এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ.
Somoy TV

এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ.

ফেনী শর্শদী দারুল উলূমের প্রধান মুফতি ও শায়খুল হাদিস হজরত মাওলানা মুফতি আবদুল আযীয রহ. (লাকসামী হুযুর) আলোকিত এক মহান সাধকের নাম। যিনি দ্বীনী ইলম এবং দাওয়াত ও তাবলীগের প্রবাদপ্রতীম নিরব সাধক এবং সফল ব্যক্তিত্ব। নিম্নে তার সেই সাফল্যময় জীবনের সামান্য তুলে ধরা হলো।জন্ম ও শিক্ষা-দীক্ষা হজরত রহ. ১৯৩৩ ঈসায়ীতে ওলামা-মাশায়েখের জন্মভূমি খ্যাত কুমিল্লা জিলার লাকসাম থানার অন্তর্গত ভাটিসতলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুনশী মিন্নাত আলী রহ.। স্থানীয় মক্তবে পবিত্র কুরআন কারিম শিক্ষা লাভ করেন। অত:পর প্রেমনল প্রাইমারী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। সেই ছোটবেলা থেকেই তার চেহারায় আভিজাত্যের ভাব পরিস্ফুট ছিল। স্কুলে তিনি চরিত্র-মাধূরী দিয়ে সকল শিক্ষকের মন জয় করে ফেলেন। এবং পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরিক্ষায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন।  অত:পর যুক্তিখোলা সিনিয়র ফাযিল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে জামাতে নাহুম পর্যন্ত পড়ে নাঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত মৌকরা ফাযিল মাদরাসায় চলে যান। সেখানে হাস্তুম ও হাফতুম এ দুই জামাত পড়েন। এরপর তার ভেতর ইলম অন্বেষণের অদম্য স্পৃহা জাগ্রত হয়। সেই আশা বাস্তবায়নের জন্য চলে যান হাটহাজারী মাদরাসায়। ১৩৮১ হিজরি মুতাবেক ১৯৬১ ঈসায়ী সনে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ফারিগ হন। সেখানে তিনি ফুনুনানে আলিয়াসহ তাফসীর,হাদিস,ফিক্বহ ও ইফতায় ও আরবী সাহিত্যে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। তখন হাটহাজারী মাদরাসায় সেসময় দেশের শ্রেষ্ঠ আলিম, মুহাদ্দিস, আদিব, মুফতি, মুহাদ্দিস ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিগণ পাঠদানে নিয়োজিত ছিলেন। তার উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন, মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতি ফয়যুল্লাহ রহ., খলিফায়ে থানবী আল্লামা আব্দুল ওয়াহহাব রহ., শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম রহ., মুফতি আহমদুল হক রহ.,আল্লামা আবদুল আজীজ রহ.,শারেহে মিশকাত আল্লামা আবুল হাসান রহ.,আল্লামা হামেদ রহ. ও শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.।শিক্ষা জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে তিনি সব সময় নাম্বার আউয়াল হতেন। ছাত্র জামানা থেকেই তিনি ছিলেন সকল আসাতিযায়ে কিরামের খুবই মুহাব্বতের পাত্র। হাটহাজারীতে পড়াকালীন সময়ে অনেক সময় ছাত্ররা আসাতিযায়ে কিরামের কাছে কিতাব বুঝতে গেলে উসতাদগণ বলতেন, আবদুল আযীযের কাছে যাও। সেই ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে পারবে। হজরত রহ. কুরআন কারীমের হাফেয ছিলেন না। কিন্তু প্রতিটি ফনের মৌলিক ২/৩ টি কিতাব তাঁর ঠোঁটস্থ ছিল। যার ফলে হাটহাজারীর মুহতামিম হজরত মাও: হামেদ রহ. তাঁকে হাফেয ছাহেব উপাধি দিয়েছেন। বহু হাদিস,আছার ও ইলমী নুসূস তাঁর মুখস্ত ছিল। তিনি যখন বয়ান করতেন অনর্গল হাদিস বলতে থাকতেন। আর সেটির তারজামা করতেন।  মেহনত-মুজাহাদার একটি সরল চিত্রহযরতের সহপাঠী হজরত মাও: তাফাজ্জুল হক হবীগঞ্জী রহ. বলেন, মাও: আবদুল আযীয রহ. যখন হাটহাজারীতে পড়তেন তখন শীতকালে গভীর রাতে যখন অন্য ছাত্ররা কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতো,তখন তিনি মুতালা’আ করতে বসতেন। এদিকে একটি কাঁথা ভিজিয়ে এনে পাশে রাখতেন। হালকা একটু ঘুম আসলেই কাঁথাটি গায়ে দিতেন। যাতে আর ঘুম না আসে। এমনই ছিল তাঁর ইলমের জন্য মুজাহাদা ও প্রচেষ্টার একটি সরল চিত্র। তাঁর ভিতর ছিল অসাধারণ মেধা ও মেহনতের সুষম  মিশ্রণ।  