Collector
Giriş Yap
দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটে কর-শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ | Collector
দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটে কর-শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ

দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটে কর-শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট ও রাজস্ব ঘাটতির চাপে থাকা অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এ বাজেটে একদিকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও বিনিয়োগ উৎসাহে কর-শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। ফলে বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশাবাদ থাকলেও মধ্যবিত্তের মধ্যে রয়েছে নতুন উদ্বেগও। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় যা প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ও কথা বলে জানা যায়, এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিল্পায়ন ও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে মন্দা, শিল্প সম্প্রসারণে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার করনীতিকে ব্যবহার করতে চাইছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে। আরও পড়ুন ব্যাংক হিসাব খুলতে বাধ্যতামূলক হচ্ছে টিআইএন দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ এখন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ কারণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার একটা চাহিদা আছে। আর এই কারণেই সম্ভবত সরকার বিভিন্ন রকমের শুল্ক-কর ছাড়ের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। যদিও শুধু শুল্ক-কর ছাড়ই বিনিয়োগ বাড়ানোর একমাত্র নির্ণায়ক নয়। সেইসঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার, জ্বালানি সরবরাহ, জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা, লাইসেন্স ও নিবন্ধন পাওয়ার বিষয়গুলো সহজ করে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে কর-শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু করছাড় নয়, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং লাইসেন্স-নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করাও জরুরি।— সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো অতিমাত্রায় পরোক্ষ করনির্ভর। দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যক্ষ কর, বিশেষ করে আয়কর ও সম্পদ করের অবদান বাড়ানোর কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। আয়করের আওতা বৃদ্ধি, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো মূলত পরোক্ষ করনির্ভর। তাই রাজস্ব বাড়াতে আয়করের আওতা সম্প্রসারণ, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।— অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জাগো নিউজকে জানান, এক বাক্যে বললে, এবারের বাজেটে দেশের মানুষের জন্য শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটাই হলো মূল। দেশের মানুষকেই বাজেটের মূল ফোকাসে রাখা হয়েছে। মানুষের যাতে অসুবিধা না হয় ও বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের যে চাপ, সেটা যাতে কিছুটা হলেও কমাতে পারি সেটিই আমাদের লক্ষ্য। এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য জনগণকে স্বস্তি দেওয়া এবং দ্রব্যমূল্যের চাপ কমিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা।— এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এবারের বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনেও দীর্ঘমেয়াদি কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনের ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে। আরও পড়ুন বাজেটে আইটি খাতে যেসব সুখবর থাকছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতেও কর সুবিধা অব্যাহত থাকবে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, ই-বাইক এবং চার্জিং অবকাঠামোতেও শুল্ক-কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্প খাতের পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও নতুন পদক্ষেপ থাকছে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক্যাল কেবল, স্যানিটারি সামগ্রী এবং কিছু টেক্সটাইল পণ্যকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকরাও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পান। শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য এটি ইতিবাচক বার্তা হলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্বেগের জায়গাগুলো পুরোপুরি দূর হচ্ছে না। কারণ রাজস্ব আদায়ের চাপ সামলাতে সরকার করজাল সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে। আরও পড়ুন নতুন পে-স্কেল জুলাই থেকেই, বাজেটে আসছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আগামী অর্থবছর থেকে ব্যাংক হিসাব খুলতে ট্যাক্সপেয়ার আইডেনটিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও শিক্ষার্থী, ভাতাভোগী ও কিছু বিশেষ শ্রেণির নাগরিক এ বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে পারেন। এছাড়া ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও অগ্রিম কর সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পণ্য সরবরাহ বা ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে প্রতি হাজার টাকায় ২ টাকা হারে অগ্রিম কর আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট নেট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ‘ফিক্সড ভ্যাট’ ব্যবস্থা চালু হতে পারে, যার আওতায় ছোট ব্যবসায়ীদের মাসিক নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট দিতে হবে। যদিও সরকার বলছে এসব কর পরবর্তীতে সমন্বয় করা যাবে, তবু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের একাংশের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্যের দামের ওপর গিয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি স্বস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ব্যক্তি-শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হতে পারে।  আরও পড়ুন বাজেটে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যে কর ছাড় থাকছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু এর আওতায় থাকবে। শিশুখাদ্যের কাঁচামালে আমদানি শুল্ক কমানো, মসলা ও খেজুর আমদানির রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ভোজ্যতেল উৎপাদনে কর অব্যাহতির উদ্যোগও মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাবও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য স্বস্তির খবর। মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখার পরিকল্পনাও নগরবাসীর ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা কমাবে। তামাকপণ্যে কর বৃদ্ধির কারণে সিগারেট ও বিড়ির দাম বাড়তে পারে। দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় আমদানি করা কাজুবাদামের শুল্ক ২৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। রডের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হলে নির্মাণ খাতেও ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। আমদানি করা পাঙাশ ফিশ ফিলেটের ওপর সম্পূরক শুল্ক আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে। আরও পড়ুন বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ‘বড় সুখবর’ দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতের জন্য একগুচ্ছ সুখবর থাকছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। আইটিসহ সকল প্রকার ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতির প্রস্তাব থাকতে পারে। একইসঙ্গে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদেরও জন্য থাকছে সুখবর। তরুণদের উদ্ভাবনী কাজকে উৎসাহ দিতে সকল প্রকার কন্টেন্ট থেকে উপার্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব থাকছে। তারুণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে এবারের বাজেটে স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাবও থাকতে পারে। একইসঙ্গে প্রিন্টার, মনিটর, ফ্ল্যাশ মেমোরিসহ কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে অগ্রিম আয়কর কমছে। দেশে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যেও থাকছে সুখবর। দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর কাঁচামাল আমদানিতে কমানো হতে পারে অগ্রিম আয়কর। এছাড়া কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের জন্য উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধাও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু করছাড় দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। ব্যবসা সহজীকরণ, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সরল করা, ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটে ব্যবসার লাইসেন্স ও নবায়নের মেয়াদ পাঁচ বছর করার চিন্তা সেই দিক থেকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসএম/এমএএইচ/

Go to News Site