Jagonews24
আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পল্লবীর নির্যাতিত শিশুটির বাবা বলেছিলেন, “আমি সন্তান হারানোর বিচার চাই না। কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না।” ছোট্ট শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা এবং তার বাবার এই ক্ষোভ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়েছিল। আর ঝাঁকুনি দিয়েছিল বলেই শিশুটির হত্যা মামলার বিচারিক রায় দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯ দিনে। এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুত বিচার হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। পল্লবীর ওই শিশুটির মতো এমন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা তো এ দেশে প্রথম নয়। এ দেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়। সে হোক রামিসা, আছিয়া, চট্টগ্রামের কাটা গলা নিয়ে হেঁটে আসা শিশুটি, শাহবাগের ফুল বিক্রেতা শিশু অথবা বলাৎকারের শিকার নিহত শিশু আবদুল্লাহ। শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৮০ জন শিশু ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ৬৯ জনই শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। পল্লবীর আলোচিত শিশু হত্যা মামলার রায়ে দেশবাসীর মনে এখন আশার সঞ্চার হয়েছে। মানুষ ভাবছে, অন্যান্য ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোরও হয়তো হিল্লে হবে। যত দ্রুত ধর্ষণ মামলার বিচার হবে, যত দ্রুত অপরাধী সাজা পাবে, তত দ্রুত এই ভয়ংকর অপরাধ কমবে। তবে শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই অপরাধ কমে যাবে, এমন কোনো কথা নেই। অপরাধবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধী যদি মনে করে তার ধরা পড়ার ভয় খুব কম এবং জামিন নিয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাহলে কঠোরতম শাস্তি হলেও এর প্রভাব সীমিত হতে পারে। যেমন দিনাজপুরের পার্বতীপুরের পূজা ধর্ষণ মামলায় প্রধান আসামি সাইফুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে এক ফাঁকে জামিন নিয়ে বের হয়ে এসেছিল। জামিন পাওয়ার পর সে এলাকায় ফিরে গিয়ে পূজা ও পূজার পরিবারকে আবার ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছিল। তার জামিনের খবরে চারদিকে হইচই পড়ে গেলে তাকে অবশ্য আবার আটক করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষণ ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ কি পারবে সেভাবে ধর্ষণ ঠেকাতে? দ্রুত ও দক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের উন্নতি, বিশেষায়িত আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের সর্বাত্মক সমর্থন পাওয়া গেলে পারবে। আর যদি পারে, তাহলেই আজ পল্লবীর হত্যার শিকার শিশুর দ্রুত বিচার পাওয়া সার্থক হবে। নয়তো সব আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কাজে আসবে না। দেশে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ধর্ষণ মামলার হার বেড়েছে, অথচ ধর্ষণের দায়ে শাস্তি হচ্ছে খুব সামান্য। মানবাধিকার সংস্থা ও আইনি সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত ১০ বছরে মোট দায়ের হওয়া ধর্ষণের মামলায় শাস্তির হার খুবই নগণ্য, যা ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যদিও ধর্ষণের বিচারের সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। ধর্ষণের বিচারের এই দুর্ভাগ্যজনক চিত্র ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ভুক্তভোগীর পরিবারগুলো হতাশা বোধ করে। এ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখেরও বেশি, যার মধ্যে বহু ধর্ষণ মামলা ৫ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। দীর্ঘসময় মামলা ঝুলে থাকলে কী হয়, সে প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ওয়ারেন ই. বার্গারের একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য আছে: “একটি স্বাধীন জাতির স্বাধীনতার ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে আদালতের ওপর আস্থা অপরিহার্য। আর এই আস্থা তখনই ভেঙে পড়ে, যখন দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার বঞ্চিত হয়।” (সূত্র: রাফসান গালিব, প্রথম আলো) মামলার এই ধীরগতি ও নিম্ন সাজা হারের পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে, এর মধ্যে আছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, স্বীকৃতির অভাব ও সাক্ষ্যসংকট। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার কারণে অনেক সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ হারিয়ে যায় অথবা সাক্ষীরা হুমকি ও প্রলোভনের মুখে পিছিয়ে যান। তা ছাড়া বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার মামলা ঝুলে থাকায় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কাজ করে না। যে কারণগুলোর কারণে ধর্ষণ মামলা ঝুলে থাকে, পল্লবীর হত্যার শিকার শিশুটির মামলার বিচারের ক্ষেত্রে সেই কারণগুলোরই দ্রুত সুরাহা হয়েছে রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হওয়ায়। যেমন পুলিশ তদন্ত খুব দ্রুত শেষ করেছে। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ গঠনের পর টানা শুনানি নেওয়া হয় এবং অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য স্বল্প সময়ে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সব ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে যে এমন দ্রুত বিচার হবে, তা আশা করা যাবে না। একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যে দ্রুত বিচার হওয়া আর বিচার সম্পন্ন হওয়া এক জিনিস নয়। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে সাধারণত উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া বাকি থাকে। তাই ট্রাইব্যুনালের রায় দ্রুত হলেও মামলার পুরো আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকে। এখানে ঠিক কতটা সময় লাগবে, তা দেখার বিষয়। উচ্চ আদালতের রায়ের পর রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন আসে। এখন দেখতে হবে উচ্চ আদালত কতটা সময় নেয়। ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর সব সময়ই প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। কারণ আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, আদালত একা ন্যায়বিচার দিতে পারে না; কারণ মামলা দায়ের, তদন্ত পরিচালনা এবং সাক্ষী উপস্থাপনের ৯৯ শতাংশ প্রক্রিয়াই রাষ্ট্র পরিচালিত। ত্রুটিপূর্ণ এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার অভাব আছে। আর সেই আস্থাহীনতার কারণেই ভুক্তভোগীরা মামলা ও অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পায় অথবা খালাস পেয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষণ ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ কি পারবে সেভাবে ধর্ষণ ঠেকাতে? দ্রুত ও দক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের উন্নতি, বিশেষায়িত আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের সর্বাত্মক সমর্থন পাওয়া গেলে পারবে। আর যদি পারে, তাহলেই আজ পল্লবীর হত্যার শিকার শিশুর দ্রুত বিচার পাওয়া সার্থক হবে। নয়তো সব আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কাজে আসবে না। ৮ জুন, ২০২৬ লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক। এইচআর/এএসএম
Go to News Site