Collector
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: প্রতি মিনিটে ইতিহাস গড়ার হাতছানি | Collector
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: প্রতি মিনিটে ইতিহাস গড়ার হাতছানি
Somoy TV

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: প্রতি মিনিটে ইতিহাস গড়ার হাতছানি

দীর্ঘদিনের চেনা বৃত্ত আর গতানুগতিক খোলনলচে ভেঙে সম্পূর্ণ এক নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। কেবল অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বৃদ্ধিতেই নয়, এবার ম্যাচের সংখ্যা থেকে শুরু করে নকআউটের সমীকরণ-সবকিছুতেই থাকছে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা।ফুটবল ইতিহাসে এর আগে এমন ১০৪ ম্যাচের মহাযজ্ঞ কখনো দেখেনি পৃথিবী! ৩টি দেশ, ১৬টি শহর, আর মাঠ কাঁপাতে আসছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮টি দল। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুধু টুর্নামেন্ট নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় এবং সবচেয়ে দামি আসর।তিন দেশের আয়োজন:২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফুটবল বিশ্বে নতুন এক নজির গড়েছিল। এবার সেই যৌথ আতিথেয়তার রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম তিনটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো একজোট হয়ে পুরো বিশ্বকে স্বাগত জানাবে। ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন ভেন্যুর বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ার পাশাপাশি তিন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতি ও ফুটবল উন্মাদনা এই আসরকে দেবে এক অন্য মাত্রা।৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ দল:১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে সবশেষ কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বমঞ্চে ৩২টি দলের লড়াই দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন দর্শক। তবে দীর্ঘ ২৮ বছরের সেই চেনা বৃত্ত এবার ভাঙছে। উত্তর আমেরিকার এই আসরে দল বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮টি। বৈশ্বিক ফুটবলের এই বড় সমপ্রসারণের ফলে সুযোগ পেয়েছে এমন অনেক দেশ, যারা আগে কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখার সুযোগ পায়নি। ফলে এবার দেখা যাবে রেকর্ড সংখ্যক নতুন ফুটবলার ও আন্ডারডগ দলের রোমাঞ্চকর লড়াই।২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং দামি জাঁকজমকপূর্ণ বিশ্বকাপ। যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্ত থেকে আসা ফুটবল যোদ্ধারা লড়বে সিলভিও গাজ্জানিগার গড়া সেই সোনালি ট্রফিটিকে মাথার ওপর তুলে ধরার জন্য।ম্যাচের সেঞ্চুরি:দল বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ম্যাচ সংখ্যায়। কাতার বিশ্বকাপে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ৬৪টি ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪টিতে। অর্থাৎ, এবার বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ম্যাচের সেঞ্চুরি দেখতে যাচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ৩৯ দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্টে ফুটবল উন্মাদনার কোনো কমতি থাকবে না, যা যেকোনো ক্রীড়া আসরের জন্য একটি নতুন রেকর্ড।নকআউটে নতুন সমীকরণ:দল ও ম্যাচের সংখ্যা বাড়ায় ফিফাকে বদলে ফেলতে হয়েছে টুর্নামেন্টের মূল কাঠামো। এবার ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে মোট ১২টি গ্রুপে। যেখানে প্রতি গ্রুপে থাকছে ৪টি করে দল। আগের মতো প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল তো নকআউটে যাবেই, তবে এবার নতুন টুইস্ট হিসেবে ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা ৮টি ‘তৃতীয় স্থান’ অধিকারী দলও শেষ ৩২-এ যাওয়ার টিকিট পাবে। এর ফলে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত প্রতিটি দল টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ নেবে।ট্রফি ছুঁতে জিততে হবে আট ম্যাচ:ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত দিন চ্যাম্পিয়ন হতে হলে একটি দলকে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ৭টি বাধা পার করতে হতো। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই সমীকরণ অতীত। নতুন কাঠামো অনুযায়ী এবার সোনার ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে চ্যাম্পিয়ন দলকে পুরো টুর্নামেন্টে রেকর্ড ৮টি ম্যাচে জিততে হবে। ৩৯ দিনের এই দীর্ঘ পথচলায় শারীরিক ও মানসিকভাবে যে দল সবচেয়ে বেশি লড়াকু হবে, তাদের মাথায় উঠবে বিশ্বসেরার মুকুট।তবে এবারের বিশ্বকাপের গল্প শুধু মেসি, নেইমার, রোনাল্ডো, এমবাপ্পে বা ভিনিসিয়ুসদের ঘিরেই নয়। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বেশি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের উপস্থিতিও তৈরি করেছে নতুন আলোচনার জন্ম! মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা, মুসলিম বিশ্বের এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব দেখা যাবে এইবারের ফুটবল আসরে।