কর্মজীবনফারেগ হওয়ার পর তিনি বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় বিদ্যাপিঠ ফেনী শর্শদী জামি’আ ইসলামিয়া দারুল উলুমে উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ হন। মৃত্যু অবধি অত্র প্রতিষ্ঠানে প্রধান মুফতি,শাইখুল হাদিস ও নাযিমে তা’লীমাতের দায়িত্ব পালন করেন।  এই দীর্ঘ সময়ে কুমিল্লা বরুড়া মাদরাসা,ঢাকা ফরিদাবাদ মাদরাসাসহ রাজধানী ঢাকার বহু বড় বড় প্রতিষ্ঠানে শাইখুল হাদিস ও প্রধান মুফতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানালে হজরত তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন শর্শদী মাদরাসা ত্যাগ করার যখনি প্রস্তাব আসে স্বপ্নে শর্শদী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা,থানবী রহ. এর আজল্লে খলীফা হজরত মাও. শাহ নূর বখশ রহ. আমাকে বলেন:আপনি আমাদের ছেড়ে কই যাবেন? এজন্য আমি শর্শদী মাদরাসা ছাড়তে পারিনা। এভাবে ৪৮/৫০বছর পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানে কাটিয়ে দেন। শর্শদী মাদরাসায় তিনি সহীহ বুখারী, সুনানে তিরমিযী,মিশকাত,হেদায়া,জালালাইন,সিরাজী ও কুতবী , শরহে জামী , শরহে তাহযীব ইত্যাদির মত জটিল-কঠিন কিতাব দরস দিয়েছেন। অসাধারণ পাঠদান। হযরতের বিশিষ্ট শাগরিদ হজরত মাও: আবদুল গাফফার (সিনিয়র মুহাদ্দিস,জামি’আতুল উলূমিল ইসলামিয়া মুহাম্মদপুর,ঢাকা) বলেন,  তার ইলমী ইস্তি’দাদ ছিল অনেক পাকাপোক্ত। যার বর্ণনা আমি দিতে পারবোনা।  শর্শদী মাদরাসার সিনিয়র উসতাদগণও কোন ইলমী বিষয়ে জটিলতা বোধ করলে তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। এবং ইস্তিফাদাহ করতেন। তাঁর দরস ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও গোছালো। হুযুর ছিলেন তুখোড় মেধাবী। সৃজনশীলতা ছিল অনেক বেশী। বর্তমানে আমাদের অনেকে কিতাব পড়াতে গিয়ে বহু শরাহর ধারস্ত হয়ে কিতাবের মর্মোদ্ধারে সক্ষম হয়। এবং শরাহর বক্তব্যকেই ‘হরফে আখীর’ তথা: সঠিক মনে করে। কিন্তু হুযুরের ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।  তিনি কিতাব থেকেই তার মর্মোদ্ধার করতেন। এর পর কিতাবের হাশিয়া বা শরাহ দেখতেন অতিরিক্ত বিষয় জানার জন্য। দেখা যেত কিতাবের হাশিয়ার উপর সমালোচনা করতেন। নিজের পক্ষ থেকে নতুন হাশিয়া যোগ করতেন। তার দরস এত সুন্দর, সাজানো- গোছানো ও হৃদয়ঙ্গমযোগ্য যে, একজন দুর্বল ছাত্রও যদি তাঁর দরস মনোযোগ দিয়ে শুনে তাহলে দরসেই তার কিতাব বুঝে আসতো। কঠিন বিষয়কে স্বল্প কথায় সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপনে হুযুর ছিলেন খুবই দক্ষ। মনে পড়ে তিনি আমাদের শরহে তাহযীবের ঘন্টায় হিদায়াতের ব্যাখ্যা এত সুন্দরভাবে করেছিলেন যে এখনো আমার কাছে এ বিষয়ে কোন অস্পষ্টতা নেই আলহামদুলিল্লাহ। তাঁর সেই তাকরীরটি আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তিনি ছিলেন মানতেকের ইমাম। তবে তিনি আমাদের দরসে বলেছিলেন যে,এক সময় আমার স্বপ্ন ছিল আমি মানতেক-ফালসাফার ইমাম হব। কিন্তু পরবর্তীতে আমার কাছে এসব ফনের হাকীকত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যার কারণে অতি সহজেই এসব অপ্রয়োজনীয় ফনের গন্ডি থেকে বের হয়ে আসছি। আসলে হুযুর ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী মানুষ। যার কারণে এসব বিষয়ে তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল খুবই ভারসাম্যপূর্ণ। বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি কোনটি আলহামদুলিল্লাহ ছিলনা। হযরতের বিশিষ্ট শাগরিদ, মিরপুর জামে’উল উলূম সহ বহু মাদরাসার সাবেক শায়খুল হাদিস, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হজরত মাও: মুফতি সুলাইমান ইবনে আলী রহ. লিখেন, আমার উস্তাদ মুফতি আবদুল আযীয রহ. এর দরস ছিল খুবই চমৎকার। যে কোন কিতাব তাঁর নিকট পানির মত সহজ ছিল। শর্শদী মাদরাসার অনেক সিনিয়র উস্তাদগণও যে কোন ইলমী বিষয়ে জটিলতা বোধ করলে তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। হজরত রহ. হাদিসের কিতাব পড়ানোর সময় হানাফি মাযহাবের ওয়াজহে তারজীহ বয়ান করতেন সম্পূর্ণ ফন্নী আন্দাযে। এটি হযরতের কাছের শাগরিদদের কাছ থেকেই শোনা। আমাদের