Jagonews24
কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টোতে অনুষ্ঠিত একটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক উৎসবের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর অভিবাসন, বহুসংস্কৃতিবাদ ও জাতিগত পরিচয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শত শত মানুষের নাচ, গান, খাবারের স্টল এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সেই ভিডিও একদিকে যেমন প্রবাসী ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে তা পশ্চিমা দেশগুলোতে অভিবাসনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্নদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করেছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি উন্মুক্ত জনপরিসরে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সংগীতের তালে নাচছেন। চারপাশে রয়েছে খাবারের স্টল ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। উৎসবমুখর এই দৃশ্যটি শুরুতে সাধারণ একটি সাংস্কৃতিক উদ্যাপন হিসেবেই দেখা হলেও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি ঘিরে বিতর্কের ঝড় ওঠে। বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন একজন ব্যবহারকারী ভিডিওটি শেয়ার করে লেখেন, কানাডা ভারতের একটি উপনিবেশে পরিণত হয়েছে... আমরা এটা আমাদের দেশে হতে দিতে পারি না। এই মন্তব্য দ্রুতই সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগকে উসকে দেয়। পোস্টটি হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া আকর্ষণ করে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ভিডিওটির সমালোচকরা অভিযোগ করেন, অভিবাসীরা বিদেশে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের দেশের সংস্কৃতি পুনরুত্পাদন করছেন। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, কেন নতুন দেশে গিয়ে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় এত জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। কেউ কেউ এমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সীমিত বা নিষিদ্ধ করার দাবিও জানান। অন্যদিকে, বিপুলসংখ্যক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের পক্ষে অবস্থান নেন। তাদের মতে, এসব সমালোচনার মধ্যে বিদেশিবিদ্বেষী বা জেনোফোবিক মনোভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পক্ষ নেওয়া বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই ভারতীয়। অনেকেই মনে করিয়ে দেন যে কানাডা মূলত অভিবাসীদের অবদানের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা একটি দেশ। তারা যুক্তি দেন, অভিবাসীরা শুধু করই দেন না, বরং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আরও অনেকে বলেন, একটি সাংস্কৃতিক উৎসবকে রাজনৈতিক বা জনসংখ্যাগত হুমকি হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের প্রশ্ন, মানুষ আনন্দ করছে, নাচছে ও নিজেদের সংস্কৃতি উদ্যাপন করছে- এর মধ্যে আপত্তিকর কী থাকতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে, এই অনলাইন বিতর্কটি কেবল একটি উৎসব বা একটি ভিডিওকে ঘিরে নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে বড় বড় শহরে দেখা দেওয়া বৃহত্তর সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন। অর্থনৈতিক চাপ, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা ও দ্রুত পরিবর্তিত জনসংখ্যাগত বাস্তবতা অনেক দেশের নাগরিকদের মধ্যে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই বহুসংস্কৃতিবাদকে জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত গোষ্ঠীর সহাবস্থানকে দেশটির অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে টরন্টোর এই ভাইরাল ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে যে দৃশ্যমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর প্রতি এক ধরনের ক্রমবর্ধমান বিরূপ মনোভাবও সমাজের একটি অংশে বিদ্যমান। ফলে একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক উৎসবের ভিডিও এখন পরিণত হয়েছে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক একীকরণ এবং বহুসংস্কৃতিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কের কেন্দ্রে। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে অভিবাসন নিয়ে আলোচনা শুধু নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ক্রমশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জনমত ও রাজনৈতিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। সূত্র: এনডিটিভি এসএএইচ
Go to News Site