Somoy TV
দীর্ঘ ২৪ বছর কেটে গেছে। সাম্বার দেশে শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের ট্রফি এসেছিল সেই ২০০২ সালে। এতগুলো বছরের জমে থাকা পাহাড়সম প্রত্যাশার চাপ এখন সেলেসাওদের কাঁধে। এবার সেই চাপ নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপে পা রাখলো ব্রাজিল। তবে এবারের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। বাছাইপর্বের ম্যাচগুলো বর্তমান স্কোয়াডের ভেতরের নানামুখী দুর্বলতাগুলোকে একদম সামনে নিয়ে এসেছে।অনেকদিন ধরেই ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি ছিল ব্রাজিল। ডরিভাল জুনিয়রের অধ্যায় ব্যর্থতায় শেষ হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন। তারা বুঝতে পারে, খোলনলচে বদলে ফেলার সময় এসেছে। আর সেই বড় পরিবর্তনের খোঁজে তারা হাত বাড়ায় বাইরে। ১৯২৫ সালের পর প্রথম কোনো বিদেশি কোচকে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলে আসেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক বস কার্লো আনচেলত্তি। ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের চূড়া ছোঁয়া এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ডকে দলে আনার স্পষ্ট বার্তাটা এটাই যে— এবার আসলেই কিছু একটা বদলাতে হবে।বাছাইপর্বের শেষদিকের কঠিন সমীকরণগুলো অবশ্য ভালোভাবেই পার করেছে ব্রাজিল। প্লে-অফের গ্যাঁড়াকলে পড়তে হয়নি, সরাসরিই টিকিট মিলেছে এই গ্রীষ্মের মূল মঞ্চের। বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-তে পড়েছে তারা। নকআউট পর্বে যাওয়ার পথটা ব্রাজিলের জন্য বেশ সহজই বলা যায়। তবে এই গ্রুপে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হতে পারে আফ্রিকার পরাশক্তি মরক্কো। তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে ব্রাজিল এক কঠিন সমীকরণে পড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নকআউট পর্বের সহজ ছক থেকে তারা ছিটকে যাবে। আর তা সেমিফাইনালে ওঠার পথটিকেও কঠিন করে তুলতে পারে। ব্রাজিল দলে প্রতিভার কোনো কমতি নেই। তাই দেশের মাটিতে ভক্তদের প্রত্যাশার পারদ স্বভাবতই আকাশচুম্বী। কিন্তু এরপরেও বেশ কিছু প্রশ্নের সমাধান এখনো মেলেনি। ৩৪ বছর বয়সে নেইমারের দলে থাকাটা মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানোর কারণ হতে পারে। গ্রেড-টু ক্যাফ স্ট্রেইনের (পায়ের পেশির চোট) কারণে তিনি ব্রাজিলের প্রস্তুতি ম্যাচগুলো থেকে ছিটকে গেছেন। যদিও আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাকে পাবার আশা করছে ব্রাজিল। সেলেসাওদের ভবিষ্যৎ আশার আলো এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই দেখা হচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় তিনি ১৬টি গোল করেছেন। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ টিকিটও নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার এই দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সের সাথে ব্রাজিলের হলুদ জার্সির সাধারণ রেকর্ডের ব্যবধানটা এখনো চোখে পড়ার মতো। তারকাখচিত এই আক্রমণভাগকে এক সুতোয় গাঁথা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জনপ্রিয় কোচ আনচেলত্তির সামনে থাকা সমস্যাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তবে তার ওপর ফুটবল বোর্ডের পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি এরইমধ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিজের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন।২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গ্রুপ এবং ম্যাচের সময়সূচি ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-তে পড়েছে ব্রাজিল। এই গ্রুপে তাদের সঙ্গী মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই এখন সেলেসাওদের মূল লক্ষ্য। কারণ রানার্স-আপ হলে তাদের নকআউট পর্বের কঠিন ব্র্যাকেটে পড়তে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, সেটি হলে পরের রাউন্ডগুলোর পথ কঠিন হয়ে যাবে। অন্য দিকে, কোনোভাবে তৃতীয় হলে গ্রুপ পর্ব পার হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তখন সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলের একটি হয়ে নকআউটে যেতে হবে। এতে প্রথম পর্বেই অবিশ্বাস্যভাবে ছিটকে যাওয়ার একটা বড় ঝুঁকি থেকে যায়! আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'অ্যাটলাস লায়নস' খ্যাত মরক্কো সমীহ জাগানো শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তারা সবাইকে চমকে দেয়। স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছায়। যদিও শেষ পর্যন্ত ফাইনালিস্ট ফ্রান্সের কাছে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। আর এ বছর তারা মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুটও জিতেছে। মরক্কোর এই অভিজ্ঞ স্কোয়াডে আছেন আফকন তারকা ব্রাহিম দিয়াজ। তাদের সাথে আরও আছেন পিএসজির গতিময় ফুল-ব্যাক আশরাফ হাকিমি। আর গোলপোস্টের নিচে শক্তিশালী দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অভিজ্ঞ ইয়াসিন বুনু। গ্রুপের অন্য দল হাইতি ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরছে। এত শক্তিশালী একটি গ্রুপে তাদের বেশ কঠিন লড়াই করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর বড় সমর্থন পাশে পাবে তারা। একেবারে শেষ ম্যাচে মায়ামিতে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে স্কটল্যান্ড। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে এই স্কটিশদের হারিয়েছিল সেলেসাওরা। তবে এবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই যদি শেষ ম্যাচ পর্যন্ত গড়ায়, তবে স্কটল্যান্ড ব্রাজিলের জন্য একটি বড় পরীক্ষা বা অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ম্যাচের সময়সূচিতারিখপ্রতিপক্ষসময়ভেন্যু১৪ জুন (রোববার)মরক্কোভোর ৪:০০টামেটলাইফ স্টেডিয়াম, ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি২০ জুন (শনিবার) হাইতিসকাল ৭:০০টালিংকন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ড, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া২৫ জুন (বৃহস্পতিবার)স্কটল্যান্ডভোর ৪:০০টাহার্ড রক স্টেডিয়াম, মিয়ামি গার্ডেনস, ফ্লোরিডা ব্রাজিলের সম্ভাব্য ফাইনাল যাত্রাপথ গ্রুপ ‘সি’ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনায় এগিয়ে আছে ব্রাজিল। সেটি হলে তারা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সহজ ছকটিতে পা রাখবে। কারণ এই ছকে আর্জেন্টিনা নেই। এমনকি ফ্রান্স ও স্পেনও রয়েছে ব্র্যাকেটের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অংশে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে শেষ-৩২ দলের লড়াইয়ে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হতে পারে জাপান, তিউনিসিয়া, নেদারল্যান্ডস অথবা সুইডেন। সেই বাধা পার হতে পারলে শেষ-১৬-এর ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে পাশের অন্য একটি গ্রুপের রানার্স-আপ দলের। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চ সাজানো হবে মিয়ামিতে। সেখানে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ডের থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেই ম্যাচ জিতলে আগামী ১৪ জুলাই ডালাসের সেমিফাইনালে দেখা মিলতে পারে আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল অথবা কলম্বিয়ার।কিন্তু কোনো কারণে ব্রাজিল যদি গ্রুপ ‘সি'’-তে রানার্স-আপ হয়, তবে পুরো দৃশ্যপট বদলে যাবে। তারা চলে যাবে ড্র-এর উপরের কঠিন অংশে। সেখানে প্রথম নকআউট ম্যাচেই তাদের খেলতে হবে গ্রুপ ‘এফ’-এর চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে।এর ফলে খুব দ্রুতই ফ্রান্স বা স্পেনের মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপে প্রতিবারই ইউরোপের দলগুলোর কাছে হেরেই নকআউট পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল সেলেসাওদের। