বছরের প্রথম ৩ মাসে পড়াশোনা ‘সামান্য’, সামনেও ছুটির ফাঁদ
Jagonews24

বছরের প্রথম ৩ মাসে পড়াশোনা ‘সামান্য’, সামনেও ছুটির ফাঁদ

শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছাতেই শেষ হয় বছরের প্রথম মাস জানুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহজুড়ে জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল। এরপর রোজা-ঈদের দীর্ঘ ছুটি, যা শেষ হবে ২৮ মার্চ। ফলে বছরের প্রথম তিনমাসে দেশের প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়েছে খুবই কম। পড়ে আছে সিলেবাসের দীর্ঘ পাঠ। সামনের দিনগুলোতেও রয়েছে লম্বা ছুটির ফাঁদ। ক্লাস কম হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শিখছে কম। শিখন ঘাটতি নিয়েই উঠে যাচ্ছে পরবর্তী ক্লাসে। এমন ঘাটতি নিয়ে এসএসসি-এইচএসসির পর স্নাতকও শেষ করছেন শিক্ষার্থীরা। এটিকে উদ্বেগজনক বলছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তিন মাসে ক্লাস-পড়ালেখা কতদূর এগোলো প্রতি বছর শিক্ষার্থীরা দেরিতে পাঠ্যবই পায়। এবার প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সব বই পেলেও মাধ্যমিকের ষষ্ঠ-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তা পায়নি। তাদের সব বই পেতে সময় লেগেছে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর জাতীয় নির্বাচনের কারণে ছুটি হয়ে যায়। নির্বাচনের পর চারদিন স্কুল খোলা ছিল। এরপর আবার পবিত্র রমজানের ছুটি শুরু হয়। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, মানিকগঞ্জ ও ঝালকাঠি জেলার অন্তত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৫ দিনে বই বিতরণসহ অন্য কাজে ক্লাস হয়নি। এরপর ১০ দিনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলেছে। পাশাপাশি সব বইও শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল না। এজন্য ক্লাসও হয়নি পুরোদমে। ফেব্রুয়ারিতে মাত্র পাঁচদিন ক্লাস হয়েছে। মার্চ মাস প্রায় পুরোটা ছুটি। এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে পুরোদমে ক্লাস শুরুর আশা করছেন তারা। শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি নিয়ে যখন আমরা কাজ করি, যে সব তথ্য-উপাত্ত সামনে আসে তা দেখলে গা শিউরে ওঠে। অথচ সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দপ্তর দেখেও না দেখার ভান করে। তারা দায়সারা কাজ করে নিজের মেয়াদকাল পার করে সরে পড়ে। এটা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা হতে পারে না।-রাশেদা কে চৌধূরী  ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বই পেতে দেরি হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টম, নবমের বই দেরিতে এসেছে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যস্ততা ছিল। কিছু ক্লাস হয়েছে। তবে নির্বাচন ও ছুটির কারণে সেভাবে ক্লাসে বসতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। আবার এনসিটিবি সিলেবাস পাঠাতেও দেরি করে। সবমিলিয়ে ঘাটতি আছে।’ রাজশাহীর সরকারি পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সালমা জাহান বলেন, ‘আমরা ক্লাসে খুব বেশি পড়ানোর সুযোগ পাইনি। বাধ্য হয়ে সিলেবাসের নির্ধারিত পড়া হোমওয়ার্ক হিসেবে দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা কতটুকু পড়বে ছুটিতে, তা নির্ভর করবে অভিভাবকদের সচেতনতার ওপর। তবে রোজা ও ঈদের ছুটিতে অনেকে গ্রামের বাড়ি যায়, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে যায়। এ কারণে সিলেবাসের পড়া দিয়ে দিলেও শিক্ষার্থীরা তেমন পড়তে পারে না। এ কারণে তিনমাস পার হলেও সিলেবাসের কিছুই শেষ হয়নি বলে ধরতে হবে।’ ঝালকাঠির একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহরিয়ার শুভ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাথমিকে জানুয়ারির ১৫ তারিখের মধ্যেই বই এসেছিল। এ কারণে আমরা ক্লাস নিয়েছি। তবে বার্ষিক ক্রীড়া, ভোট ও রোজার ছুটির কারণে সবমিলিয়ে ১৫-১৮ দিন পুরোদমে ক্লাস হয়েছে। ওই ক্লাসে যতটুকু সম্ভব পড়িয়েছি।’ মে-জুনে পরীক্ষা, তার আগেও ছুটির ফাঁদ জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—তিনমাস গেছে হেলায়-ফেলায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামনে এখন এপ্রিল ও মে—দুইমাস সময়। এরপরই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। সিলেবাস অনুযায়ী—পাঠ্যবইয়ের অর্ধেক অংশ এ দুই মাসেই শেষ করতে হবে। অথচ সেখানেও রয়েছে ছুটির ফাঁদ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৮ জুন থেকে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবমের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে, যা চলবে ১৩ জুলাই পর্যন্ত। আর দশম শ্রেণিতে হবে প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা। সপ্তাহে দুদিন ছুটি থাকায় মাসে এমনিতেই ক্লাসের দিন কমে যায়। বিভিন্ন দিবস ও উৎসবের ছুটি আছে। এগুলো আমরা কিছুটা কাটছাঁট করেছিলাম। রমজানে কিছুদিন খোলা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মানতে চাননি। তারপরও পাঠদান বাড়াতে কী করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি।-মাউশি মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বি এম আব্দুল হান্নান ছুটির তালিকা অনুযায়ী—২৯ মার্চ ঈদের ছুটি শেষে ক্লাস শুরু হবে। এরপর এপ্রিল ও মে মাসে চলবে পুরোদমে ক্লাস। এপ্রিলের ৩০ দিনের মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি আটদিন। আর বিভিন্ন দিবস; যেমন—ইস্টার সানডে, বৈসাবি উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চার দিনের ছুটি। ফলে এপ্রিলে ক্লাস হবে ১৮ দিন। মে মাসের প্রথমদিনই মে দিবসের ছুটি। এরপর ২৪ মে শুরু হবে ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। সেক্ষেত্রে ২১ মে পর্যন্ত ক্লাস চলবে। এর মধ্যেও থাকবে ছয়দিনের সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে পুরো মে মাসে ক্লাস হবে মাত্র ১৪ দিন। এপ্রিল-মে দুই মাস মিলিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস হবে মাত্র ৩২ দিন। এরপর ঈদুল আজহা ও গরমের ছুটি। ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে জুনে। জুনেই হবে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। অর্থাৎ পুরো পাঠ্যবইয়ের অর্ধেকটা শেষ করতে সর্বসাকুল্যে ৫০ দিনের ক্লাসও পাচ্ছে না মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম প্রান্তিক বা প্রথম সাময়িক পরীক্ষা আরও আগে। প্রাথমিকের ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ মে থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম প্রান্তিক পরীক্ষা শুরু হবে, যা চলবে ১৫ মে পর্যন্ত। আর ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ থেকে ক্লাস শুরু হবে। সেক্ষেত্রে মার্চের তিনদিন ও এপ্রিল মাসজুড়ে শুধুই পরীক্ষার আগে ক্লাস হবে। অর্থাৎ, মাত্র ১৮-১৯ দিনের ক্লাস পাবে শিক্ষার্থীরা। বাকি সময় যাবে ছুটির ফাঁদে। এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে বন্ধ থাকবে ক্লাস! ওপরের বর্ণনায় তো গেলো শুধুই শিক্ষাপঞ্জি ও ছুটির তালিকা অনুযায়ী হিসাব। এর বাইরেও রয়েছে নানান ফাঁদ। যেমন—ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। পরীক্ষার আগে ও পরীক্ষার দিনগুলোতে তাদের ক্লাস হবে না। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামী ২১ এপ্রিল। শিক্ষা বোর্ডগুলোর ঘোষণা অনুযায়ী—যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র থাকবে, সেখানে এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোনো ক্লাস নেওয়া যাবে না। