Jagonews24
৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন লাভে পদপ্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপিতে দৌড়ঝাঁপ স্বাভাবিক কারণেই একটু বেশি। গত নির্বাচনে ২০৯ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় তাদের দলের ৩৫জন নারী সংরক্ষিত নারী আসনে বসার সুযোগ পাবেন। আর সেই ৩৫ আসনের জন্য অর্ধসহশ্র আবেদন জমা পড়েছে বলে সংবাদ হয়েছে। তার মানে -যে আনন্দ উল্লাসের মধ্যে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে,তার রেশ এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু বৃহত্তর চিন্তায় এই উল্লাসকে অন্তত ২০২৬ সালে এসে জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রসর হওয়ার প্রমাণ বহন করে না। শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হবে, বৈষম্যপূর্ণ সমাজে এটা নারীর প্রতি অবিচার। আর এই অবিচারটা চলে আসছে যুগপরম্পরায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি ৭ নারীকে সংরক্ষিত নারী আসনে বসিয়ে এর যাত্রা। যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ১৫জনে উন্নীত করা হয়েছিলো। অবশ্য ১৯৭০ এর নির্বাচন কিংবা ১৯৭৩ এর নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনকে অনেকেই দয়ার দান বলে মনে করেন না। এর পেছনে যুক্তি দেখানো হয়, তখনো বাস্তবিক অর্থেই অস্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে ছিল নারী। যদি ২০২৬ সালে এসে ১৯৭০ কিংবা ১৯৭৩-এর নারীর অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা হয় তা কি যৌক্তিক হবে? বাংলাদেশের অর্ধেক জনসংখ্যার জন্য এই উপহারকে অনেক সময়ই দান বলে মনে হয়। স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম সংবিধানে নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছিলো। এরপর এই সংখ্যা ৩০-এ উন্নীত হয়। অষ্টম সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। এরপর ২০১১ সালের জুন মাসে পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত হয় এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। প্রতিবারই বলা হয়, পিছিয়ে পড়া অংশ হিসেবে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা করাটা নিয়েই কথা বলা প্রয়োজন জোরালোভাবে। যদিও ড.মুহম্মদ ইউনূস সরকার আমলে গঠিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নারী আসন সংখ্যা ৩০০ করার প্রস্তাব করেছিল নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন। এবং বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতারা দাবি করেছিলেন,অন্তত ১০০ আসন রাখা হোক নারীদের জন্য। সর্বশেষে পুরনো সেই ৫০ আসন বহাল রাখার পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই ৫০ নারী এমপি হবেন আগের মতোই রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছা অনুযায়ী। আইনগতভাবে তা বৈধ হলেও তারা যে সরাসরি জনমতের ভিত্তিতে পদ লাভ করবেন না এটাই বাস্তবতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত আর দলের মনোনয়নে এমপি হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন পুরুষ এমপির সমান বেতন-ভাতাদি পেলেও তাদের ভাগ্যে উন্নয়ণ বরাদ্দ জোটে ছিটেফোঁটা। কারণ হিসেবে অনেকেই বলেন এই এমপিগণকে জনগণের কাছে জবাব দিতে হয় না। তাই তাদের এলাকার উন্নয়ন চিন্তা ততটা না করলেও চলে। উল্টো তাদের দলের প্রতি অতিমাত্রায় আনুগত্য দেখাতে হয়। সংসদে হাত উঁচিয়ে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোট দিলেই চলে। অর্থ হচ্ছে,তারা এমপি হিসেবে সংসদে বসার সুযোগ এবং বেতন-ভাতাদি পেলেও মানসিকভাবে দুর্বল থাকতে হচ্ছে তাদের। এই সময় এসে একজন নারীকে যে মর্যাদা দেওয়া হয়, এটা অমার্যাদা হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারে। আবারও বলা প্রয়োজন নারী এখন আর আগের মতো পিছিয়ে নেই। বরং তাকে পিছিয়ে রাখার প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। পিছিয়ে রাখছে রাজনৈতিক দলগুলো। পর্যাপ্ত