Somoy TV
আমাদের কওমী মাদরাসাগুলোর প্রধানতম উদ্দেশ্য হল, দ্বীন ও উম্মাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক ঝাঁক যোগ্য ব্যক্তি তৈরি করা। আলহামদুলিল্লাহ, প্রায় সকল কওমী মাদরাসা এ উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।তবে এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু কিছু পদ্ধতিগত সমস্যা কম-বেশ সবার নজরেই আসছে। আত্মসমালোচনার খাতিরে এসব বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন, একটি বিষয় হল, প্রায় সকল কওমী মাদরাসায় উস্তাদদেরকে সারাদিন ছাত্রদের পেছনে লাগিয়ে রাখা হয়। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ মনে করেন, উস্তাদদেরকে বেত হাতে দিয়ে ছাত্রদের পেছনে লাগিয়ে দিলেই কাজ শেষ। এর দ্বারা ভালো ছাত্র তৈরি হবে। অবশ্যই আমরা বিশ্বাস করি, তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো। কিন্তু বাস্তবতা হল, ছাত্রগঠনের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। বরং এর চেয়ে আরো বেশি জরুরি হল, উস্তাদকে গঠন করা। একথা অনস্বীকারর্ যে, ছাত্রের ইলমী ও ফিকরী উন্নতির জন্য অবশ্যই উস্তাদের ইলমী ও ফিকরী উন্নতি অপরিহারর্য। একজন ছাত্র তার উস্তাদ থেকে যেমনিভাবে দরসের ভেতরে কিতাবের ইলম অর্জন করে, ঠিক তেমনিভাবে উস্তাদকে দেখে দেখে তার ফিকিরের ভিতও তৈরি হয় এবং উস্তাদ থেকে সে জীবনাচার শেখে। তাই এ জন্য উস্তাদের আমল-আখলাক ও ইলমী ভিত মজবুত হওয়ার বিকল্প নেই। এখন একজন উস্তাদ যদি সারাদিন নিজস্ব ব্যস্ততা বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততার কারণে পড়াশোনার সুযোগ না পান এবং নিজেকে যোগ্যরূপে তৈরি করতে না পারেন, তাহলে তিনি সারাদিন ছাত্রদের যতই মুতালাআর গুরুত্ব নিয়ে বয়ান আর নসীহত করুক না কেন? তা কিন্তু ছাত্রদের মাঝে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। এটাই সত্যকথা। আরও পড়ুন: ঘন ঘন ভূমিকম্প কি কিয়ামতের আলামত? একজন ছাত্র যখন দেখবে তার উস্তাদ সারাদিন নিজের রুজি-রুটির তালাশে পুরো সময়টুকুই ব্যয় করে দিচ্ছেন, কিংবা মোবাইল, আড্ডাবাজি, চায়ের স্টলে কিংবা দোকানে-দোকানে আড্ডা দিয়ে বা পানের দোকানে বসে বসে সময় নষ্ট করছেন, তখন ওই উস্তাদের নসীহত ছাত্রদের হৃদয়ের গভীরে খুব বেশি একটা প্রভাব ফেলবে না। ওই উস্তাদ যতই মুতালাআর মজার কথা বলুক না কেন, ছাত্র বলবে, তাহলে ওই মজা কেন আপনি চেখে দেখছেন না? এটাই সত্য। পক্ষান্তরে যে উস্তাদ সবসময় পড়াশোনা ও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, পড়ালেখার ব্যাপারে তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে ছাত্ররা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিবে, তাকে দেখে বহু ছাত্রের হৃদয়ে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ-স্পৃহা তৈরি হবে। মোটকথা, নসীহতের চেয়েও উস্তাদের কাজকর্ম ছাত্রদের মধ্যে বেশি প্রভাব ফেলে। তাইতো খলীফা মামুনুর রশীদ চমৎকার বলেছেন-نحن إلى أن نُوعظ بالأعمال، أحوج منا إلى أن نوعظ بالأقوال. কথা দিয়ে উপদেশ দেওয়ার চেয়ে কাজ দিয়ে উপদেশ দেওয়া আমাদের বেশি প্রয়োজন।-(জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি, বর্ণনা ৮৬৯) তাই আমার ক্ষুদ্র খেয়াল হল, কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ যদি বাস্তবেই ছাত্র গড়তে চায়, তাহলে তাদের কর্তব্য হবে, ছাত্র গড়ার পাশাপাশি উস্তাদকে আত্মগঠনের সুযোগ করে দেয়া। তাকে পর্যাপ্ত মোতালাআর সুযোগ দেয়া এবং উস্তাদদের দরসের চাপে না ফেলা; বরং সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, শুধু ততটুকু দরস ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব দেয়া। এবং যে উস্তাদের যাওক ও রূচি যে কাজের দিকে, তাকে ওই কাজেরই দায়িত্ব দেয়া। প্রয়োজনে এর জন্য (যদি মাদরাসার আর্থিক সাপোর্ট থাকে) পর্যাযপ্ত পরিমাণে উস্তাদ রাখা। তাহলে এর দ্বারা মাদরাসারও উপকার হবে, ছাত্রদেরও উপকার হবে এবং মাদরাসায় ইলমী পরিবেশ তৈরি হবে, তিনি ছাত্রদের খোরাক দিতে পারবেন। আর যদি