আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করা
Somoy TV

আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করা

আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে এখনও কিছু অন্যায় প্রচলন রয়ে গেছে । আমরা মজাচ্ছলে ও কৌতুকবশত এ-সব লালন-পালন করলেও; এগুলো পরিস্কার জুলুম ও অন্যায়। এমনকি পুরো অবিচারও বটে।এগুলো এক একটি পূর্ণ কুসংস্কারও। জাহালত-মূর্খতার যুগকেও হার মানাবে এ-সব। বিশেষত কাউকে ঠকানো,আত্মীয়-স্বজন কারও সম্মানহানি ঘটানো। কিংবা বন্ধু-কলিগ ও আত্মীয়-স্বজনদের সামনে অপমানের বাসনায় এমন সব আচরণ করা। যে-সব মূলত জুলুম ও অবিচার। যেমন কিছু উদাহরণ লক্ষ করুন!  ১. কোনো বিয়ে বাড়িতে উদরপূর্তি করে খাওয়া। উদ্দেশ্য হলো, মেজবান-পক্ষকে অপমান করা। পরিমাণে বেশি আহার করে ও নষ্ট করে খাবার সংকট তৈরি করা। কিংবা অযথা অহেতুক খাদ্য-পানীয়ে ভুল-ত্রুটি আবিস্কার করা। এমন কথা বলা বা আচরণ করা যে, লবণ কম।  অমুক আইটেম ভালো না। তমুক ঝাল। এটা পেলাম না। ওটা আমাকে দিল না ইত্যাদি। কাজেই এদের সঙ্গে আত্মীয়তা করা যায় না। এ বাড়িতে সম্পর্ক করা যাবে না। টার্গেট হচ্ছে, একটা গোলমেলে পরিবেশ তৈরি করা। ঝগড়ার পরিবেশ করা। পরিস্থিতি ঘোলা করে, স্বার্থ উদ্ধার করা। এভাবেই মেজবানকে অপমান করা এবং 'আকদ-বিয়ে' ভেঙে দেওয়া। ২. আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর, তাদের খাবার ও আয়োজন মনোপূত না হলে ঝগড়াঝাটি শুরু করে দেওয়া। বাস্তবে তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রতি মনোযোগ না দেওয়া। বরং শুধু 'উদরপূর্তি' না হওয়ায় এমন আচরণ প্রকাশ করা। এটিও নিছক জুলুম। ৩.  আত্মীয় বাড়িতে কোনো মেহমান এসেছেন জানার পরও, নতুন করে (তৃতীয় পক্ষের কারও থেকে, সেটা হোক পরিবার থেকেই।) আবারও কাউকে কৌশলে সে বাড়িতে দাওয়াত করা। উল্লেখ্য, এখানে তৃতীয় পক্ষ হিসাবে মেজবানের নিকট তাদেরই কোনো আত্মীয়কে দাওয়াত করা। আরও পড়ুন: শাড়ি-লুঙ্গি দিয়ে কি জাকাত আদায় হয়? উদ্দেশ্য, যাতে মেজবানের আয়োজন সংকট তৈরি হয়। যোগান কমে আসে। ফলে তার সম্মান হানি ঘটে। তিনি লজ্জিত হবেন। অথবা, আগত প্রথম মেহমান লজ্জিত হবেন। কিংবা মেজবানের প্রতি ক্ষুব্ধ হবেন ইত্যাদি। এ-সব এক একটি কূটকৌশল। কাউকে অসম্মান করা। ছোট করা। ঝগড়ার পরিবেশ তৈরি। সম্পর্ক নষ্ট করাই মূল রহস্য। ৪. আপ্যায়নের ইচ্ছা নেই। কিন্তু এমন কাউকে জোরপূর্বক বা কৌশলে নিয়ে হোটেলে খাবার আয়োজনে শরীক করা। পরিকল্পিতভাবে চাহিদার তুলনায় বেশি খাওয়া। এভাবে তাকে বিপদের মধ্যে ফেলা। এ-সব নিঃসন্দেহে জুলুম ও অবিচার। মানব সভ্যতা বহির্ভূত সংস্কৃতি। ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচয়। হিংসা বিদ্বেষের প্রকাশ। কাউকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হেয় করা। সম্মানহানি বা ক্ষতি করাই এখানে লক্ষ্য উদ্দেশ্য। উপর্যুক্ত এ জাতীয় আচরণ, কখনো কোনো সময়ই কারও জন্যই উচিত নয়। কাম্য নয় এমন আচরণ, যা কারও কোনো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এভাবে জোরপূর্বক কারও অর্থ সম্পদ (লুট করা, খাদ্য) ভোগ করাও উচিত নয়!পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা অন্যায়ভাবে (কারও অসন্তুষ্টিতে) একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। কিন্তু তোমাদের পারস্পরিক সন্তুষ্টচিত্তে ব্যবসায় করা বৈধ। -সুরা নিসা : ২৯অর্থাৎ, ব্যবসায়ের মাধ্যমে কিছু  মূল্য বাড়িয়ে নিয়ে কেনা-বেচার পদ্ধতিতে কারও থেকে বেশি মূল্য বা অর্থ নিয়ে তা খাওয়া বা গ্রহণ করা বৈধ। এটি মূলত ব্যবসায়ের পারিশ্রমিক। যা পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়। এজন্যই তা শরিয়ত সম্মত।  এবার আমরা জানব, খাবারের দোষ-গুণ সম্পর্কে হাদিসে কী এসেছে? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস কেমন ছিল? আর আমরা এখন কী আমল করছি? বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো খাবারের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করতেন না। ভালো লাগলে তিনি খেতেন এবং খারাপ লাগলে তা রেখে দিতেন। সহি বুখারি‎উল্লিখিত এ বর্ণনাটি বলছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের কোনো দোষ খুঁজে বের করতেন না। অপছন্দ হলে বরং রেখে দিতেন। কোনো টু শব্দ করতেন না। আমাদের কতকের মানসিকতা ও বাস্তবতা হচ্ছে, খাবারের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা বা ঝগড়াঝাটি করা না।  বরং, সম্পর্ক ছিন্ন করা। আত্মীয় বাড়িতে ঝামেলা করা। যেগুলোর ফলাফল হলো, আত্মীয়তার সম্পর্কে ভাঙন তৈরি করা। ফাটল ধরানো ইত্যাদি। অথচ, সামান্য হিংসা বিদ্বেষ থেকেই এমনটি করা হয়। যা সম্পর্ক নষ্ট করেই শেষ হয় না। বরং, মানুষের যাবতীয় নেক আমলগুলোও ধ্বংস করে দেয়। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার গুরুত্ব এবং এর বিশেষ লক্ষণীয় উপকার সম্পর্কে হাদিসে কী এসেছে, চলুন দেখা যাক সেই বর্ণনাটি। প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার জীবিকার প্রশস্ততা কিংবা দীর্ঘায়ু পছন্দ করে। সে যেন তার আত্মীয়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে। সহি মুসলিম কাজেই আসুন, আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজন বন্ধু ও কলিগদের সঙ্গে সম্মান, শ্রদ্ধা,  ভালোবাসা ও আন্তরিকতা পূর্ণ ব্যবহার করি। সৌহার্দ ও সম্প্রতির বন্ধনকে করি আরও অটুট, মজবুত ও শক্তিশালী। পারস্পরিক  ভ্রাতৃত্ব, দয়া -মায়া ও সদাচরণই হোক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। লেখক: খতিব,  ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর

Go to News Site