কাছে সংরক্ষিত হযরতের কিতাবাদি ঘাঁটাঘাঁটির পর স্পষ্ট হয়েছে যে,হজরত রহ. হাদীসের কিতাবাদি পাঠদান করতেন উসূলী আন্দাযে। স্বয়ং মিশকাত শরীফের উপর হুযুর বিভিন্ন জায়গায় কলম দিয়ে আরবীতে সুন্দরভাবে হাশিয়া লিখেছেন। হাশিয়াগুলোতে হযরতের উলূমে হাদীসের প্রতি তাঁর রুচি ও আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। হাদীসের ফন্নী শরাহগুলো থেকে বিভিন্ন উদ্বৃতি নকল করেছেন সেগুলোতে। ফাতহুল বারী,উমদাতুল কারী,ফায়যুল বারী ও লামি’উদ্দারাী ইত্যাদি খুবই আগ্রহের সহিত মুতালাআ করতেন। আর হিদায়ার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল স্বভাবজাত। অন্যান্য কিতাবাদির পাশাপাশি আজীবন হিদায়া কিতাবের দারস দিয়েছেন। যারা হযরতের কাছে হিদায়া পড়েছেন তাদের বক্তব্য হল  হিদায়া কিতাবের প্রতি মুহাব্বত ও ভালবাসা তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। হিদায়ার দরসেই তিনি ছাত্রদের মাধে ফিকহী যাওক তৈরী করে দিতেন।ইলমী গভীরতাতাঁরই সহপাঠী শাইখুল হাদিস আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী রহ. বলেন আমি মাওলানা আবদুল আযীয রহ. এর সহপাঠী ছিলাম। তিনি ছাত্র যামানা থেকেই অত্যন্ত মুত্তাকী,পরহেযগার ও প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। তিনি হাটহাজারীতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সব সময় নাম্বার আউয়াল হতেন। এবং ছাত্ররা তাঁর তাকরারে বসার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকতো। ফলে সকল আসাতিযায়ে কিরামের নিকট তিনি খুবই প্রিয় ছিলেন। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় যে,তিনি হাটহাজারীতে পড়াকালীন তাঁর উস্তাদ আল্লামা আবুল হাসান রহ. হিদায়ার দরসে একটি মাসআলার ব্যাখ্যা করলেন একভাবে। উস্তাদের অনুমতি নিয়ে মুফতি আবদুল আযীয রহ. সবিনয়ে আরেকটি ব্যাখ্যা করলেন। তখন আল্লামা আবুল হাসান রহ. এর নিকট নিজের ব্যাখ্যার চেয়ে ছাত্রের ব্যাখ্যা বেশি পছন্দ হলে অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন আবদুল আযীয যতটুকু বুঝেছে,আমার মনে হয় কিতাবের হাশিয়া লিখকও ততটুকু বুঝে নায়। হাটহাজারীর শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম রহ. বলতেন, হাটহাজারী মাদরাসার শাইখুল হাদিস হওয়ার জন্য আবদুল আযীযই যোগ্য। বিশিষ্ট লিখক ও জীবনীকার মুফতি হিফযুর রহমান বলেন:“আমরা যখন হাটহাজারী মাদরাসায় পড়ি,তখন প্রায়ই আসাতিযায়ে কিরামের মুখে মুফতি আবদুল আযীয রহ. এর সুনাম শুনতাম। আল্লামা হামেদ রহ. মসজিদে ছাত্রদের নসীহত করার সময় মুফতি আবদুল আযীয রহ. এর মেধা ও ইলমী গভীরতার কথা উল্লেখ করতেন। হযরতের বিশিষ্ট শাগরিদ,জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া মুহাম্মদপুর ঢাকার নায়েবে মুহতামিম ও সিনিয়র মুহাদ্দিস হজরত মাও: আবদুল গাফফার লিখেন:“একবার হজরত মুফতি সাহেব রহ. মালিবাগ জামিয়ায় আসলেন,আসার পর আমাকে বললেন,আমাকে মিশকাত কিতাব দিন! আমি একটু মুতালা’য়া করব। আমি হজরতকে দেখতেছি,হজরত মিশকাতের বিভিন্ন হাশিয়া কাটতেছেন,আবার পাশে সঠিকটা লিখেও দিচ্ছেন। হজরত যখন চলে গেলেন,তখন আমি ঐ হাশিয়াগুলো মূল কিতাবের সাথে মিলিয়ে দেখি হজরত যা লিখেছেন তা সঠিক,আর হাশিয়া ভুল ছিল। আমি তা দেখে আর্শ্চয হয়ে যাই। হযরতের আরেক বিশিষ্ট শাগরিদ ফেনী জামিয়া মাদানিয়ার মুহতামিম মাও.সাইফুদ্দীন কাসেমী বলেন,“আমি শর্শদী মাদরাসায় পড়াকালীন হজরতকে দেখলাম যে,হজরত এক কিতাবের হাশিয়া বেশ কয়েক জায়গায় কেটে দিয়েছেন। সাথে সাথে আবার পাশে হজরত নিজ থেকে আরেকটি হাশিয়া লিখে দিয়েছেন। আমার কাছে এটা দেখে খারাপ লেগেছে। আবার এ কিতাবের হাশিয়া যে কিতাব থেকে আনা হয়েছে ঐ কিতাব শর্শদী মাদরাসায় নেই,হাটহাজারী মাদরাসায় আছে। আমি একদিন হাটহাজারী মাদরাসায় গিয়ে মূল কিতাব দেখার পর আমি তো রীতিমতো হতবাক। হজরত যেটা লিখেছেন ওটাই সঠিক। আর হাশিয়া সম্পূর্ণ ভুল ছিল। ফেনী জামি’য়া রশিদিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হজরত মাও: মুফতি শহীদুল্লাহ বলেন:“আমরা যখন হাটহাজারী মাদরাসায় পড়তাম তখন হাটহাজারী মাদরাসার সকল উস্তাযই বলতেন,মুফতি আবদুল আযীযের মত বিজ্ঞ আলিম বাংলাদেশে কমই আছে। পরে যখন আমার জামি’য়া রশিদিয়ার সুবাদে ফেনীতে খিদমাত করার সুযোগ হয় তখন আমার কাছে মনে হত,হাটহাজারীর উস্তাদগণ তাঁর এত প্রশংসা কেন করতেন?