Collector
আমে লাভের আশা ফিকে ঈদের ছুটিতে | Collector
আমে লাভের আশা ফিকে ঈদের ছুটিতে
Jagonews24

আমে লাভের আশা ফিকে ঈদের ছুটিতে

মণপ্রতি কমেছে হাজার টাকা ঈদ ও পরিবহন সংকটে কমেছে চাহিদা লোকসানের শঙ্কায় হাজারো আমচাষি গাছভর্তি আম দেখে কয়েক সপ্তাহ আগেও আশায় বুক বেঁধেছিলেন রাজশাহীর চাষিরা। কিন্তু কোরবানির ঈদের পর সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। মোকামে আমের স্তূপ থাকলেও নেই কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা, মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে রেকর্ড ফলনের মৌসুমেও লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন হাজারো চাষি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন। বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। তবে ফলনের এই প্রাচুর্য এখন অনেক চাষির জন্য আশীর্বাদের বদলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহীর বানেশ্বর হাটে হতাশার দীর্ঘশ্বাস রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের মোকাম পুঠিয়ার বানেশ্বর হাট। মৌসুমের শুরুতে যেখানে পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ভিড় জমে। তবে ঈদের পর এই বাজারটিতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আমভর্তি ভ্যান, অটোরিকশা, পিকআপ ও ট্রাক এসে ভিড় করছে। কৃষকেরা বাগান থেকে আম তুলে নিয়ে আসছেন আশায় বুক বেঁধে। কিন্তু আড়তদারদের দর শুনে অনেকের মুখে ফুটে উঠছে হতাশার ছাপ। পুঠিয়া উপজেলার আমচাষি রহমান আলী আক্ষেপ করে বলেন, সারা বছর ধরে অনেক যত্ন নিয়ে বাগান পরিচর্যা করেছি। সময়মতো সার-কীটনাশক ব্যবহার করেছি, সেচ দিয়েছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় গাছে প্রচুর ফল ধরেছিল। বাগানে গিয়ে আমে ভরা গাছগুলো দেখলে মন ভরে যেত। তিনি বলেন, গাছে আম দেখে মনে হয়েছিল এবার ভালো লাভ হবে। কিন্তু হাটে এসে দেখি সেই আশা আর নেই। যে দামে আম বিক্রি হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন। আরও পড়ুন রপ্তানিযোগ্য আমের শেষ ‘ভরসা’ সুপারশপ আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ক্যারেট একই কথা বলছেন পুঠিয়ার ভুবননগর গ্রামের আমচাষি আমিনুল ইসলামও। এ চাষির প্রায় ২০ বিঘা আমবাগান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে আমচাষ করছেন। এবারও শুরুতে ভালো ফলন দেখে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তিনি বলেন, একটি আমবাগান শুধু মৌসুমে খরচ করলেই হয় না। সারা বছর পরিচর্যা করতে হয়। সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক, গাছ ছাঁটাই, রোগবালাই দমন—সব মিলিয়ে বিপুল ব্যয় হয়। আগে একজন শ্রমিককে ৫০০-৬০০ টাকা দিলেই কাজ হতো, এখন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি আমের দামই নেই। চারঘাট উপজেলার চাষি আব্দুল হান্নান বলেন, বাজার যদি ভালো না থাকে তাহলে সেই ফলনই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক কৃষক ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বাগান পরিচর্যা করেছেন। এখন তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। দুর্গাপুর উপজেলার পালি গ্রামের চাষি রাজু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদের আগে আমরা ভেবেছিলাম বাজার ভালো থাকবে। কিন্তু হাটে এসে দেখি দর একেবারে পড়ে গেছে। গোপালভোগের যে দাম পাওয়ার কথা ছিল, তার অনেক কমে বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন আম বিক্রি মানে লাভ নয়, লোকসান কমানো।’ চাষিদের দাবি, সরকারিভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ আরও বাড়ানো গেলে উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও বাজারে এমন ধস নামত না। তাদের মতে, প্রতি বছর একই ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি। কয়েক সপ্তাহেই মণে কমেছে হাজার টাকা মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগ আমের মণপ্রতি দাম ছিল প্রায় ২ হাজার টাকার বেশি। বর্তমানে সেই আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। গুটি আমের মণপ্রতি দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। লক্ষ্মণভোগের মণ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকায়। রানীপছন্দও কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছে না। তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে ক্ষীরসাপাত বা হিমসাগর। এই জাতের আমের মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। তারপরও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় দাম কমই রয়েছে। আরও পড়ুন আমে চাঙা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকায় জড়িত লাখো মানুষ ফ্রুট ব্যাগের সংকটে ধুঁকছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষিরা বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে রাজশাহীর আমবাজার ছিল অনেক বেশি চাঙা। গোপালভোগ আমের মণপ্রতি দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার ওপরে ছিল। লক্ষ্মণভোগের দামও দেড় হাজার টাকার নিচে নামেনি বলে জানান ব্যবসায়ীরা। অথচ চলতি মৌসুমে অনেক জাতের আম গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধি, ঈদকেন্দ্রিক