বিশ্বকাপে মুসলিম বিশ্বের রেকর্ড উপস্থিতি:২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেখানে মুসলিম দেশের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি, সেখানে এবার তা এক লাফে পৌঁছেছে ১৪টিতে! অর্থাৎ, ৪৮ দলের এই মেগা আসরের প্রায় ৩০ শতাংশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। মহাদেশভিত্তিক হিসাবে, সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব এসেছে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে। এশিয়া থেকে মাঠ কাঁপাতে আসছে সৌদি আরব, কাতার, ইরান ও ইরাক । তাদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আলোয় পা রাখতে যাচ্ছে জর্ডান ও উজবেকিস্তান। আফ্রিকা থেকে নাইজেরিয়া, সেনেগাল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিশর এবং ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। অন্যদিকে ইউরোপ থেকে প্রতিনিধিত্ব করছে তুরস্ক এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। তবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে এবার কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ জায়গা করে নিতে পারেনি। এবারের বিশ্বকাপে রয়েছে কয়েকটি দারুণ প্রত্যাবর্তনের গল্পও। প্রায় ৪০ বছর পর আবার বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে ইরাক আর ২৪ বছর পর ফিরছে তুরস্ক। সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপে মুসলিম দেশগুলোর এই রেকর্ড উপস্থিতি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলে মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান শক্তি, বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতার হবে অনন্য নজির।সোনার পায়ে ফুটবলের রাজপুত্ররা:এবার আসা যাক টাকার অঙ্কে। এই কোটি কোটি ডলারের টুর্নামেন্টে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় কে? একসময় বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা মানেই ছিল মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমার। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামছেন স্পেনের মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। বর্তমান বাজারে তার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক গোল করার পাশাপাশি ইউরোপের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করায় তার বাজারমূল্য ১৯ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। তৃতীয় অবস্থানে আছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে যার বাজারমূল্য ১৯ কোটি ইউরো। তার নেতৃত্বেই বাজারমূল্যের দিক থেকে সবচেয়ে দামি স্কোয়াড নিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ফ্রান্স।কোচিং দুনিয়ার মহারাজারা:খেলোয়াড়রা তো মাঠে লড়বেন, কিন্তু ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ডদের পেছনে কার খরচ সবচেয়ে বেশি? এই তালিকার শীর্ষে আছেন ব্রাজিলের নতুন ডিরেক্টর বা কোচ কার্লো আনচেলত্তি। হেক্সা মিশনের জন্য আনচেলত্তির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ)। আর সেই বিশ্বাসের মূল্য হিসেবেই তাকে দেওয়া হচ্ছে বার্ষিক বেতন ৮২ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড। দ্বিতীয় স্থানে আছেন ইংল্যান্ডের টমাস টুখেল, যার বার্ষিক বেতন প্রায় ৫০ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড। তৃতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মাউরিসিও পচেত্তিনো, তিনি পান প্রায় ৪৫ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড। এরপর রয়েছেন জার্মানির জুলিয়ান নাগেলসম্যান (৪২ লাখ পাউন্ড), উজবেকিস্তানের ফ্যাবিও ক্যানাভারো (৩৫ লাখ পাউন্ড), এবং পর্তুগালের রবার্তো মার্তিনেজ (৩৫ লাখ পাউন্ড)। ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী কোচ দিদিয়ের দেশম বছরে আয় করেন প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি পান প্রায় ২৮ লাখ পাউন্ড। তালিকার শেষ দুই স্থানে আছেন উরুগুয়ের কিংবদন্তি মার্সেলো বিয়েলসা এবং নেদারল্যান্ডসের রোনাল্ড কোম্যান। দুজনেরই বার্ষিক বেতন প্রায় ২৬ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড।রেকর্ড ভাঙার মেগা মঞ্চে বিশ্বকাপের নতুন যুগ:ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুজনই এখন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে। হয়তো সময়ই উন্মোচন করবে সেই মহাকাব্যিক মুহূর্ত, যেখানে শেষবারের মতো দেখা যেতে পারে তাদের বিশ্বকাপ মঞ্চে।তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে প্রশ্নটা তোলা রইল আপনার কাছেই রেকর্ডের এই মহা-আসরে কার হাতে দেখতে চান বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি? কমেন্ট করে জানান আপনার প্রিয় দলের নাম!বিশ্বকাপের ফুটবলে কেনো চার্জ দিয়ে খেলতে হবে:এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকটি লুকিয়ে আছে মাঠের ফুটবলে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবারের বিশ্বকাপের বল হয়ে উঠছে আরও নিখুঁত এবং স্মার্ট। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের মতো এই ফুটবলকেও মাঠে নামানোর আগে দিতে হবে চার্জ!১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের বল তৈরি করে আসছে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। ২০২৬ সালের জন্য তারা যে বলটি উন্মোচন করেছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ট্রিওন্ডা। এতে ব্যবহার করা হয়েছে কানেক্টেড বল টেকনোলজি, যা মূলত মাঠে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে। খালি চোখে এটি সাধারণ ফুটবলের মতো মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দারুণ বিজ্ঞান। ট্রিওন্ডা বলের ভেতরে একটি ৫০০ হার্জের ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট মোশন সেন্সর চিপ বসানো আছে। একটি ঝুলন্ত সিস্টেমের মাধ্যমে চিপটিকে বলের ভেতরে আটকে রাখা হয়। কাতার বিশ্বকাপের বলেও ছিল এই চিপ। তবে ২০২২ বিশ্বকাপের বলের সঙ্গে এর একটি বড় পার্থক্য আছে। আগের বিশ্বকাপে সেন্সরটি বলের ঠিক মাঝখানে বসানো ছিল। এবারের এই বলের সেন্সরটি বসানো হয়েছে বলের এক পাশে!আসন্ন ১০৪ ম্যাচের সেই দীর্ঘ মহাযাত্রার প্রতিটি মিনিটে তাই রেকর্ড ইতিহাস গড়ার হাতছানি।লেখক: ইউনুস রাজু, সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

Go to News Site