আমার তো বুঝে আসেনা। উনাকে তো দেখি তাবলীগের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।  একদিন আমি হজরতকে মাদরাসায় পেয়ে আমি কয়েকটি জরুরী গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নিয়ে যখন তাঁর সাথে আলোচনা করি তখন আমার ভুল ভেঙ্গে যায়। হজরত এত চমৎকার ভাবে সকল মাসআলার সমাধান দিলেন আমি তো হতবাক। সাথে সাথে হজরত বললেন,এ মাসআলার সুন্দর আলোচনা ঐ কিতাবে আছে,এ মাসআলার বিস্তারিত আলোচনা ঐ কিতাবে আছে। বলতেছেন আর কিতাব বের করেও দেখাচ্ছেন,আমি তো রীতিমত আশ্চর্য। ফেনী জামিআ মাদানিয়ার প্রধান মুফতি ও নায়েবে মুহতামিম হজরত মাও: মুফতি আহমদুল্লাহ কাসেমী বলেন, শশদী মাদরাসায় আমার তাদরীসী যামানায় অনেক সময় দেখা যেত একটি কিতাব কয়েকদিন যাবত মুতালা’আ করে হল হচ্ছেনা। তাই হল করার জন্য সবেমাত্র হজরত লাকসাম হুযুর রহ. এর সামনে গিয়ে বসতাম। দেখতাম এমনিতেই হল হয়ে গেছে। এটি আসলে হুযুরের কারামতই বলতে হবে। শশদী মাদরাসায় ইলমী যে কোন বিষয়ে সকল আসাতিযায়ে কিরাম ও তালিবুল ইলম লাকসাম হুযুরের কথাকেই এক বাক্যে মেনে নিত। তিনি ছিলেন সবার আস্থাভাজন। এমন মানুষ জীবনে কমই দেখেছি।ইলমুল ফারায়েযে যোগ্যতাহজরত মাও: আবদুল গাফফার বলেন, ইলমুল ফারায়েজ ও গণিতে হুযুরের দক্ষতা ছিল অসাধারণ। হুযুর ফারায়েজ করতেন ভিন্নভাবে যা আমি আর কোথাও অন্য কাউকে এভাবে ফারায়েয করতে দেখিনি। সাধারণত আমরা ফারায়েজ করার ক্ষেত্রে লসাগু,গসাগু ব্যবহার করে সঠিক ফলাফল নির্ণয় করি। কিন্তু হুযুর সংক্ষিপ্তভাবে খুবই অল্পসময়ে অন্যভাবে ফারায়েজ করতেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হুযুর গণিতের ভিন্ন একটি সূত্র আবিষ্ককার করছেন।  জানিনা হুযুর থেকে কেউ এই পদ্ধতিটা শিখছেন কিনা। কিন্তু আমার আফসুস লাগে যেÑ আমার শিখা হয়নি। হুযুরের কাছে সিরাজী পড়ার সুযোগ হলে হয়ত শিখা হত। হুযুর একদিন আমাকে একটি অংক দিয়ে বললেন যে,তুমি অংকটা কর। এরপর আমি অংটা করলাম। হুযুরও করলেন। দেখা গেল হুযুর করলেন ভিন্নভাবে তবে ফলাফল এক। হুযুরের আবিষ্কৃত এই সূত্রটি কিতাবের পাতায় আসা দরকার,তাহলে জেনারেল শিক্ষিতরা বুঝতে পারবে যে,আমার কওমী অঙ্গনে এমন প্রতিভাবান লোকও রয়েছেন যাঁরা গণিতের সূত্র আবিষ্কার করেন। ” আরবি ভাষা যোগ্যতাআরবীর প্রতি ছিল হুযুরের অগাধ ভালবাসা। যার ফলে হুযুর এমন পরিবেশে আরবী ভাষা-সাহিত্য শিখেছেন যখন বর্তমান সময়ের মত লাইব্রেরীগুলোতে আরবী সাহিত্যের বই এত সহজে পাওয়া যেতনা। কিন্তু হজরত সেই ছাত্র যামানা থেকে আরবীতে সকল লেখালেখি করতেন।  এমনকি বাজার-সদাই করার তালিকাটাও আরবীতে লিখতেন। ফলে তিনি আরবী ভাষা-সাহিত্যে এত পারদর্শী ছিলেন যে,আরবী ভাষাভাষী ছাড়া অন্যদের এত বিশুদ্ধ অনর্গল আরবীতে বক্তৃতা প্রদান প্রায় অসম্ভব। আহলে আরবগণ তাঁর সাবলীল আরবী বক্তৃতা শুনে সহাজেই তাঁকে বাংলাদেশী মানতে চাইতো না। টঙ্গীতে ইজতিমার ময়দানে আরব জামাতের অনুবাদক ছিলেন।একবার হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে হজরতকে বয়ান করতে দিলে তিনি বিশুদ্ধ আরবীতে এমন বয়ান প্রদান করেন যে,তখনকার মুহতামিম আল্লামা হামেদ রহ. ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:“দেখেছ! একে বলে আলেম,যাকে নিয়ে হাটহাজারী মাদরাসা গর্ব করে।তালিমের সাথে তাবলীগের সমন্বয়তা’লীমের সাথে তাবলীগের এক বাস্তব উদাহরণ হলেন,মুফতি আবদুল আযীয রহ.। আলিম তৈরির পাশাপাশি তিনি চিন্তা করতেন আওয়ামদের নিয়েও। তাইতো দ্বীনের মশাল নিয়ে চষে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশে। আল্লাহভোলা মানুষদের দীনের পথে আনতে ছুটে যেতেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।