উস্তাদকে সে সুযোগ না দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, এক সময় উস্তাদ মেধাশূন্য হয়ে গেছেন। তখন তিনি ছাত্রদের কিতাব পড়াবেন ঠিক; কিন্তু ছাত্ররা তাঁর থেকে খোরাক পাবে না। তিনি সৃজনশীল কোনো কিছু ছাত্রদের ও প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারবেন না। দুঃখজনক বাস্তবতা হল, আমাদের অধিকাংশ মাদারিসের চিত্র এমনি। যে সকল মাদরাসার আর্থিক সাপোর্ট ভালো, তারা উল্লিখিত পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে পারেন। কোনো কোনো মাদরাসায় তো দেখা যায়, উস্তাদ ছাত্রদের সঙ্গে ইলমী বিষয়ে আলোচনা না করে, তাঁর ব্যবসা-বানিজ্য, টাকা কামানোর বিভিন্ন সোর্স নিয়ে আলোচনা করেন। এটি অনুচিত একটি কাজ। এটি ছাত্রদের মাঝে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ছাত্র যখন দেখবে, তার উস্তাদের সকাল-সন্ধ্যা কাটছে টাকা-পয়সার চিন্তায়, রুটি-রুজির সন্ধানে এবং উস্তাদ নিজেই কওমী মাদরাসায় পড়ে হীনমন্যতায় ভুগেছেন, তাহলে ওই উস্তাদ থেকে ছাত্র ইলমী খোরাক কী পাবে? বরং উস্তাদের কথাবার্তায় ছাত্রের মধ্যে হীনমন্যতা জেঁকে বসবে এবং কওমী মাদরাসার প্রতি ও দ্বীনী শিক্ষার প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে। তাই এমনটি থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কোনো কোনো মাদরাসার হালত তো এমন যে, সেখানে ইলমী মেযাজের কোনো উস্তাদ গেলে, পরিবেশের কারণে এক সময় তার ইলমী যাওকও নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ মাদরাসার পরিবেশ তাকে আত্মগঠনের ও পর্যাপ্ত মুতালাআর সুযোগ দিবে তো দূর কী বাত! বরং তার আগের প্রতিষ্ঠান কিংবা তার আসাতেযায়ে কেরাম থেকে অর্জিত ইলমী যাওকও নষ্ট করে দেয়। আমাদের সালাফগণ এ ধরণের পরিবেশ থেকে দূরে থাকতেন। জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী গ্রন্থে ইমাম ইবনে আবদুল বার রহ. (মৃত: ৪৬৩হি.) বর্ণনা করেন-قدم سفيان الثوري عسقلان فمكث ثلاثا لا يسأله أحد في شيء فقال: اكتر لي أخرج من هذا البلد، هذا بلد يموت فيه العلم সুফিয়ান সাওরী রহ. একবার আসকালান শহরে এলেন এবং সেখানে তিনি তিনদিন অবস্থান করেন। কিন্তু এ তিনদিন কেউ তাঁকে ইলমী বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি, তখন তিনি বলেন, আমার জন্য একটি বাহনের ব্যবস্থা করো। আমি এ শহর থেকে বেরিয়ে যাবো। এটি এমন এক শহর, যেখানে থাকলে ইলমের মৃত্যু ঘটবে। (বর্ণনা, ৭৪৪) খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আমাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন, ছাত্র যামানায়ও খুবই মেহনতী ছিলেন। কিন্তু কিসমতের তাগিদে এমন প্রতিষ্ঠানে তার খেদমত ঠিক হয়েছে, যেখানে না ইলমী পরিবেশ আছে, না তার পক্ষে (প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বিপরীতে গিয়ে) পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলে ইলমী পরিবেশ কায়েম করা সম্ভব। ফলে একটা সময় গিয়ে তিনিও অন্য দশজনের মতোই হারিয়ে যান। অথচ এসব মেধা ও প্রতিভাগুলোকে কাজে লাগালে উম্মাহর বহু উপকার হতো। একদিকে যেমন তাঁরা দ্বীনের জন্য তৈরি হতো। অপরদিকে তাঁরা অন্য আরো দশজনকেও তৈরি করতে পারতেন। আমি আমার ছোট্ট জীবনে এমন অনেক মানুষ দেখেছি, যারা অনুকূল পরিবেশ পেলে হয়ত অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু কালেরচক্রে তাঁরা হারিয়ে গেছেন। পরিবেশ তাঁদের সঙ্গ দেয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান ও এসব পরিবেশের ব্যাপারে হযরত সুফিয়ান সাওরী রহ. এর এ নসটি খুবই প্রযোজ্য। তাই যামানার মুরব্বীদের প্রতি এ অসহায় মানুষটির হৃদয়ের আহ্বান থাকবে, তাঁরা যেন বিষয়গুলো নিয়ে ফিকির করেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সহায় হোন, দ্বীনের খেদমতের জন্য কবুল করুন। লেখক, উস্তাযুল হাদীস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া দারুল ঈমান (বেগম মসজিদ কমপ্লেক্স) নতুন বাজার, সদর চাঁদপুর। খিররীজ, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা।
Go to News Site