চাহিদা হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সাময়িক স্থবিরতার কারণে এই মূল্যপতন ঘটেছে। বানেশ্বর হাটের আম ব্যবসায়ী ইমান আলী বলেন, গত বছর এ সময়ে গোপালভোগের জন্য পাইকারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। এবার সেই চাপ নেই। বাজারে আম বেশি, কিন্তু ক্রেতা কম। ফলে দামও ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঈদের প্রভাব কতটা? চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, কোরবানির ঈদের কারণেই বাজারের এ পরিস্থিতি। ঈদের আগে মানুষের প্রধান ব্যস্ততা থাকে পশু কেনা, খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে। ঈদের পর কয়েকদিন মাংস সংরক্ষণ ও ভোজের সংস্কৃতির কারণে ফলমূলের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। ব্যবসায়ী মো. রাজিবুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদের সময় মানুষ ফলের চেয়ে মাংস নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে আমের বাজারে স্বাভাবিকভাবেই ভাটা পড়ে।’ পরিবহন ও কুরিয়ার সংকটের প্রভাব ঈদের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন ব্যবস্থা সীমিত আকারে পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিসও পুরোপুরি সচল ছিল না। ফলে রাজশাহী থেকে ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে আম পাঠানো ব্যাহত হয়েছে। এতে মোকামগুলোতে আমের চাপ বেড়েছে, কিন্তু বিক্রি বাড়েনি। অনলাইনভিত্তিক আম বিক্রেতারা জানান, ঈদের আগে প্রচুর অর্ডার থাকলেও ছুটির সময় ডেলিভারি অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ক্রেতা অপেক্ষা করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে আমের ব্যবসা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী মিরাজ আফ্রিদি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় রাজশাহীর আম সরবরাহ করছি। সাধারণত মৌসুমের শুরুতে ক্রেতাদের আগ্রহ অনেক বেশি থাকে। কিন্তু এবার ঈদের কারণে বাজারে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক নিয়মিত ক্রেতাও অর্ডার দিতে দেরি করছেন। তিনি বলেন, পরিবহন ও কুরিয়ার সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে ঈদের সময় ডেলিভারি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ফলে বিক্রি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর প্রায় সব বাগানেই ভালো ফলন হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, সরবরাহ বেড়ে গেলে এবং একই সময়ে চাহিদা না বাড়লে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়। বর্তমানে আমবাজারেও সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা কৃষি অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আম বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ফলখাত হলেও এখনো বাজার ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের মতে, আম সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফল বাজারে আসে। ফলে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে যায়। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারিত হলে উৎপাদনের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তারা বলছেন, আম থেকে জুস, পাল্প, শুকনো আম, আচার ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকেরা আরও ভালো মূল্য পেতে পারেন। আরও পড়ুন প্রথম দিনেই সরবরাহের চাপে দাম কমে গেলো হিমসাগরের ভারত থেকে আম কিনবে না জাপান, সুযোগ নিতে পারে বাংলাদেশ   রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগও বাড়াতে হবে। তা না হলে প্রতিবছর আমের মৌসুমে কৃষকরা বাজারে মূল্য অস্থিতিশীলতা এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন যা দীর্ঘমেয়াদে চাষীদের অনুৎসাহিত করবে।’ আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ীরা জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাংগো, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই থেকে বারি আম-৪, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি সংগ্রহ করা যাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি বাজারে এলে নতুন করে চাহিদা তৈরি হতে পারে। কারণ এসব জাতের প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। বানেশ্বর হাটের আড়তদাররা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক। তাদের মতে, ঈদের ছুটি শেষে মানুষ কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে। পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হচ্ছে। কুরিয়ার কার্যক্রমও পূর্ণোদ্যমে শুরু হবে। এতে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে আমের চাহিদা বাড়বে। ব্যবসায়ী ইমান আলী বলেন, আর কয়েকদিনের মধ্যে বাজারে নতুন গতি আসবে বলে আমরা আশা করছি। তখন দামও কিছুটা বাড়তে পারে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহও বেশি। ফলে দামের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট নয়। মৌসুম যত এগোবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, বাজার পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আশা করছি। এমওএইচএম/কেএইচকে/জেআইএম

Go to News Site