Somoy TV
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় আদর্শিক সংকটগুলোর একটি হলো যুবসমাজ কাকে অনুসরণ করবে? প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বৈশ্বিক বিনোদন সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে আজকের তরুণদের সামনে অসংখ্য আইডল উপস্থিত। ফুটবল তারকা, সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী, টিকটক সেলিব্রিটি কিংবা পশ্চিমা সংস্কৃতির জনপ্রিয় মুখগুলো আজ অনেক যুবকের চিন্তা, রুচি ও জীবনযাপনের মানদণ্ড হয়ে উঠছে।তাদের পোশাক, চুলের স্টাইল, কথাবার্তা, জীবনধারা এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক পর্যন্ত অনুকরণ করা হচ্ছে অন্ধভাবে। সফলতার সংজ্ঞাও যেন বদলে গেছে, ভাইরাল হওয়া, জনপ্রিয় হওয়া, বিলাসী জীবনযাপন করাই যেন জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।কিন্তু মুসলিম যুবকদের সামনে কি আদর্শের অভাব রয়েছে? ইসলামের ইতিহাস খুলে দেখলে আমরা এমন সব তরুণের সন্ধান পাই, যাদের চরিত্র, ত্যাগ ও আদর্শ মানবসভ্যতার জন্য আজও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁদের অন্যতম হলেন মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। সৌন্দর্য, আভিজাত্য ও বিলাসিতার কারণে পুরো মক্কায় তিনি ছিলেন বিশেষভাবে পরিচিত। ইতিহাসবিদ ইবনে সাদ তাঁর আত-তাবাকাতুল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেন। মক্কার যুবকদের মধ্যে মুসআবের চেয়ে অধিক বিলাসী ও সৌন্দর্যসচেতন যুবক আর ছিল না। দামী পোশাক, উন্নত সুগন্ধি ও রাজকীয় জীবনযাপন ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু যখন তাঁর হৃদয়ে কুরআনের আলো প্রবেশ করল, তখন তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, দুনিয়ার চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিই চিরস্থায়ী সফলতা। আরও পড়ুন: ঘন ঘন ভূমিকম্প কি কিয়ামতের আলামত? ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁকে ভয়াবহ পারিবারিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর মা, যিনি ছিলেন অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী নারী, ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাঁকে ঘরে বন্দি করে রাখেন। আরাম আয়েশ, সম্পদ ও স্বাধীনতা সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা হয় তাঁকে। অথচ এই কষ্ট তাঁর ঈমানকে দুর্বল করেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে। একসময় যিনি রেশম ছাড়া পোশাক পরতেন না, পরবর্তীতে তাঁকে ছেঁড়া কাপড়ে দেখা গেছে। সাহাবিরা তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের পার্থক্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন।কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু আত্মত্যাগ নয়; বরং তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম দাঈদের একজন। মহানবী সা. তাকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন মানুষকে কুরআন শেখানোর জন্য। তার দাওয়াত, প্রজ্ঞা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মদিনার বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে সেই মদিনাই ইসলামী রাষ্ট্র ও সভ্যতার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়।আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে।” (সূরা আল-আহযাব: ২৩)মুসআব রা.-এর জীবন ছিল এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। উহুদের যুদ্ধে তিনি ইসলামের পতাকা বহন করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, তাঁর কাফনের কাপড় এত ছোট ছিল যে মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। ভাবা যায় যে যুবকের একসময়কার পোশাকের মূল্য দিয়ে বহু গরিব মানুষের সংসার চলতে পারত, মৃত্যুর সময় তাঁর পূর্ণ কাফনের কাপড়ও ছিল না! কিন্তু তিনি দুনিয়া হারিয়ে আখিরাত অর্জন করেছিলেন। আজকের বাস্তবতার সঙ্গে এই ইতিহাসের তুলনা করলে এক ভয়ংকর চিত্র সামনে আসে। বর্তমান সময়ের বহু তরুণ রাত কাটাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনে, ভার্চুয়াল বিনোদনে এবং ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার পেছনে। অথচ সাহাবিদের যুবক জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি, দাওয়াহ ও মানবকল্যাণে নিবেদিত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত প্রভাব তরুণদের মধ্যে এক ধরনের “সেলিব্রিটি সংস্কৃতি” তৈরি করেছে, যেখানে নৈতিকতা ও চরিত্রের চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে অনেক তরুণ ধীরে ধীরে আত্মিক উন্নয়ন ও আদর্শিক চেতনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে; তাই সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, তা যেন লক্ষ্য করে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩) এই হাদিস শুধু বন্ধুত্ব নয়, অনুসরণ ও আদর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। কারণ মানুষ যাকে অনুসরণ করে, ধীরে ধীরে তার চিন্তা ও চরিত্রও তেমন হয়ে ওঠে। আজ মুসলিম যুবকদের নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের আদর্শ কে? যে মানুষ আমাদের আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, নাকি যে মানুষ আমাদের জান্নাতের পথ দেখায়? সময়ের দাবি হলো যুবসমাজ আবার সাহাবিদের জীবনী পড়ুক, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুক, জ্ঞান ও চরিত্র গঠনে মনোযোগী হোক। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একজন আদর্শবান তরুণ পুরো জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। মুসআব ইবনে উমাইর রা. তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
Go to News Site