Jagonews24
পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক ওয়ার্ডে রোগীদের মারামারিতে এক রোগীর মৃত্যুতে নিরাপত্তা ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সুস্থতার আশায় স্বজনকে হাসপাতালে পাঠিয়ে একজন লাশ হয়ে ফেরা এবং অন্যজন হত্যাকাণ্ডের আসামি হওয়ায় এখন দিশেহারা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ জনবল সংকটকে দায়ী করলেও প্রশ্ন উঠেছে তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে। ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্রাণহানি এড়াতে কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হবার দাবি সংশ্লিষ্টদের। হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ২ জুন দুপুরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া খোঁজাখালির আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল (২৮) ও ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হককে (২৬) অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ভর্তির দিন ও রাতের প্রথম ভাগে দুজনের অবস্থা খানেকটা ভালোই ছিল। তবে বিপত্তি বাধে একই দিনগত রাত ৩ টার দিকে। এসময় হঠাৎ নাজমুলের মানসিক রোগ তীব্র আকার ধারণ করলে একই ওয়ার্ডের ইনজামুল নামের অপর এক রোগীকে আক্রমণ করেন। দুজনের মারামারির এক পর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান ইনজামুল। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন নাজমুলও। এমন ঘটনার পর হাসপাতালে স্পর্শকাতর রোগীদের নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। অভিযোগ উঠেছে, নাজমুলকে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো নির্যাতন করেছে হাসপাতালের কর্মীরা। এমন অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালের আঙিনায় শ্বশুর-শাশুড়ি ও ১৩ মাসের ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে দিশেহারা হয়ে ঘুরছেন নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন। তিনি বলেন, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী অসুস্থ। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই তাকে সুস্থ করতে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম, এখন সে খুনের আসামি হয়ে গেলো। বিলকিস খাতুন আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি রোগীকে সামলাতে না পারে, তবে তারা আমাদের সরাসরি বলতে পারতো। আমরাই অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতাম। কিন্তু তা না করে কেন তার ওপর এমন নির্যাতন করা হলো। নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক বলেন, হাসপাতাল থেকে ফোন করে ডেকে ঢাকার মানসিক হাসপাতালে রেফার করার সব কাগজপত্র ও ওষুধের স্লিপ রেডি করে আমার ছেলেকে রিলিজ (ছাড়পত্র) দিয়ে দেয়। আমি গাড়িতে ওঠার সময় হঠাৎ তারা বড় ডাক্তারের কাছ থেকে আরও কিছু ওষুধ লিখিয়ে দেওয়ার নাম করে আমার কাছ থেকে কাগজপত্রগুলো ফেরত নেয়। এরপর আমার ছেলেকে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে আবার ভেতরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। তারা তাকে আর আমাদের কাছে ফেরত দেয়নি। ওরা আমার ছেলেকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানসিক রোগী নাজমুলকে অভিযুক্ত করে নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল পাবনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও ব্যর্থতার জন্যই তার ভাইকে প্রাণ দিতে হয়েছে অভিযোগ করে ইজাজুল বলেন, যিনি আমার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে তিনিও তো মানসিক রোগী। এমন দুজন রোগীকে তারা কেন একসঙ্গে রাখলো? যখন মারামারি করছিলো তারা কেন থামাতে পারলো না? তাহলে হাসপাতালে এনে লাভ কী? আমি সেবাকর্মীদের কাছে জানতে চাইলে বলেছে, তারা ভয়ে মারামারি থামাতে যায়নি। তবে দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল না দাবি করে, তীব্র জনবল সংকটকে দায়ী করছেন হাসপাতালের সেবাকর্মী ও চিকিৎসকরা। এ বিষয়ে হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রেখা আক্তার জানান, হঠাৎ করেই চরম সহিংস আচরণ শুরু করে রোগীরা। কখনো পরিস্থিতি এতোই জটিল হয়ে ওঠে যে, রোগীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০ জন মিলেও হিমশিম খেতে হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হাসপাতালের অনেক নার্সই বিভিন্ন সময় রোগীদের মারধরে আহত হয়েছেন। হাসপাতালে পুরুষ সেবাকর্মীর সংকট রয়েছে। মানসিক রোগী সামলানোর জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকিভাতা কিছুই নেই। তাই সদিচ্ছা থাকলেও প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ জানালেন, গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেছে। মৃত্যুর ঘটনা অনাকাঙ্খিত ওু দুঃখজনক। অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদেরও আমাদের পৃথক আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। সীমিত জনবল নিয়ে এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রামদুলাল ভৌমিক মনে করেন, মানসিক হাসপাতালে প্রায়শই রোগী মৃত্যুর ঘটনায় সামগ্রিক সেবা পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষায়িত এ হাসপাতালে কর্মরত সেবাকর্মীদের আলাদা প্রশিক্ষণ, ঝুঁকিভাতা ও সহিংস পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৌশলগত প্রস্তুতি প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে এসব ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ হয়নি, যা মানসিক রোগীদের প্রতি এক প্রকার রাষ্ট্রীয় অবহেলা। স্পর্শকাতর ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্রাণহানি এড়াতে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তৃপক্ষ আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত চলছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানসিক রোগীর মানসিক অসুস্থতা ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। আলমগীর হোসাইন নাবিল/এনএইচআর/জেআইএম
Go to News Site