ফেনী জেলার শর্শদী ইউনিয়নে এমন কোন বাড়ি নেই,যে বাড়িতে হজরত মুফতি সাহেব রহ. দাওয়াতের মিশন নিয়ে যান নি,আর সে বাড়ির মানুষ তাঁর পকেটে রাখা ৫০ পয়সা দামের নাবিস্কো চকলেট খায়নি।  আর হযরতের এ চকলেট যার পেটে একবার গিয়েছে, দেখা গেছে সে তাঁর জীবদ্দশায় না হলেও তাঁর মৃত্যুর পর তিনদিনের জন্য হলেও তাবলীগে গিয়েছে । এমন নজীর আমাদের সামনে অগণিত। অনেক চোর-বাটপারও তাঁর এ চকলেট খেয়ে হিদায়েতের পথ খুঁজে পেয়েছে। হজরত মুফতি সাহেব রহ. এর কাউকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল প্রথমে তাকে নাস্তা করাতেন এরপর তাকে দাওয়াত দিতেন।  হজরত রহ. এর অভ্যাস ছিল, প্রতিদিন আছর অথবা ফজরের নামায এলাকার কোনো না কোনো মসজিদে গিয়ে পড়া এবং সেখানের মুসল্লীদের নিয়ে দ্বীনী আলোচনা করা এবং দাওয়াতী কাজে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। সমগ্র জীবনটাই তাঁর এভাবে কেটে যায়। ফলে তাঁর এলাকায় দূর-দূরান্ত পর্যন্ত গণমানুষের সাথে তাঁর একটা আত্মার সম্পর্ক হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ তো বটেই;চোর,বদমাইশ-গুন্ডা পর্যন্ত তাঁকে দেখলে অন্তর থেকেই সম্মান প্রদর্শন করত।  আরও পড়ুন: আল্লাহ কি পাপী বান্দাকেও ভালোবাসেন? ফলে গণমানুষের উপর দ্বীনের একটা প্রভাব বিস্তার করে থাকত। মানুষের সাথে দ্বীনী এই সম্পর্কেরকারণে মাদরাসার সাথেও মানুষের একটা সুসম্পর্ক সবসময় বিদ্যমান থাকত। মাদরাসা,মসজিদ,হাঁটবাজার,বাসষ্ট্যান্ড যেখানেই যেতেন সেখানেই মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। নামায,রোযার কথা বলতেন। এমন কোন রিকশা, সি.এন.জি. ও ট্যাক্সি চালক বাকি নেই যে,যেগুলোতে তিনি উঠেছেন তাদেরকে নামায পড়া,রোযা রাখা ও তাবলীগে যাওয়ার জন্য বলেননি। কখনও নামাযের সময় যদি বাড়িতে যেতেন,তাহলে প্রথমে রিকশা,সি.এন.জি. চালককে জিজ্ঞেস করতেন যে,নামায পড়েছে কিনা,যদি নামায না পড়ে থাকত তাহলে প্রথমে তাদেরকে নামায পড়াতেন,তারপর বিদায় করতেন। এবং নির্ধারিত ভাড়া থেকে অনেক বাড়িয়ে দিতেন। বিশিষ্ট লিখক ও গবেষক মাও.ইসহাক ওবায়দী রহ.  লিখেন:“মুফতি আবদুল আযীয রহ. ছিলেন তা’লীম ও তাবলীগের বড় সমন্বয়ধর্মী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যিনি হাদীসের দারস প্রদানের দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালনের পাশাপাশি তাবলীগের কাজটিও সফলভাবে আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।  কাকরাইল মসজিদ ও বিশ্ব ইজতেমার মাঠে ওলামাদের ক্যাম্পে মাত্র কয়েকবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। বড় সদালাপী,আকর্ষণীয় হাসি দিয়ে মানুষের সাথে তিনি কথা বলতেন। হৃদয়ের পুরোটাই শুধু দরদেভরা মনে হত। হজরত রহ. নিজের জন্য তা’লীমের পর তাবলীগের খিদমাতকে প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু হযরতের সকল উস্তাদের পরামর্শ ছিল তা’লীমের পাশাপাশি তাসনীফাতের খিদমাত আঞ্জাম দেওয়া। কিন্তু হযরতের ভেতর প্রচারবিমূখতার গুণটি ছিল প্রবল। ফলে তিনি নিজের প্রতিভার বিসর্জন দিয়েছেন। তারপরও একবার হজরত রহ. আসাতিযায়ে কিরামের পীড়াপীড়িতে তাবলীগের কাজ ছেড়ে তাসনীফাতের দিকে মনোনিবেশ করলেন। কিন্তু একদিন বা দু’দিন পর স্বপ্নে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেন যে তিনি তাঁর হাত ধরে একটি বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। আর বলছেন তুমি ঘুমিয়ে আছো? অথচ আমার উম্মতের এই করুণ হালাত!এভাবে তাবলীগের কাজে একটু ব্যঘাত ঘটলে স্বপ্নযোগে নবীজী তাঁকে তাম্বীহ করতেন। তাই তিনি তা’লীমের পর তাবলীগের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তবে অন্যদেরকে তাসনীফাত ও তালীফাত বা অন্য কোন দ্বীনী মাশগালা ছেড়ে তাবলীগ করার কথা কখনোই বলতেননা। তিনি বলতেন,স্বপ্ন যদিও শরীয়তের দলীল নয়। তা স্বত্তেও স্বপ্নের মাধ্যমে দ্বীনী কাজে উদ্বুদ্ধ হতে তো অসুবিধা নেই। মতিঝিল পীরজঙ্গী মাদরাসায় ১৯৯৩ঈসায়ীতে দাওরায়ে হাদীসের দারসের ইফতিতাহের জন্য তাঁর উস্তাদ হাটহাজারীর আল্লামা আবদুল আজীজ রহ.