Jagonews24
পন্টুন থেকে গাড়িটি হঠাৎ কেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় তলিয়ে গেলো তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। চালক নিজে চালাচ্ছিলেন না, ডোবার আগে গাড়ি থেকে বের হয়ে গেছেনসহ নানান অনুমাননির্ভর কথা শোনা যাচ্ছিল দুদিন ধরে। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেলে চালক নিজেই বাসটি চালাচ্ছিলেন। তার মরদেহও উদ্ধার হয়েছে। নিহত বাসচালকের নাম আরমান খান (৩১)। তিনি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির পশ্চিম খালখুলা গ্রামের আরব খানের ছেলে। ঠিক কী ঘটেছিল বা ঘটতে পারে শেষ মুহূর্তে, যে বাসটি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি চালক? বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে জাগো নিউজ। চালক, মেকানিক, প্রত্যক্ষদর্শী, বেঁচে যাওয়া যাত্রী, বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা যায় প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছিল। নাড়ির টানে গ্রামে যাওয়া মানুষগুলো ফিরছিলেন জীবিকার টানে রাজধানীতে। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। একটি দুর্ঘটনায় নিভে গেলো ২৬টি তাজা প্রাণ। শোকের সাগরে ডুবলো পরিবারগুলো। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদে কেটেছে আনন্দের সময়। কারও বস্তায় ছিল গ্রামের টাটকা সবজি, পেঁয়াজ, কারও ব্যাগে গ্রামের খাবার, কারও মনে ছিল নতুন স্বপ্ন। সবকিছুর হলো সলিল সমাধি। দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ফেরির অপেক্ষায় থাকা সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি হঠাৎই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই আনন্দমুখর যাত্রা পরিণত হয় বিভীষিকায়। চিৎকার, আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি মিলিয়ে যায় নদীর গভীর অন্ধকারে। দুর্ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে নিভে গেছে ২৬টি জীবনপ্রদীপ। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন, যারা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই বিভীষিকার স্মৃতি। উদ্ধারের পরও বাসের স্টিয়ারিংয়ে লাগানো ছিল চাবি। পাশে সাবান ঝোলানো। একটি তালাও ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফেরির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় হঠাৎই বাসটি সামনে এগিয়ে গিয়ে নদীতে পড়ে যায়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেলো দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি কীভাবে পানিতে পড়ে গেলো তা নিয়ে অনুসন্ধান করেছে জাগো নিউজ। এতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাসচালক ব্রেক চাপলেও তা ওই সময় কাজ করেনি। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু বাসের স্টার্ট বন্ধ থাকলে পরে স্টার্ট দিয়েই ব্রেক চাপ দিলে তা মুহূর্তে কাজ করে না। সৌহার্দ্য বাসের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। চালক অভিজ্ঞ হলেও এক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগেনি। মুহূর্তে তিনিও বুঝতে পারেননি বিষয়টি। অনেকেই বলছেন, চালক নিজে বাস না চালিয়ে সহাকারীকে দিয়ে চালাচ্ছিলেন। তবে সৌহার্দ্য বাসে থাকা একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুমারখালী থেকে যে চালক বাস চালাচ্ছিলেন তিনিই ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। পরে শেষের কথাটি সত্য প্রমাণ হয় যখন তার মরদেহ অন্যদের সঙ্গে উদ্ধার হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে গাড়ির আধুনিক ব্রেক পাওয়া যায়। তবে এসব ব্রেকের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। এর মধ্যে ব্রেকের হাওয়া অন্যতম। আরও পড়ুন বাবার কোল থেকে ছিটকে যায় তিন বছরের ইসরাফিল, পরে মেলে মরদেহব্যাগের স্তূপে খেলনা বন্দুক, ট্রিগার ছোঁয়ার শিশুটি নেইকালুখালী উপজেলায় নিহত ৮ জনের দাফন সম্পন্ন, শোকে কাতর পরিবার এই রুটে দীর্ঘদিন কাজ করা মেকানিকদের দাবি, বাসটির ব্রেকের হাওয়া বা এয়ার প্রেশার শেষ হয়ে যাওয়ায় চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। তাদের ভাষ্য, টাটা কোম্পানির টিসি মডেলের বাসে ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে অনেক সময় ব্রেকে প্রয়োজনীয় চাপ থাকে না, ফলে গাড়ি থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঢাকা-খুলনা রোডের অভিজ্ঞ চালক মোকলেসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ ধরনের বাসে ব্রেকের এয়ার সিস্টেমে সমস্যা হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে মুহূর্তেই।’ ঘাট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চালক একাধিকবার চেষ্টা করেও বাসটি থামাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণহীন বাসটি নদীর বুকে হারিয়ে যায়। ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন আবুল কালাম। আবুল কালাম বাসে উঠে ১০-১৫ মিনিট বসে ছিলেন। ফেরিঘাটের আগে যানজটের কারণে দুর্ঘটনার দুই মিনিট আগে বাস থেকে নেমে পড়েন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে চালক চালাচ্ছিলেন ফেরিতে তিনিই ওঠাচ্ছিলেন। তার কোমরে ড্রাইভিং লাইসেন্স ঝোলানো দেখেছি।’ সৌহার্দ্য বাসের অন্য একজন চালক আসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গাড়ি স্টার্টে থাকলে হাওয়া চলে যায় না। কিন্তু স্টার্ট বন্ধ করলে হাওয়া যাবেই। মিটারে খেয়াল করলে হাওয়া কমে যাচ্ছে নাকি ঠিক আছে তা দেখা যায়। হাওয়া ওঠাতে হলে কিছু সময় আগে গাড়ি স্টার্টে রাখতে হবে। গতকালের চালক ভুল করেছেন। তিনি স্টার্ট দিয়েই হাওয়া না দেখেই টান দিয়েছেন। এ কারণে ব্রেক চাপলেও ব্রেকে কাজ করেনি।’ কুমারখালী-ঢাকা সড়কের লালন পরিবহনের চালক আফজাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই সড়কে দীর্ঘ ১৫ বছর গাড়ি চালাই। কিন্তু এমন দুর্ঘটনা আগে কখনো দেখেনি। হাওয়া না থাকায় ড্রাইভার ব্রেক করতে পারেননি।’ দৌলতদিয়া বাজারের বাসের মেকানিক বাবুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্রেকের হাওয়া একটি সিস্টেম। এই সিস্টেম কাজ না করলে চালকের কিছু করার থাকে না। এজন্য এ ধরনের গাড়িগুলো প্রায় সব সময়ই স্টার্টে রাখতে হয়।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্রেকের হাওয়া হচ্ছে এয়ার ব্রেক সিস্টেম। এখন উন্নত প্রযুক্তির ব্রেকিং পাওয়া যায়। যা সনাতনী না। আধুনিক এই ব্রেকিং সিস্টেম কেন মাঝপথে ফেল করলো তা খুঁজে বের করা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, পন্টুনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। আনগার্ডেড বা কম উচ্চতার গার্ড রেলিং এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন রেয়ার ইভেন্ট ঠেকাতে হাইরাইজ গার্ড দেওয়ার এখনই সময়। পন্টুনের রেলিং যদি আরও এক-দেড় হাত উঁচু হতো, তবে বাসটি আটকে যেত ‘ গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন আলোচনা চলছে।’ টিটি/এএসএ
Go to News Site