Collector
ক্যানসার চিকিৎসায় বড় সাফল্য, ‘স্মার্ট ওষুধেই’ ছোট হচ্ছে টিউমার | Collector
ক্যানসার চিকিৎসায় বড় সাফল্য, ‘স্মার্ট ওষুধেই’ ছোট হচ্ছে টিউমার
Jagonews24

ক্যানসার চিকিৎসায় বড় সাফল্য, ‘স্মার্ট ওষুধেই’ ছোট হচ্ছে টিউমার

বিশ্বজুড়ে ক্যানসার (Cancer) চিকিৎসায় একের পর এক নতুন অগ্রগতির খবর উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে হয়ে যাওয়া বৃহত্তম ক্যানসার সম্মেলনে। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও গবেষকরা জানিয়েছেন এমন কিছু নতুন ওষুধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা-পদ্ধতির কথা, যা ক্যানসার মোকাবিলার ধরনই বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (এএসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে প্রায় ৪০ হাজার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। সম্মেলনে ২০০টিরও বেশি সেশন ও ২ হাজার ৭০০ পোস্টার উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘দ্য সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস অব ট্রান্সলেশন: ইমপ্রুভিং ক্যানসার আউটকামস ওয়ার্ল্ডওয়াইড’। সম্মেলনে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো... টিউমারের ‘অদৃশ্য চাদর’ সরিয়ে দিচ্ছে স্মার্ট ওষুধ গত এক দশকে ইমিউনোথেরাপি ক্যানসার চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এই চিকিৎসা শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হয় না। অনেক সময় ক্যানসার কোষ নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। এবার গবেষকরা এমন একটি নতুন স্মার্ট ওষুধ তৈরি করেছেন, যা ক্যানসার কোষের সেই লুকিয়ে থাকার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। পরীক্ষামূলক ট্যাবলেট জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯ বিশ্বের ছয়টি সাধারণ ক্যানসারের ক্ষেত্রে টিউমার কমাতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব রোগীই আগে বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। অনেকের আর কোনো চিকিৎসার সুযোগও অবশিষ্ট ছিল না। গবেষকরা জানান, ওষুধটি টিউমার কোষের ওপর থাকা ‘অদৃশ্য চাদর’ সরিয়ে দেয়। ফলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করতে পারে। এরপর সেমিপ্লিম্যাব নামের ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের ক্রিস্টি এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট-এর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, জরায়ুমুখ, মূত্রথলি, লিভার, অন্ত্র, ফুসফুস ও মাথা-ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ৮৩ জন রোগীর মধ্যে ২৬ জনের টিউমার ছোট হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জনের টিউমার অন্তত ৩০ শতাংশ কমেছে। প্রধান গবেষক অধ্যাপক ফিওনা থিসলথওয়েট বলেন, ট্যাবলেট আকারে দেওয়া একটি ওষুধের জন্য এই ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তিনি বলেন, এটি নতুন ধরনের ওষুধ ও এটি ইমিউনোথেরাপিকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করছে। সম্মেলনে উপস্থাপিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ইভোনেসসিম্যাব নামের আরেক স্মার্ট ওষুধ কেমোথেরাপির সঙ্গে ব্যবহার করলে ফুসফুস ক্যানসারের রোগীরা গড়ে ১৫ শতাংশ বেশি সময় বেঁচে থাকেন। ক্যানসার রিসার্চ ইউকে এই আবিষ্কারকে ‘আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি’ বলে উল্লেখ করেছে। আরেকটি নতুন ওষুধ ওজেকিবার্ট শরীরের একটি প্রাকৃতিক প্রোটিনের মতো কাজ করে। এটি ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোষের মৃত্যু ঘটায়। একই সঙ্গে সুস্থ কোষের ক্ষতি কমায়। অন্ত্রের ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ওষুধটি কিছু রোগীর টিউমার ছোট করেছে ও অন্যদের ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতি থামিয়েছে। এক রোগী বলেন, এই চিকিৎসা তাকে ‘নতুন জীবন’ দিয়েছে। প্রতিদিনের একটি বড়ি দ্বিগুণ করছে অগ্ন্যাশয় ক্যানসার রোগীর আয়ু সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত আবিষ্কারগুলোর একটি ছিল ডারাক্সনরাসিব নামের একটি নতুন বড়ি। গবেষকরা জানান, এটি অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ করতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অগ্রগতিগুলোর একটি বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সাধারণ ক্যানসারগুলোর একটি হলো অগ্ন্যাশয় ক্যানসার। এতদিন এর কার্যকর চিকিৎসা খুবই সীমিত ছিল। ৫০০ রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, যাদের ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে ডারাক্সনরাসিব কেমোথেরাপির তুলনায় কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ওষুধটি গ্রহণকারী রোগীরা গড়ে ১৩.২ মাস বেঁচে ছিলেন। অন্যদিকে, কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের গড় আয়ু ছিল ৬.৬ থেকে ৬.