কে আনা হয়। তিনি তখন অফিস কক্ষে বসা ছিলেন। মুফতি আবদুল আযীয রহ. অফিসে ঢুকতেই তিনি বলে উঠলেন,“ও আবদুল আযীয! তুঁই খেন আছ?  গম আছন্না? আঁই তোঁয়ারে খইয়েদ্দে তুঁই ডঁর ডঁর হাদীসের কিতাব ফরাইবা। আর তুঁই আঁর খতা ন ফুনিয়ারে তুঁই তাবলীগ খর।” এরপর মুফতি সাহেব কেঁদে উঠলেন। আর বললেন,সাহেবে হাদিস রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দাওয়াত ও তাবলীগের নির্দেশ দিয়েছেন। এখন আমি কোনটা করবো? তখন আল্লামা আবদুল আজীজ রহ. কেঁদে দেন এবং বলেন:আজিয়াত্তুন আঁই তোঁয়ারে খেলাফত দি ফালাই,তুঁই যিয়ান খরদ্দে সঠিখ খরদ্দে। তোঁয়ার খতাই সঠিখ। তুঁই তোঁয়ার মত খাম খর। তাবলীগের কাজে হজরত রহ. ভারত,পাকিস্তান,সৌদি আরব,মিশর,মরক্কো,সুদান ইত্যাদি রাষ্ট্রে সফর করেছেন।  দ্বীনের জন্য মুজাহাদাবিশিষ্ট কলামিষ্ট মাও: আবদুর রহীম ইসলামাবাদী লিখেন, “মুফতি আবদুল আযীয রহ. এর জীবন ছিল ইসলামের জন্য নিবেদিত। তাঁর দর্শন ছিল তিলে তিলে জীবনকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করে দেওয়া। একমাত্র লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। সকলকে তিনি পবিত্র কুরআন,সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালিহীনের আদর্শ ও চিন্তাধারা অনুসরণ করতে বলতেন। আর আল্লাহর কাছেই সবসময় সাহায্য প্রার্থনা করতেন। কুরআন ও হাদীসের বিধান মতো সবসময় আমল করতেন। আকাবিরে দেওবন্দ ও আকাবিরে হাটহাজারীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন মুফতি আবদুল আযীয রহ.। ৭১ এর স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় সংসারে অনেক অভাব থাকা সত্তেও তাবলীগের কাজ ছাড়েননি। হজরত রহ. এর সহধর্মিণী,আমাদের নানুর মুখেই শোনাÑ  যে সংগ্রামের সময় তাঁর হাতে টাকা ছিল না। বাড়ি থেকে তাবলীগে যাওয়ার সময় আলু আর কাঁঠালের বিচি নিয়ে গিয়েছিলেন।  দু’টি বিচি দিয়ে সাহরী খেতেন আবার দুটি বিচি দিয়ে ইফতার করতেন। আমীর সাহেবকে বলে দিলেন,আমার খানার ব্যবস্থা আছে। অর্থসংকটের কারণে জামাতের লোকদের সাথে খানায় শরীক হতেন না। অন্যরা খানা খেত আর তিনি উপাস থাকতেন। অভাবের কারণে হাতের ছাতাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন চূড়ান্ত পর্যায়ের মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তি। অহংকার বা গর্ব কী জিনিস তা তিনি জানতেন না। খোদাভীতি,তাকওয়া ও পরহেযগারীর আলোকমিনার এই মহান ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ অনুগত এবং যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকতে আজীবন সাধনায় ব্রতী ছিলেন। তাকাল্লুফ বলতে কোন কিছুই তাঁর ভিতর ছিলনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই মহান ব্যক্তির তাকওয়া অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। তাকওয়ার প্রভাবেই শত্রু-মিত্র সবাই তাঁকে সমীহ করত।  দূর থেকে তাঁকে যতই বাঁকা চোখে দেখুক,তাঁর সামনে দাঁড়ালে শত্রু-মিত্র সকলেই শ্রদ্ধায় বিগলিত হত। শাইখুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী রহ. বলেন:“মুফতি  আবদুল আযীয রহ. ছিলেন আবদিয়্যাতের মূর্তপ্রতীক। তিনি ছিলেন দরদী হৃদয়ের অধিকারী। তাঁর হৃদয়টি ছিল উম্মতের প্রতি দরদ আর ব্যথায় ব্যথাতুর। প্রতিটি কথায় মনে হত দরদ টপকে পড়ছে। হযরতের প্রবীণ শাগরিদদের থেকে শুনেছিÑ  হজরত রহ. প্রতি সপ্তাহে ছাত্রদের নিয়ে ২৪ ঘন্টার জন্য তাবলীগে যেতেন। রাত্রিবেলা দেখা যেত হজরত রহ. ১/২ঘন্টা ঘুমিয়ে সজাগ হয়ে উঠে যেতেন। গভীর মনোযোগের সাথে নামাযে ব্যস্ত। খুব রোনাযারী করতেন। আর তালিবুল ইলম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য আবেগ ও ভালবাসা নিয়ে খুব দু’আ করতেন।  মনে হত যেন হযরতের কলিজা ফেটে যাবে। পাকিস্তান শাসনামলে হজরত রহ. সর্বপ্রথম তাবলীগে যান। তাবলীগ থেকে আসার পর ছাত্রদের বলতেন,আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। উম্মতের এই করুণ হালাত! এগুলো বলে খুব রোনাজারী করতেন। হজরত মাও: ইসহাক ওবায়েদী রহ. লিখেন: “তাঁরহৃদয়ের পুরোটাই শুধু দরদেভরা মনে হত। যুহদ ও কানাআত হজরত রহ. ছিলেন উচ্চ পযায়ের এক যাহিদ,আবিদ ব্যক্তিত্ব। হজরত কেমন ছিলেন তার জন্য শুধু কয়েকটি চিত্র তুলে ধরছি। স্বাধীনতা-সংগ্রাম পরবর্তী সময়ে সংসারে অনেক অভাব ছিল। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কেটেছে। কিন্তু কাউকে কোনদিন পারিবারিক সংকটের কথা বুঝতে দেননি। অথচ হযরতের জন্য সব কিছু কুরবানী  করতে তাঁর বহু শাগরিদ ও ভক্ত-অনুরক্ত তৈরি ছিল। হজরত রহ. তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি তাঁর ভাইদের দিয়ে দিয়েছেন। হযরতের হাতেগড়া শাগরিদ ফেনী জামি’আ মাদানিয়ার মুহতামিম হজরত মাও: সাইফুদ্দীন কাসেমী (যিনি হযরতের জন্য ফেদা) বলেন, আমার উসতাদ হজরত লাকসামের হুযুর রহ. ছিলেন যুহদ ও কানাআতের দৃষ্টান্ত রহিত এক মানুষ। আমি যখন শশদী মাদরাসায় পড়তাম,তখন মাদরাসার আথিক অবস্থা ছিল খুবই কঠিন।  ফলে মাদরাসা থেকে তালিবুল ইলম ও আসাতিযায়ে কিরামের জন্য ভাল খাবারের ইনতিযাম করা সম্ভব ছিলনা। হজরত লাকসাম হুযুরকে দেখতাম খানা খেতে বসতেন,আর স্বাভাবিকভাবে খানা মজাদার না হওয়ার কারণে খেতে পারতেননা। কিন্তু মুখে কোন আওয়াজ নেই। বরং দেখতাম মাঝে মধ্যে ইসতিগফার করতেন আর নিজেকে খিতাব করে বলতেন,নফস! তুই খারাপ হয়ে গেলি। আল্লাহর বান্দারা সকলে এ খানা খেতেছে। আর তুই আল্লাহর নে’মতের শোকর আদায় করিসনা।” একথা বলে কেঁদে দিতেন। হযরতের অন্যতম একটি গুন ছিল কখনো খানার দোষ ধরতেননা। উপস্থিত যা পেতেন,তা দিয়েই খানা খেয়ে নিতেন। আম্মু বলেন: “আব্বাজান বাজার থেকে কিছু ছোট মাছ নিয়ে আসলেন। তিনি ছোট মাছ খুবই পছন্দ করতেন। মাছগুলো এনে পাকানোর জন্য বললেন।  আমি মাছগুলো কেটে ধুয়ে রান্না করলাম। কিন্তু ভুলবশত তৈল,মসল্লা ও মরিছ কিছুই দিতে মনে নেই। শুধু হলদি ও লবন দিয়ে রান্না করলাম। খাবারের সময় হল। আব্বা খাবারের জন্য বসলেন, যখন আব্বাজানকে খাবার বেড়ে দেওয়ার জন্য আসলাম এবং মাছগুলো পাতিল থেকে বাটিতে রাখি তখন আমার মনে হল,আমি তো মসল্লা ও তৈল ব্যতীত মাছ রান্না করে ফেলেছি। কিন্তু এখন তো খাবারের সময়! কী যে করি ভেবে কুল পাচ্ছি না। অবশেষে মাছের বাটি আব্বার সামনে রেখে এক পাশ্বে দাঁড়িয়ে থাকি। আব্বাজান কোন আওয়াজ না করে স্বাভাবিক অন্য দিনের মত খাচ্ছেন। ইত্যাবসরে আম্মাজান আসলেন এবং আব্বাজানকে বললেন, “মাছগুলি কেমন হয়েছে? মজাদার হয়েছে তো?” আমি তখন ভয়ে কাঁপছি, না জানি আব্বাজান কী বলেন। কিন্তু আশ্চর্য, আব্বাজান আম্মার প্রশ্নের উত্তরে বললেন,  আলহামদুলিল্লাহ ভাল হয়েছে। তিনি ছিলেন মুস্তাজাবুদ দা’ওয়াত হজরত রহ. দু’আ করলে তাড়াতাড়ি কবুল হয়নি এমন নজীর খুব কমই আছে। একবার তিনি হজ্জে যাওয়ার নিয়ত করেছেন। কিন্তু তাঁর হাতে টাকা ছিলনা। এরপরও তাঁর প্রবল বিশ্বাস তিনি হজ্জে যেতে পারবেনই। আর হজ্জে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। আর সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহর দরবারে দু’আ করছেন। অলৌকিক ভাবে টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তখন তিনি কাকরাইলের মুরুব্বীদের বলেছেন, আমার টাকার কীভাবে ব্যবস্থা হয়েছে আমাকে বলেন। আমি আমার জমি বিক্রি করে তা পরিশোধ করে দিব। মুরুব্বীরা বললেন, পরিশোধ হয়ে গেছে। হজরত বললেন, বেইজ্জতের সাথে পরিশোধ হোক আমি তা চাই না। মুরুব্বীরা বললেন, ইজ্জতের সাথে পরিশোধ হয়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে পরিশোধ হয়েছে তা শত চেষ্টা করেও তিনি আর জানতে পারেন নি। ইত্তিবায়ে সুন্নতহজরত রহ. ছিলেন প্রকৃত অথে মুত্তাবি’উস সুন্নাহ। প্রতিটি কাজ-কর্মে সুন্নতের পাবন্দ ছিলেন। চলাফেরা ছিল একবারে অনাড়ম্বরপূর্ণ। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি বিষয়। সবসময় খুবই উন্নতমানের আতর ও সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। হজরত রহ. সব সময় দু’আ,যিকির ও মা’মুলাতের ক্ষেত্রে মাসুর আমলের বেশি গুরুত্ব দিতেন। আর সকল সমস্যার সমাধানের জন্য দরুদ শরীফ পড়ার অধিক তাকীদ দিতেন। এর মাধ্যমেই তিনি বহু সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতেন। দানশীলতাহজরত রহ. এর অনেক বড় একটি গুণ ছিল দানশীলতা। জীবনে কখনো কোন জিনিস দরাদরি করে খরিদ করেছেন এমন নজীর নেই। মাদরাসা থেকে যতটুকু ওযীফা পেতেন। তার সবটুকু সাংসারিক খরচ ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য ব্যয় করতেন। নানুর মুখেই শোনা,নানাজী কখনো মামাদের কাছে টাকা-পয়সা চাননি। তাঁরা স্বেচ্ছায় কখনো সাংসারিক কাজে তাঁর হাতে কোন টাকা দিলে নিতেন। অন্যথায় কখনো তাঁদের থেকে কোন দিন একটা টাকাও চাননি। একবার শর্শদী মাদরাসায় আরব থেকে তাবলীগের জামাত এসেছিল। তখন হযরতের হাতে ১৫০০টাকা ছিল। হজরত রহ. তখন সবগুলো টাকা দিয়ে তাদের মেহমানদারীর ব্যবস্থা করে ফেললেন। ফলে তাঁর হাত খালি হয়ে গিয়েছিল। ঐদিনই এক ব্যক্তি তাঁকে ২৫০০ টাকা হাদিয়া দিয়েছিল। আম্মুর মুখেই শোনা, নানা যখন আমাদের বাড়িতে আসতেন,তখন পুরো টেক্সী বোঝাই হাদিয়া-তোহফা নিয়ে আসতেন। তখন আমার দাদা (মাও: তামীযুদ্দীন রহ.যিনি ফেদায়ে মিল্লাত আস’আদ মাদানী রহ. ও ফেনুয়ার হজরত মাও: দেলোয়ার হুসাইন রহ. সহ বহু আকাবিরের সোহবতে ধন্য ছিলেন) বলাবলি করতেন, না জানি বেয়াই কত টাকা ওযীফা পান।হজরত রহ. তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি তাঁর ভাইদের দিয়ে দিয়েছেন। আম্মুর মুখে শোনাÑ নানাজি যখন মাদরাসা থেকে বাড়িতে আসতেন,তখন নিজের সাধ্যমত বিভিন্ন ধরণের ফল-মূল নিয়ে আসতেন। একবারে খালি হাতে আসতেননা। বাড়িতে যেটাই নিয়ে আসতেন আশে-পাশে নিজের ভাইদের ঘরে কিছু কিছু করে হাদিয়া পাঠাতেন। চাই যতই সামান্য হোক না কেন। এমনকি বাজার থেকে কখনো বড় কোন মাছ নিয়ে আসলেও সেটিকে ছোট ছোট টুকরা করে সাধ্যমত আশে পাশের ঘরগুলোতে পাঠাতেন। সামান্য জিনিস কিভাবে পাঠাই এ চিন্তা করে কখনো প্রতিবেশীদের ঘরে পাঠানো থেকে বিরত থাকতেননা।  ইন্তেকাল হজরত রহ.২৭ জিলহজ্জ ১৪২৭ হি:,১৮ জানুয়ারি ২০০৭ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ইনতেকাল করেন। ইনতেকালের দিন সারাক্ষণই জোরে জোরে কালিমায়ে তায়্যিবার যিকির করেছিলেন। ইশার নামাযের সময় হলে তিনি যথাসময়ে ধীরস্থির ভাবে নামায আদায় করেন। নামায শেষে আবার উচ্চঃস্বরে যিকির করতে থাকেন। ঘড়িতে সময় ৮.৩০ বাজলে তিনি কালিমা পড়তে পড়তে মহান মাওলায়ে পাকের ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোক গমন করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭৩ বছর। পরদিন শুক্রবার বেলা ১১টায় তাঁর বিশাল নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় হাজার-হাজার উলামায়ে কিরাম , তালিবুল ইলম ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লী অংশ গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা প্রেমনল আযীযনগর হেমায়েতে ইসলাম সংলগ্ন মাকবারায়ে আযীযীতে দাফন করা হয়। জানাযার ইমামতি করেন তাঁরই সুযোগ্য সাহেবজাদা, মতিঝিল জামি’আ দ্বীনিয়া শামসুল উলূম পীরজঙ্গী মাজার মাদরাসার শায়খে সানী,জাতীয় তাফসীর ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সভাপতি মাও.আবদুল আখির দা.বা.।اللهم  أكرم نزله، ووسّع مدخله، وأبدله داراً خيراً من داره وأهلاً خيراً من أهله، ونقه من الخطايا كما ينقى الثوب الأبيض من الدنس وبلغه الدرجات العليا من الجنة. آمين! মৃত্যুর সময় হজরত রহ. সহধমীনী, পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ে রেখে যান। আলহামদুল্লিাহ পরিবারের সকলে আলিম ও তালিবুল ইলম। আল্লাহ তা’আলা সকলকে তাঁর সেই দ্বীনী ও ইলমী ঐতিহ্য ধরে রাখার তাওফীক দান করুন।  মুরুব্বীদের পরামর্শে হজরত রাহ. এর জীবনী বিষয়ক একটি স্মারকগ্রন্থের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। ইনশাআল্লাহ। পাঠকবৃন্দের নিকট দুআর দারখাস্ত আল্লাহ তা’আলা যেন সহজ করে দেন  এবং উম্মতের জন্য ফায়েদামান্দ হিসেবে কবুল করেন। আমিন।লেখক: হযরতের নাতি। উস্তাযুল হাদিস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া দারুল ঈমান চাঁদপুর।

Go to News Site