Jagonews24
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসেই ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি। উৎপাদন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সঙ্গে জ্বালানি, কাঁচামাল এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এরফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার মান ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তারা ঘাটতি কমাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতির এ প্রবণতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) প্রতিবেদনে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। তবে এপ্রিল শেষে তা বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৬ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৫৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। ফলে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার বেশি হয়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতিও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল ৫৮ কোটি ৬ লাখ ডলার। এপ্রিল শেষে তা বেড়ে ১০৭ কোটি ৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এক মাসে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ৭ লাখ ডলার। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, প্রবাসী আয়, বিনিয়োগ আয় এবং অন্যান্য চলতি স্থানান্তর অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ হিসাবের ঘাটতি বাড়া বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। বেড়েছে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তও অন্যদিকে, আর্থিক হিসাব (ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। জুলাই-মার্চ সময়ে এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। এপ্রিল শেষে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক ঋণ, বাণিজ্য ঋণ এবং অন্যান্য মূলধন প্রবাহ বাড়ার কারণে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত বাড়ছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করছে। ট্রেড ক্রেডিটে উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, জুলাই-মার্চ সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে উদ্বৃত্ত ছিল ৩২২ কোটি ৭ লাখ ডলার। এপ্রিল শেষে তা বেড়ে ৩৫৭ কোটি ১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ট্রেড ক্রেডিট হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে পণ্য বা সেবাগ্রহণের পর মূল্য পরিশোধ করা হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেনে এটি স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় এবং আমদানি কার্যক্রমে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে উন্নতি বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়লেও দেশের সার্বিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালেন্স) কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জুলাই-মার্চ সময়ে সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৬৭ কোটি ২ লাখ ডলার। এপ্রিল শেষে তা বেড়ে ৩৭৪ কোটি ১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আর্থিক হিসাব ও ট্রেড ক্রেডিটে ইতিবাচক প্রবাহ অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্য উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে, যদিও বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। এদিকে, আজ সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের সঙ্গে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এ ঘাটতির পরিমাণ ৭ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, ভুটান এবং পাকিস্তানের সঙ্গেও বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের ভুলনীতির কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিও এতে ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতিবিদ ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়া। সাধারণত উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিও দ্রুত বাড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল, এলএনজি, শিল্প-কারখানার কাঁচামাল এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়ে যায়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়, সীমিত উৎপাদন সক্ষমতা এবং রপ্তানি খাতের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ানোকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফলে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে, টাকার মান দুর্বল হবে, মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে, ব্যাংকিং ও আমদানি ব্যবস্থা চাপে পড়তে পারে। এ অর্থনীতিবিদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি প্রশমনে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ঘাটতির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ইএআর/এমএএইচ/
Go to News Site