কর্মী এবং স্থানীয় নেতা থাকার পরও তাদের সামনে থেকে সিঁড়ি সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের দলের মাত্র এক তৃতীয়াংশ সদস্য নারীর জন্য সংরক্ষিত কিন্তু ছোট বড় কোনো দলেই ১০%ও নারী সদস্য নেই। এমনকি মনোনয়ন দেওয়ার সময়ও নারীকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার রেওয়াজটা বহাল আছে। এবারের বিজয়ী নারীদের দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। বিএনপি মাত্র ৯জনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তার মধ্যে খালেদা জিয়া দুটি আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন।এবং নির্বাচনের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মধ্যে ৬জন প্রার্থী পুরুষ প্রতিদ্বন্দীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উল্লেখযোগ্য ভোটাধিক্যে বিজয়ী হয়েছেন। অথচ প্রতিটি দলই নির্বাচনের আগে কমপক্ষে ৫শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাস্তবে কেউই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। অথচ বিজয়ীর হার দেখলে প্রমাণ হয় নারী প্রার্থীরা পিছিয়ে নেই। আবারও প্রমাণ হয়,তাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে। আবার বিজয়ী নারীদের পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে,তারা পারিবারিক সূত্রে মনোনয়ন পেয়েছেন। তার মানে হচ্ছে, নারী নেতা-কর্মী হিসেবে তাকে মূল্যায়ণ করা হয়নি। হয়েছেন স্বামী কিংবা বাবা এমন সূত্রে। অথচ প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নেতারা অহরহ নারী-পুরুষ বৈষম্য নিরসনের কথা বলেন,তারা নারীর সমমর্যাদার কাথা জোর গলায় উচ্চারণ করেন। বাস্তবতা যে উল্টো,তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতই যদি তারা নারীর মর্যাদা দিতে চান তাইলে সংরক্ষিত নারী আসনের আদল পাল্টাতে হবে। হয়তো সংরক্ষিত শব্দটি তারা রাখতেও পারেন। বর্তমান সংবিধানের আলোকে সংরক্ষিত নারী আসন রাখার আইনগত বাধ্যবাদকতা আছে,তাই এবারই যেন এর শেষ হয় সেদিকটি খেয়াল করতে হবে। সেইজন্য সংবিধান সংশোধন হোক। প্রশ্ন আসতে পারে সংবিধান সংশোধনের গাইডলাইন হিসেবে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু সংবিধান যে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী পুরোপুরি সংশোধন হচ্ছে না এটা ইতোমধ্যে বোঝা গেছে। তাই সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের কথা বলে তাকে বাদ দেওয়া ঠিক হবে বলে মনে করি না। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হোক- চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি দল ১৬% মানোনয়ন দেবে নারীদের। পরবর্তী ৩টি নির্বাচনে গিয়ে যাতে ৩০% এর বেশি হয় সেই ব্যবস্থাও থাকা দরকার বলে মনে করি। তাছাড়া উন্নয়ণ কর্মকাণ্ডে নারী এমপিদের আরও যুক্ত করার কৌশলও বের করতে হবে। এমনিতেই এমপিরা উন্নয়ণ বরাদ্দ পাওয়ার অধিকারী নন। তারপরও সেটাকেই তারা বড় করে দেখেন। অনেক সময় মনে হয়,সরকারগুলোও আইন প্রণয়নের চেয়ে উন্নয়ণ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বলা হয়-উন্নয়ণ সংশ্লিষ্ট না হলে এমপিদের জনপ্রিয়তা থাকবে না। যদিও স্থানীয় সরকার মাধ্যমেই উন্নয়ণ কাজ করা সম্ভব। তারপরও বলা দরকার,প্রচলিত ধারাতেই নারী এমপিদের সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো প্রয়োজন। যেসব দল তৃণমূলে নারী সদস্য ৩০% এর কম অন্তর্ভুক্ত করবে তাদের শর্ত পূরণে বাধ্য করার ব্যবস্থাও থাকা দরকার। তৃণমূলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে না পারলে ৫% মনোনয়নও দেওয়া সম্ভব হবে না। দলগুলো আন্তরিক হলে আগামী নির্বাচনের আগেই সুফল পাওয়া যেতে পারে। দেশের অর্ধেক মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংসদ সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করাটা কতটা যৌক্তিক তা এখনই ভাবতে হবে। লেখক-সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। এইচআর/এএসএম
Go to News Site