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্কোয়াড গত ১৮ মে রিও ডি জেনিরোতে বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেন আনচেলত্তি। আর সেদিন পুরো দল ঘোষণার আলো কেড়ে নেয় একটি বিশেষ নাম। প্রায় তিন বছর আগে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল ইনজুরিতে পড়েছিলেন নেইমার। এরপর থেকে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাইরে। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সে এসেও নেইমার দলে ডাক পেয়েছেন। সান্তোসে ফেরার পর নেইমারের পারফর্ম্যান্স অবশ্য খুব একটা আহামরি ছিল না। ফিটনেস সমস্যার কারণে দুটি প্রীতি ম্যাচেও তাকে বাইরে রেখেছিলেন আনচেলত্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মহাতারকাকে দলে নেওয়ার বড় ঝুঁকিটি তিনি নিয়েই নিলেন। ব্রাজিল দলে প্রতিভার ছড়াছড়ি। তাই অনেক চেনা মুখকে বাদও পড়তে হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ৮টি আন্তর্জাতিক গোল নিয়ে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ স্কোরার রদ্রিগো ইনজুরির কারণে দলে নেই। বাদ পড়েছেন ৪১ বছর বয়সী থিয়াগো সিলভাও, যার ঝুলিতে আছে ১১৩টি ম্যাচ ও ৪টি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা। চেলসি ত্রয়ী হোয়াও পেদ্রো, আন্দ্রে সান্তোস ও এস্তেভাও চূড়ান্ত দলে জায়গা পাননি, যার মধ্যে এস্তেভাও ছিটকে গেছেন ইনজুরির কারণে। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে প্রস্তুতি ম্যাচ চলাকালীন আরেকটি ধাক্কা খায় দল। চোটের কারণে স্কোয়াড থেকে ছিটকে যান রোমার ফুল-ব্যাক ওয়েসলি। তার জায়গায় দলে এসেছেন আতালান্তার মিডফিল্ডার এডারসন, যিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাচ্ছেন। দল ঘোষণায় বেশ কিছু চমকও ছিল। গত মার্চে প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পাওয়া বোর্নমাউথের ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার রায়ান জায়গা করে নিয়েছেন মূল স্কোয়াডে। তার সাথে দলে আছেন ব্রেন্টফোর্ডের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো এবং আল-ইতিহাদের অভিজ্ঞ ফ্যাবিনিও। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ৯ সদস্যের এই আক্রমণভাগটি যেকোনো দেশের চেয়ে সবচেয়ে দামি। দলে জায়গা পাওয়ার জন্য ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, নেইমার, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, মাথেউস কুনিয়া, এনড্রিক, ইগর থিয়াগো, লুইজ হেনরিকে এবং রায়ানদের মধ্যে চলবে তীব্র লড়াই। কোচ আনচেলত্তির প্রিয় ফর্মেশন ৪-২-৪। এই ছকে শুরুর একাদশে চারজন ফরোয়ার্ড একসাথে খেলার সুযোগ পাবেন। বাকিদের অপেক্ষা করতে হবে সাইড বেঞ্চে, ম্যাচে ইমপ্যাক্ট খেলোয়াড় হিসেবে নামার জন্য। ব্রাজিলের স্কোয়াড গোলরক্ষক: আলিসন, এদেরসন, ওয়েভারতন। ডিফেন্ডার: আলেক্স সান্দ্রো, ব্রেমার, দানিলো, ডগলাস সান্তোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, ইবানিয়েজ, লেও পেরেইরা, মার্কিনিয়োস, ওয়েসলি।মিডফিল্ডার: ব্রুনো গিমারায়েস, কাসেমিরো, দানিলো সান্তোস, ফাবিনিও, লুকাস পাকেতা।ফরোয়ার্ড: এন্দ্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, ইগর থিয়াগো, লুইজ হেনরিকে, মাতেউস কুনিয়া, নেইমার জুনিয়র, রাফিনিয়া, রায়ান, ভিনিসিউস জুনিয়র।২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ বাস্তববাদী কোচ আনচেলত্তি ব্রাজিলের দায়িত্বে আসার পর থেকেই ৪-২-৪ এবং ৪-৩-৩ এই দুই ফর্মেশনের মধ্যে অদলবদল করে দল খেলাচ্ছেন। তবে মিশরের বিপক্ষে ব্রাজিলের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপে ৪-৩-৩ ফর্মেশনটিই বেশি দেখা যেতে পারে।এই ছকে মাঝমাঠের মূল কাণ্ডারি হিসেবে একক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশনে খেলবেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ক্যাসেমিরো। আর তার একটু সামনে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা যাবে ব্রুনো গিমারায়েস ও লুকাস পাকেতাকে।আক্রমণভাগের বাঁ-প্রান্তে থাকবেন গতিময় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকবেন ইগর থিয়াগো। আর ডান-প্রান্তে রাফিনিয়ার জায়গা পাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত, সেখানে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কেউ নেই।