শীর্ষ নেতাদের হত্যার পরও যুদ্ধের ময়দানে কীভাবে টিকে আছে ইরান
Somoy TV

শীর্ষ নেতাদের হত্যার পরও যুদ্ধের ময়দানে কীভাবে টিকে আছে ইরান

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের প্রবীণ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বহু শীর্ষ নেতা ও রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার নিহত হয়েছেন। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানের শাসকগোষ্ঠী তাদের কৌশল ও পরিচালনার সক্ষমতা এখনও ধরে রেখেছে।১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইসলামিক রিপাবলিক এমন এক কৌশলী ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেছে, যা গুটিকয়েক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করার বদলে ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেয়। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরও ইরানের বর্তমান ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে কারা রয়েছেন এবং কে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন, তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার হাতে কি সত্যিই ক্ষমতা আছে? ইরানের প্রবীণ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুদ্ধের একেবারে প্রথম দিকের এক হামলায় নিহত হন। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনি ছিলেন দেশের সব বড় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত মতামত দেয়ার অধিকারী এবং পুরো ব্যবস্থায় তার প্রতি ছিল প্রশ্নহীন আনুগত্য। ইরানের সরকারি মতাদর্শ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হলেন একজন বিজ্ঞ ধর্মীয় নেতা, যিনি শিয়া ইসলামের ১২তম ইমামের পক্ষে অস্থায়ী ক্ষমতার চর্চা করেন। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের বিশাল কর্মী বাহিনী সরকারের অন্যান্য অংশের ওপর সরাসরি প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দেয়। বর্তমানে খামেনির ছেলে মোজতবা এই পদের উত্তরাধিকারী হলেও, তিনি তার বাবার মতো স্বয়ংক্রিয় কর্তৃত্ব পাননি। রেভল্যুশনারি গার্ডের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে মোজতবা হয়তো প্রভাবশালী এই সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারেন। হামলায় আহত হওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ‘জানবাজ’ বা ‘আহত অভিজ্ঞ সেনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিয়োগের তিন সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি। শুধু দুটি লিখিত বিবৃতি দেয়া হয়েছে, যা তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আরও পড়ুন: ফোনালাপ ফাঁস: যেভাবে খামেনিকে হত্যার ছক কষেছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু রেভল্যুশনারি গার্ড কতটা কেন্দ্রীয় ভূমিকায়? কয়েক দশক ধরে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব বেড়েই চলেছে। তবে চলমান যুদ্ধ, আলি খামেনির মৃত্যু এবং মোজতবা খামেনির ক্ষমতা গ্রহণের পর এই বাহিনী কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্ব হারানোর মতো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল রেভল্যুশনারি গার্ড। তাদের একটি স্তরভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। প্রতিটি কমান্ডারের জন্য আগে থেকেই বিকল্প নাম ঠিক করা থাকে এবং প্রতিটি ইউনিট তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। যুদ্ধের শুরুতেই অনেক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হলেও, তাদের শূন্যস্থান পূরণে অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা প্রমাণ করেছেন যে, এই জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা সেই বাহিনীর গভীর কমান্ড কাঠামোর প্রতিফলন, যারা ১৯৮০-৮৮ সালের ইরাক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় ছায়া গোষ্ঠীগুলোর সাথে মিলে কাজ করছে। আরও পড়ুন: ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের, মুহূর্তেই কমল তেলের দাম রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী? ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধর্মীয় শাসনের পাশাপাশি একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্ট রয়েছে, যারা রেভল্যুশনারি গার্ডের সাথে মিলে দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়াত খামেনির প্রধান উপদেষ্টা আলি লারিজানির মৃত্যু শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তার বিস্তর অভিজ্ঞতা এবং বহির্বিশ্বের সাথে আলোচনার দক্ষতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে তার জায়গায় যারা আসছেন, তারা আগের নেতাদের চেয়ে আরও বেশি কঠোর হতে পারেন। বর্তমানে ইরানের নীতিনির্ধারক যারাআহমাদ ওয়াহিদি (রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান): তার আগের দুই উত্তরসূরি নিহত হওয়ার পর তিনি এই পদে নিয়োগ পান। তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কুদস ফোর্স পরিচালনা করেছেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।ইসমাইল কানি (কুদস ফোর্সের প্রধান): ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর তিনি এই ইউনিটের দায়িত্ব নেন। অত্যন্ত গোপনীয় এই ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রক্সি গোষ্ঠী ও মিত্রদের সাথে ইরানের সম্পর্ক বজায় রাখছেন।আলিরেজা তাংসিরি (রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌপ্রধান): ২০১৮ সাল থেকে দায়িত্বে থাকা এই অভিজ্ঞ কমান্ডার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।মোহাম্মদ বাকের কলিবফ (পার্লামেন্টের স্পিকার): সাবেক এই রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার এবং তেহরানের সাবেক মেয়র বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি বেশ সরব রয়েছেন।আয়াতুল্লাহ গোলামহোসেন মোহসেনি-এজেই (বিচারপতি প্রধান): ২০০৯ সালের গণবিক্ষোভ দমনে ভূমিকার জন্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত সাবেক এই গোয়েন্দা প্রধানকে প্রভাবশালী হিসেবে দেখা হয়।মাসুদ পেজেশকিয়ান (প্রেসিডেন্ট): ইরানের রাষ্ট্রপতির পদ আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, পেজেশকিয়ান দেশের সবচেয়ে সিনিয়র নির্বাচিত ব্যক্তিত্ব। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কারণে রেভল্যুশনারি গার্ডের ক্ষোভের মুখে তাকে নিজের মন্তব্য আংশিক প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।সাঈদ জলিলি (সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান): ইরান-ইরাক যুদ্ধে আহত এই নেতা ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। তিনি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী এবং সাবেক পরমাণু আলোচক।আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি (গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য): তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন শীর্ষস্থানীয় সদস্য এবং এতটাই বিশ্বস্ত যে, খামেনির মৃত্যুর পর ইরান পরিচালনার জন্য গঠিত তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলে তাকে রাখা হয়েছে।আব্বাস আরাগচি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী): এই প্রবীণ কূটনীতিক পশ্চিমা প্রতিপক্ষসহ রাশিয়া, চীন এবং আরব প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

Go to News Site