Somoy TV
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এর জেরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রচলিত ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে স্বর্ণের অস্বাভাবিক দরপতন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।সাধারণত তীব্র অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক বা আর্থিক অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ট্রেজারি, ডলার, সুইস ফ্রাঙ্ক এবং স্বর্ণের মতো সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এসব সম্পদকে দীর্ঘদিন ধরে মূল্য সংরক্ষণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়ে আসছে। কিন্তু এবারের সংকটে সেই চিত্র বদলে গেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অ-আর্থিক সম্পদ হিসেবে স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করা হলেও, বর্তমান সংকটে এটি সবচেয়ে খারাপ ফল করা সম্পদগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, উচ্চ-ফলনশীল ক্রেডিট, উদীয়মান বাজার কিংবা অপ্রচলিত ছোট বাজারের শেয়ার থেকেও পিছিয়ে পড়েছে স্বর্ণ। কার্যত কেবল রুপার চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে, যার দাম আগে থেকেই অতিরিক্ত জল্পনাভিত্তিক লেনদেনের কারণে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট যেভাবে এআইর উত্থানকে ব্যাহত করতে পারে মার্চ মাসে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ১৭ শতাংশ কমেছে, যা ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স হতে যাচ্ছে। অথচ এই একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ সংঘাত, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, বাড়তি মুদ্রাস্ফীতি এবং বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার মূলধন হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে; যা স্বর্ণের দাম বাড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের মাঝামাঝি থেকেই স্বর্ণ তার মৌলিক অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদা কমে যায়, আর খুচরা বিনিয়োগকারী ও মোমেন্টাম ট্রেডারদের চাপে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে পৌঁছায়। পরে সেই ‘সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়’ দ্রুতই ব্যাপক বিক্রিতে পরিণত হয়, যা নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদাকেও ছাপিয়ে যায়। অন্যদিকে, নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলার বা মার্কিন ট্রেজারিও খুব শক্ত অবস্থান দেখাতে পারেনি। ডলারের সূচক কিছুটা বেড়েছে, তবে তা ২ শতাংশেরও কম। কারণ, বিশ্বের কয়েকটি বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বছর মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের তুলনায় বেশি কড়াকড়ি নীতি নিতে পারে-এমন প্রত্যাশা ডলারের ওপর চাপ তৈরি করছে। ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাড়তি আমদানি ব্যয় সামাল দিতে এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমাতে পারে। এর ফলে ডলারের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং মার্কিন ট্রেজারির চাহিদাও কমে যেতে পারে। এরই মধ্যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে-গত চার সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা মার্কিন ট্রেজারির পরিমাণ প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার কমেছে। ডয়চে ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বৈদেশিক সরকারি খাত থেকে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার বিক্রি হয়েছে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর পর সর্বোচ্চ এবং ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম নিট বিক্রি। আরও পড়ুন: বড় পতনের পর এবার স্বর্ণের দামে নাটকীয় মোড়! এদিকে ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ ধরা সুইস ফ্রাঙ্ক ও জাপানি ইয়েনও চাপে রয়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক জানিয়েছে, মুদ্রার অতিরিক্ত শক্তিশালী হওয়া ঠেকাতে তারা বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। অন্যদিকে জাপানি ইয়েন কয়েক দশকের সর্বনিম্ন অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে, কারণ দেশটি জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আগের চেয়ে আরও নমনীয় ও কৌশলী হতে হবে। শুধু নিরাপদ সম্পদ কেনার বদলে পরিস্থিতি অনুযায়ী খাতভিত্তিক বিনিয়োগ-যেমন জ্বালানি সংকটে জ্বালানি খাত বা সংঘাতের সময় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে এই অস্থির সময়ে একটি সম্পদই তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে; নগদ অর্থ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন মানি মার্কেট ফান্ডে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭.৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা নতুন রেকর্ড। বিশ্লেষকদের মতে, খুব শিগগিরই এই পরিমাণ ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সূত্র- রয়টার্স
Go to News Site