Jagonews24
২০২৬ সালের প্রথম চার মাস অর্থাৎ জানুয়ারি–এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাকপণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের জানুয়ারি–এপ্রিল সময়ে দেশটিতে পোশাকপণ্য রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের। যদিও এটি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অ্যাপারেল আমদানি বাজার যেখানে ১২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের পতন তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। জানুয়ারি–এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছর ছিল ২৬ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) এ তথ্য প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূলত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাত একটি দ্বিমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে, যেখানে একদিকে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং অন্যদিকে মূল্যও দুর্বল হচ্ছে। তবে কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সোর্সিং বাজারে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে একটি শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইতিবাচক দিক থেকে দেখা যায়, বড় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পতন তুলনামূলকভাবে কম। চীন ও ভারতের মতো বড় সরবরাহকারী দেশগুলো যেখানে আরও তীব্র সংকোচনের মুখে পড়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। আরও পড়ুন ইউরোপে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় কমেছে ১৯.২৬ শতাংশ পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সোর্সিং পদক্রমে বাংলাদেশ এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং ২০২৬ সালের শুরুর কিছু মাসে ভিয়েতনামের পর দ্বিতীয় অবস্থানেও ছিল। ইউনিট মূল্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে, বিশেষ করে চীন ও ভারতের তুলনায়—যেখানে বড় ধরনের মূল্যপতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূলত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাত একটি দ্বিমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে, যেখানে একদিকে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং অন্যদিকে মূল্যও দুর্বল হচ্ছে তবে দুর্বলতার দিকগুলোও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ৯ দশমিক ০১ শতাংশ কমেছে, যা দেখায় যে অর্ডার বা ক্রয়াদেশের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে মোট রপ্তানিমূল্য ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কমেছে, যা শুধু মূল্য নয়, চাহিদা কমারও ইঙ্গিত দেয়। ইউনিট মূল্যও ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছে, যা বোঝায় যে প্রতিযোগিতার চাপে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে মূল্য হারাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইউনিট মূল্য ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছে, যা তুলনামূলকভাবে মাঝারি পতন হিসেবে ধরা যায়। ভিয়েতনামের মূল্য হ্রাস আরও কম, মাত্র ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা তাদের তুলনামূলকভাবে শক্ত মূল্য অবস্থান নির্দেশ করে। এর বিপরীতে চীনের সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে, যেখানে ইউনিট মূল্য ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমে গেছে, যা দেশটির বাজার হারানো ও তীব্র প্রতিযোগিতার চাপকে স্পষ্ট করে। অন্যদিকে, ভারতের ইউনিট মূল্য ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে। এছাড়া পাকিস্তানের ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও ইন্দোনেশিয়ায় ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কম্বোডিয়াতেও ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ মূল্যপতন দেখা গেছে—যা দেখায় যে প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও দেশটি মূল্যচাপ থেকে মুক্ত নয়। আরও পড়ুন বাংলাদেশকে টপকে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় ভিয়েতনাম সামগ্রিকভাবে তুলনা করলে দেখা যায়, ভিয়েতনাম সবচেয়ে কম মূল্যপতনের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে, যেখানে চীন সবচেয়ে বড় মূল্যপতনের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ মাঝামাঝি অবস্থানে থাকলেও এটি ইঙ্গিত দেয় যে, দেশটি এখনো মূল্য উন্নয়ন বা উচ্চমূল্যের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি, বরং বৈশ্বিক মূল্যচাপের মধ্যেই অবস্থান করছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি যদিও ঋণাত্মক, তবে বৈশ্বিক বাজার সংকোচনের প্রেক্ষাপটে এটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পারফরম্যান্স। বড় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বাজার হারানোর দৌড়ে পিছিয়ে নেই। আবার দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও তার অবস্থান এখনো শক্তিশালী সরবরাহকারী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—এমন মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা দ্রুত কারণ অনুসন্ধান করে পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, অন্যথায় বাংলাদেশ নেতিবাচক ধারা থেকে বের হতে পারবে না। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্য প্রতিযোগিতার তীব্রতা এবং বড় ক্রেতাদের অর্ডার ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশে স্থানান্তর হওয়াই এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয়ের চাপও বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।—মোহাম্মদ হাতেম বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাস পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তার মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্য প্রতিযোগিতার তীব্রতা এবং বড় ক্রেতাদের অর্ডার ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশে স্থানান্তর হওয়াই এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয়ের চাপও বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলছেন, বাংলাদেশের রপ্তানিতে শুধু পরিমাণ নয়, ইউনিট মূল্যের ওপরও চাপ বাড়ছে। ফলে লাভ কমে যাচ্ছে। অনেক কারখানা এখন কম দামে অর্ডার নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এ খাতের পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উচ্চমূল্য সংযোজন প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। এছাড়া নতুন বাজার অনুসন্ধান ও ইউরোপের বাইরে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে জানান। তার মতে, শুধু কম দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়, বরং মান ও ডিজাইনে উন্নয়নই ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি। আরও পড়ুন চীনকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকপণ্য রপ্তানিতে সাম্প্রতিক পতনের মূল কারণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি—এমনটিই মনে করছেন বিজিএমইএ -এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বলতা, তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এবং ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।—মহিউদ্দিন রুবেল ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের এই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, ইউনিট মূল্য হ্রাস এবং কম দামের অর্ডারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে বাংলাদেশ এখন একই ধরনের পণ্যের প্রতিযোগিতায় আটকে যাচ্ছে, যেখানে মূল্য ও অর্ডার দুই দিকেই চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি পণ্যের বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্য সংযোজন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং ডিজাইন ও প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। ‘কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া টেকসই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফেরা সম্ভব নয়’—এমনটিও মনে করেন মহিউদ্দিন রুবেল। আইএইচও/এমকেআর
Go to News Site