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১ এপ্রিল থেকে মে মাসের পুরোটা সময় এসএসসি পরীক্ষার কারণে নিয়মিত ক্লাস হবে না। এতে শিক্ষাপঞ্জি ও ছুটির তালিকা মেনে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার আগে যে ৩২ দিনের ক্লাস হওয়ার কথা, সেটাও কমে ১৬-১৮ দিনে দাঁড়াবে। পাশাপাশি এপ্রিল-মে মাসে কালবৈশাখী ঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহসহ যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তাতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা, ছুটি কমানোর দাবি ছুটিসহ নানান কারণে বছরের অধিকাংশ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এতে সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। সচেতন অনেক অভিভাবক শিক্ষাপঞ্জিতে পরিবর্তন ও ছুটির তালিকা থেকে ছুটি কমানো প্রয়োজন বলেও মতামত দিয়েছেন। ঝিনাইদহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্কুল সারা বছর ছুটি থাকে। তারপর যে কয়দিন ক্লাস হয়, আমি অথবা আমার স্ত্রী মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসি। অধিকাংশ দিনই মেয়ে বলে, বাবা একটু দাঁড়াও নাম ডাকা (হাজিরা বা রোল কল) শেষ হলে ছুটি। আমাকে আবার নিয়ে যেও। ক্লাস হয় না, পড়াশোনা নেই। শুধু প্রাইভেট-টিউশনিতে যেটুকু শিখছে। স্কুলের ক্লাসে ওরা কিছুই শিখছে বলে মনে হয় না।’ শুধু মফস্বলের স্কুল নয়, খোদ রাজধানীর নামি অনেক স্কুলের অভিভাবকদেরও একই অভিযোগ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সবুজ বিদ্যাপীঠ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক রাবেয়া আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে গত বছর ক্লাস সিক্সে পড়েছে এ স্কুলে। এবার সেভেনে উঠেছে। ওদের তো সারাবছর ক্লাসই হয় না। এমন হলে বাচ্চারা কী শিখবে?’ ক্লাস-শিখন ঘাটতি রোধে করণীয় শিক্ষার মান বাড়াতে ক্লাসে পাঠদানের বিকল্প নেই। অথচ এ পাঠদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিন যতই গড়াচ্ছে ক্লাসে পাঠদানের মান কমছে, শিক্ষার্থীরাও কম শিখছে। পাঠ্যবই যাচ্ছে দেরিতে, শিক্ষক ক্লাসে আসছে না, একের পর এক ছুটি—এমন নানান সংকট।’ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি নিয়ে যখন আমরা কাজ করি, যে সব তথ্য-উপাত্ত সামনে আসে তা দেখলে গা শিউরে ওঠে। অথচ সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দপ্তর দেখেও না দেখার ভান করে। তারা দায়সারা কাজ করে নিজের মেয়াদকাল পার করে সরে পড়ে। এটা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা হতে পারে না। এর খেসারত দিতেই হবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বছরের অন্তত ছয়টি মাস (১৬০-১৮০ দিন) পুরোদমে পাঠদান চলা উচিত। সেটা শুধু মুখস্থ করানো পাঠদান নয়। ফলপ্রসূ শিক্ষা দিতে হবে। ক্লাসে পাঠগুলো এমনভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে, যেন শিশুরা বাসায় গিয়ে তা নিজেই পড়তে পারে। এর বাইরে পাঠ্যবইগুলো বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।’ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বি এম আব্দুল হান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সপ্তাহে দুদিন ছুটি থাকায় মাসে এমনিতেই ক্লাসের দিন কমে যায়। বিভিন্ন দিবস ও উৎসবের ছুটি আছে। এগুলো আমরা কিছুটা কাটছাঁট করেছিলাম। রমজানে কিছুদিন খোলা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মানতে চাননি। তারপরও পাঠদান বাড়াতে কী করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি।’ এএএইচ/এএসএ

Go to News Site