্কার অলিগলিতে হাঁটায়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো! আর বলা হতো, মুহাম্মদকে ছাড়ো, লাত-উজ্জাকে মানো। কিন্তু নবী প্রেমী, আল্লাহ প্রেমী বেলালের মুমুর্ষ কন্ঠে একটিমাত্র শব্দই উচ্চারিত হতো আহাদ, আহাদ! নির্যাতনে মৃত্যুর দোয়ারে গমন করা বেলাল একটি বারের জন্যও নিজের মুখ থেকে ছাড়েনি তার রবের নাম। ভুলে যায়নি তার নবী মুহাম্মদকে। বেলালের উপর এহেন বর্বরতা আবু বকরের কোমল হৃদয়ে দাগ কাটলো। এসব দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি নবীজীর এ মহান সহচর। পরক্ষনেই উমাইয়াকে প্রস্তাব দিলেন বেলালকে কিনে নিতে। দর কষাকষিতে বেলালকে মুক্ত করলেন আবু বকর রা.। আজ বেলাল রা. স্বাধীন। আজ তাকে তপ্ত দুপুরে পাথর ফাটা বালিতে শুয়াইয়ে রাখার কেউ নেই। আজ তার কোনো দুঃখ নেই। নেই কোনো বিয়োগ বেদনা। আছে শুধু নবীজীর পরম মমতা ও আবু বকরের অহর্নিশ ভালোবাসা। সেই পরম মমতা আর অহর্নিশ ভালোবাসা বেলালকে নবী প্রেমে ডুবিয়ে রেখেছিলো। আজানের নির্দেশনা অবতীর্ণ হলে বেলাল রা. হয়ে যান মুমিনদের নামাজে আহ্বানকারী মুয়াজ্জিন। নবীজি সা. নির্দেশ দিলে বেলাল আজান দিতেন। বেলালের আজানের সূর মুগ্ধ করতো মুমিনদের। মদিনার অলিগলিতে সূরের মুর্ছনায় মাতোয়ারা হতো মুমিন ক্বলব। আরও পড়ুন: ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি’ কবিতার অর্থমুমিনদের জীবনের সবচে কঠিনতম দিনটি এসে উপস্থিত হলো। যেদিন উমরের মতো শক্ত হৃদয়ের অধিকারী, যিনি কঠিন থেকে কঠিন মূহুর্তেও হিমালয়ের মতো অটল থাকেন, তিনি জ্ঞানশূন্য হয়ে মদিনার পথে পথে ঘুরেছেন নবীজির ইন্তেকালের দিন! নবীজি ইন্তেকাল করলে বেলাল নিজেকে ঠিক রাখতে পারেননি। তার মনে হল যার জন্য এতোদিন আজান দিতাম, যাকে ঘিরে আমার সুরের মূর্ছনা—আজ তিনি নেই। আমার এই আজান দিয়ে কী লাভ?(!) যেনো বেলালের এক মূহুর্তও থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। নবীজির বিয়োগ বেদনায় মর্মাহত বেলাল, এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না মদিনায়। সাথে সাথে মদিনা ছেড়ে পাড়ি জমালেন সুদূর দামেস্কে। সেখানে অবস্থান করছিলেন প্রায় ছয় বছর হতে চললো। একদা বেলাল স্বপ্নে দেখলেন, নবীজি তাকে বলছেন, বেলাল তোমার কি আমার কথা একটুও মনে পড়েনা? তুমি কি আমায় এভাবে ভুলে গেলে? তোমার কি মন চায় না আমার রওজায় এসে হাজিরা দাও? সকালে ঘুম থেকে উঠেই বেলাল পুটলিটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন মদিনার পথে। নবীজির প্রেমে বিভোর বেলাল এসে উপস্থিত হলেন সেই চিরচেনা মদিনায় রওজায়ে হাবিবে। পরক্ষনে নামাজের সময় হলে উপস্থিত লোকেরা তাকে আযান দিতে পীড়াপীড়ি শুরু করলো। কিন্তু নবীজির অনুপস্থিতিতে বেলাল আযান দেবার পাত্র নন। পরবর্তীতে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর অনুরোধে তিনি আযান দেয়া শুরু করলেন। সেই আযান! সেই মধুময় সময়! রসুলুল্লাহর স্মৃতি! সব একসাথে ভেসে আসা শুরু করলো মানুষের মানসপটে। সব মানুষ মনে করল, যেনো নবীজি আবার ফিরে এসেছেন! মদীনার ঘর থেকে লোকজন বেরিয়ে আসতে লাগলো। হযরত বেলাল যখন আযানে,আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসুলুল্লাহ বলতে গিয়ে প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়লেন, তখন পুরো মদিনা জুড়ে হুঁ হুঁ কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায়নি! আমরা তো নিজেদের নবী প্রেমিক বলি, আমরা কি কখনো তার জন্য কান্না করেছি? আচ্ছা, মনে করুন ত শেষ কবে কেঁদেছিলেন! ঠিক কবে? লেখক: শিক্ষার্থী, জামেয়া দারুল মা‘আরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম।
Go to News Site