৭ মাস। অ্যারিজোনা ক্যানসার সেন্টারের অনকোলজি প্রধান ডা. রচনা শ্রফ বলেন, এই ফলাফল ক্যানসার চিকিৎসার চিত্রই বদলে দিতে পারে। তার ভাষায়, আমরা নজিরবিহীন বেঁচে থাকার হার দেখছি। তিনি জানান, গবেষণার ফল প্রথম পড়ার সময় তিনি আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বোস্টনের ডানা-ফারবার ক্যানসার ইনস্টিটিউট। এদিকে, মেজিগডোমাইড নামের আরেকটি বড়ি রক্তের এক ধরনের অনিরাময়যোগ্য ক্যানসারের রোগীদের জন্য আশার খবর দিয়েছে। বিদ্যমান চিকিৎসার সঙ্গে এটি যুক্ত করলে রোগীরা ক্যানসারের অগ্রগতি ছাড়া দ্বিগুণেরও বেশি সময় বাঁচতে পারেন। মেজিগডোমাইড শরীরের একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্যানসার কোষ টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষতিকর প্রোটিন ধ্বংস করে। একই সঙ্গে এটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও সক্রিয় করে। অনেক রোগীর আর কেমোথেরাপি প্রয়োজন নাও হতে পারে নতুন ওষুধের পাশাপাশি কিছু গবেষণা দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু চিকিৎসা নিরাপদভাবে বাদও দেওয়া যেতে পারে। একটি যুগান্তকারী জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত লাখো নারী কেমোথেরাপি এড়িয়ে যেতে পারেন বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। এই পরীক্ষা চিকিৎসকদের নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে, কোন রোগীরা শুধু হরমোন থেরাপি নিলেই নিরাপদ থাকবেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন পরিচালিত অপটিমা ট্রায়াল-এ যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের ৪ হাজার রোগীকে অনুসরণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের জিনগত স্কোর কম ছিল, তাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হরমোন থেরাপিই যথেষ্ট। এক রোগী জানান, কেমোথেরাপি এড়িয়ে যেতে পারা তার কাছে ‘বড়দিনের উপহারের মতো’ ছিল। রোগ নির্ণয়ের নয় বছর পরও তিনি সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে, লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সঙ্গে ডারভালুম্যাব নামের ইমিউনোথেরাপি ব্যবহার করলে মূত্রথলি ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমে এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন এড়ানো যায়। ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সামনে বড় সংকট সম্মেলনে আশাব্যঞ্জক খবরের পাশাপাশি উদ্বেগজনক তথ্যও উঠে এসেছে। ৫০টিরও বেশি ধরনের ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম বলে প্রচারিত গ্যালেরি রক্তপরীক্ষা একটি বড় ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-এর ১ লাখ ৪২ হাজার রোগীকে নিয়ে পরিচালিত গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, এই পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারকে আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব কি না। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, দেরিতে ধরা পড়া ক্যানসারের সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য পূরণ হয়নি। একজন প্রতিনিধি মন্তব্য করেন, গবেষণাটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, বিশ্বে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের গড় আয়ু বাড়ার কারণে এই প্রবণতা আরও তীব্র হবে। তাদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ক্যানসার চিকিৎসা খাতে প্রায় ১০ কোটি কর্মীর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তখন প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ মানুষের নতুন করে ক্যানসার শনাক্ত হবে। সম্মেলনে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যানসারের হার ২০২৫ সালের প্রতি ১ লাখে ১৬৫ জন থেকে ২০৫০ সালে প্রতি ১ লাখে ২০০ জনে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি। বর্তমানে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষের ক্যানসার শনাক্ত হয়। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ৩ কোটি ৫৩ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনের সহ-লেখক ডা. পিটার কিংহ্যাম বলেন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অলস জীবনযাত্রা কমানোর মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসাকর্মীর সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তার ভাষায়, ক্যানসার মূলত বয়সজনিত একটি রোগ। মানুষ বেশি দিন বাঁচছে, তাই ক্যানসারের ঝুঁকির মুখেও বেশি পড়ছে। ঘুম ও জীবনযাপন ক্যানসারের ঝুঁকিতে বড় ভূমিকা রাখে সম্মেলনে উপস্থাপিত দুটি বড় গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে, অপর্যাপ্ত বা অনিয়মিত ঘুম ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ক্যানসার বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে। গত তিন দশকে কম বয়সীদের ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ১৯৯০ সালে বিশ্বে ১৮ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্ত হয়েছিল। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩২ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছায়। একই সময়ে ৪০ বছর বা তার কম বয়সীদের ক্যানসারে মৃত্যুর হার ২৭ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, যাদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে তাদের মধ্যে অন্ত্র, স্তন, জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। কিছু ক্ষেত্রে অনিদ্রায় ভোগা ৫০ বছরের কম বয়সী মানুষের পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা তিন গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। এছাড়া ক্যানসার রোগ নির্ণয়ের পরও জীবনযাত্রার পরিবর্তন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত যোগব্যায়াম ক্যানসার রোগীদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি ও অনিদ্রা কমাতে সাহায্য করে। গবেষকদের মতে, ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়া মানুষের ৯৫ শতাংশই চিকিৎসাকালীন বা চিকিৎসার পর কোনো না কোনো সময়ে ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। অর্ধেকের বেশি রোগী উদ্বেগ, মানসিক অস্থিরতা বা ক্লান্তির অভিজ্ঞতা পান। পরীক্ষার ফল বলছে, নিয়মিত হালকা হঠ যোগ ও রিস্টোরেটিভ যোগ কোনো ওষুধ ছাড়াই এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে সহায়তা করতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান এসএএইচ

Go to News Site