Somoy TV
বিশ্বকাপে ২৪ বছরের শিরোপাখরা কাটানোর মিশনে আরও একবার ব্রাজিল ভরসা রাখছে নেইমারের ওপর। ৩৪ বছর বয়সী নেইমার তার চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের পর এবারও নেইমারকে ঘিরে প্রতিভার ঝলক ও বিশাল প্রত্যাশার চাপের পাশাপাশি রয়েছে শারীরিক অনিশ্চয়তার সেই পরিচিত গল্পও । ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে চোট বারবার তার পথ রুদ্ধ করেছে, আর এবারও সেই আশঙ্কা ঘিরে ধরেছে এমন এক টুর্নামেন্টে, যেটিকে তিনি নিজেই ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের গল্পের শেষ মহাকাব্যিক অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।হাঁটুর সমস্যার কারণে বাছাইপর্বের বড় একটা সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও ড্রেসিংরুমে তার গুরুত্ব একটুও কমেনি। সতীর্থরা যেমন তা জানেন, তেমনি জানেন কোচ কার্লো আনচেলত্তিও। ইতালিয়ান এই কোচের বিশ্বাস, ব্রাজিলের বহু প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন অনেকটাই নির্ভর করছে ১০ নম্বর জার্সিধারী এই তারকার ওপর। শুধু মাঠে তার অবদানের কারণে নয়, বরং দলের মধ্যে তিনি যে মানসিক শক্তি ও নেতৃত্বের প্রতীক, তার জন্যও।নেইমার নিজেও এই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব আড়াল করেননি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, 'দ্য লাস্ট ড্যান্স'। এই কথাটিই যেন তার বর্তমান অবস্থার সারাংশ; নেইমারের শেষটার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। এখন লক্ষ্য একটাই, সেরা শারীরিক অবস্থায় বিশ্বকাপে পৌঁছানো। কিন্তু সেই পথ মোটেও সহজ নয়।আনচেলত্তির বিশ্বকাপ দলে সবচেয়ে আলোচিত অন্তর্ভুক্তিগুলোর একজন ছিলেন বার্সেলোনা ও পিএসজির এই সাবেক তারকা। তবে তিনি ব্রাজিল শিবিরে যোগ দেন চোট নিয়েই। গত ১৭ মে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের এক ম্যাচে কাফে আঘাত পান তিনি। শুরুতে তার ক্লাব সান্তোস বিষয়টিকে সাধারণ ফোলা (এডিমা) বলে গুরুত্ব কমিয়ে দেখায়, ফলে তিনি ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দলে জায়গা পান। আরও পড়ুন: মাঠে লুটিয়ে পড়া এরিকসেনের স্বাস্থ্যের সবশেষ অবস্থা জানা গেলকিন্তু জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর মেডিকেল পরীক্ষায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আসে। এমআরআই স্ক্যানে তার গ্রেড-২ পেশির চোট ধরা পড়ে, যার জন্য দুই থেকে তিন সপ্তাহের পুনর্বাসন প্রয়োজন বলে জানানো হয়। ফলে পানামা ও মিসরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচগুলো মিস করতে হয়েছে তাকে। একই সঙ্গে ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তার খেলা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।নেইমার এখন সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াচ্ছেন। যদিও আশা এখনও বেঁচে আছে, তবে দলের ভেতরে ধারণা করা হচ্ছে গ্রুপ পর্ব চলাকালীন ধীরে ধীরে মাঠে ফিরতে পারেন তিনি। মরক্কোর বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের পর ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এরপর পাঁচ দিন বিরতি দিয়ে মায়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্ব শেষ করবে সেলেসাওরা। বর্তমানে সেই শেষ ম্যাচটিকেই নেইমারের প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে সম্ভাব্য সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতি আশাবাদ জাগাচ্ছে।ব্রাজিল দলের সর্বশেষ মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'নেইমারের পুনর্বাসন ভালোভাবেই এগোচ্ছে। ব্যক্তিগত অনুশীলনে তার উন্নতি দারুণ। এই সপ্তাহান্তে নতুন এমআরআই করা হবে এবং সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী সপ্তাহে তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলনে ফিরতে পারবেন।'এমনকি ৮ জুন বিশ্রাম শেষে দলীয় অনুশীলনেও তার ফেরার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত চোটগ্রস্ত খেলোয়াড় বদলানোর সুযোগ থাকায় ব্রাজিলে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে নেইমারের সম্ভাব্য বিকল্পদের নামও আলোচনায় আসে। তবে আনচেলত্তি দ্রুতই সেই বিতর্ক থামিয়ে দেন।নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত কিন্তু দৃঢ় ভঙ্গিতে তিনি বলেন, 'পরিষ্কারভাবে বলছি, নেইমার আমাদের সঙ্গেই থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি সে মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে। আর যদি না পারে, তাহলে হাইতির বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য অবশ্যই প্রস্তুত থাকবে।'আনচেলত্তির আত্মবিশ্বাস শুধু নেইমারের তারকাখ্যাতির কারণে নয়। এর পেছনে রয়েছে সান্তোসে তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও। মার্চের ফিফা উইন্ডোর পর তিনি অবশেষে ধারাবাহিকভাবে খেলার সুযোগ পান। ক্লাবটির খেলা ১৩ ম্যাচের মধ্যে ১০টিতে অংশ নেন এবং সাতটিতে পুরো ৯০ মিনিট খেলেন। এই সময়ে তিনি চারটি অ্যাসিস্ট করেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার প্রতিভা এখনও অটুট রয়েছে, যা ২৪ বছর পর আবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা ব্রাজিলের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। আরও পড়ুন: চোটের চিকিৎসায় নাসা-উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন নেইমারএদিকে দলের অন্য খেলোয়াড়রা প্রস্তুতি চালিয়ে গেলেও নেইমার নিউ জার্সিতেই বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি অনুসরণ করছেন। লক্ষ্য হলো, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব তাকে মাঠে ফেরানো। ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা হলো গ্রুপ পর্বের মধ্যেই তাকে খেলার মতো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, তবে এমনভাবে যাতে চোট পুনরায় না বাড়ে এবং তার শেষ বিশ্বকাপ হঠাৎ করেই শেষ হয়ে না যায়।এই লক্ষ্য পূরণে নেইমারকে নিবিড় তত্ত্বাবধানে বিশেষ অনুশীলন করানো হচ্ছে। তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্বে রয়েছেন চিকিৎসক ফেলিপে কালিল, ফিটনেস কোচ ক্রিস্টিয়ানো নুনেস এবং ফিজিওথেরাপিস্ট রাফায়েল মারতিনি। এই তিনজনই এখন ব্রাজিলের সবচেয়ে আলোচিত পুনর্বাসন প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু।কারণ বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই একটি দেশের প্রার্থনা এক জায়গায় এসে মিলছে; তাদের সবচেয়ে বড় তারকাটি যেন সময়মতো সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে পারেন, আর শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজের সেই বিখ্যাত নাচটি উপহার দিতে পারেন।
Go to News Site