তবে নেইমার যদি পুরোপুরি ফিট হয়ে ওঠেন, কিংবা মাথেউস কুনিয়াকে খেলানো হয়, তবে দল ৪-২-৪ ফর্মেশনেও চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রক্ষণভাগের মূল ভরসা হবেন দুই অভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাক গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনহোস। আর গোলপোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে তো আছেনই দুর্দান্ত অ্যালিসন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল স্কোয়াডের শক্তি ও বেঞ্চের গভীরতা ব্রাজিল দলের মাঝমাঠে ফুটবলারের সংখ্যা কিছুটা কম মনে হচ্ছে। মাঝমাঠের দুই বা তিনটি পজিশনের জন্য স্কোয়াডে আছেন মাত্র পাঁচজন খেলোয়াড়। এর অর্থ হলো, পাকেতা, ক্যাসেমিরো কিংবা ব্রুনো গিমারায়েসের কেউ যদি শুরুতেই চোট পান, তবে বিকল্প নিয়ে বড় বিপদে পড়তে হবে। ফ্যাবিনিও গত তিন মৌসুম ধরে শীর্ষ স্তরের ফুটবলে খেলছেন না। অন্যদিকে, নটিংহাম ফরেস্ট থেকে বোটাফোগোতে গিয়ে নজরকাড়া দানিলো সান্তোসের আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে কম।অবশ্য রক্ষণভাগের ব্যাকআপ বা বিকল্প খেলোয়াড়দের তালিকা বেশ শক্তিশালী। ব্রেমার, রজার ইবানেজ এবং লিও পেরেইরার মতো অত্যন্ত দক্ষ সেন্টার-ব্যাকরা যেকোনো মুহূর্তে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত আছেন।ফুল-ব্যাক পজিশনে ওয়েসলির ছিটকে যাওয়ার পর অভিজ্ঞ দানিলোর শুরুর একাদশে থাকা প্রায় নিশ্চিত। আর বাঁ-প্রান্তে আরেক অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার অ্যালেক্স সান্দ্রোর বিকল্প হিসেবে তৈরি আছেন ডগলাস সান্তোস।গোলপোস্টের নিচে অ্যালিসনই যে প্রথম পছন্দ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তার ব্যাকআপ হিসেবে আছেন এদেরসনের মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষক। আর ৩৮ বছর বয়সী ওয়েভারটন সম্ভবত পুরো টুর্নামেন্টেই বেঞ্চে বসে থাকবেন, একটি মিনিটও মাঠে নামার সুযোগ হয়তো তিনি পাবেন না। কার্লো আনচেলত্তি: কোচিং প্রোফাইল কার্লো আনচেলত্তির ওপর পূর্ণ আস্থা ব্রাজিল ফুটবল ফেরারেশনের। ছবি: সংগৃহীত ২০২৫ সালের ১২ মে কার্লো আনচেলত্তিকে ব্রাজিলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে সেলেসাওদের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় বিদেশি কোচ হিসেবে নাম লেখান তিনি। রিয়াল মাদ্রিদে নিজের সফল দ্বিতীয় অধ্যায় শেষ করে ব্রাজিলে আসেন ৬৬ বছর বয়সী এই মাস্টারমাইন্ড। আধুনিক ক্লাব ফুটবলে তার অর্জনের কোনো সমকক্ষ নেই। এসি মিলান ও রিয়ালের হয়ে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পাশাপাশি ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগেই শিরোপা জেতার অনন্য কীর্তি রয়েছে তার। কোনো রকম সংঘাত বা অতিরিক্ত ট্যাকটিক্যাল জটিলতা ছাড়াই বিশ্বমানের তারকাদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার ক্ষেত্রে তার সুনাম আছে। দীর্ঘদিনের এই সুনামের কারণেই তাকে দলে ভেড়ায় ব্রাজিল। বুয়েনস আইরেসে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ৪-১ গোলের বেদনাদায়ক হারের পর ডরিভাল জুনিয়রকে বরখাস্ত করা হয়। সেই ঘটনা আনচেলত্তির বহুল প্রতীক্ষিত নিয়োগের পথ তৈরি করে।এই হারের পর সিবিএফ (ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন) আনচেলত্তিকে আনার প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করতে বাধ্য হয়। যদিও ২০২৩ সাল থেকেই তার নাম নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা চলছিল।রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এই ইতালিয়ান কোচের অধীনে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাদের এই চেনা সম্পর্ক ব্রাজিলের জন্য বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাঝমাঠের ক্যাসেমিরোও যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন।অবশ্য ব্রাজিলের এই যাত্রাটা যে পুরোপুরি মসৃণ ছিল, তা কিন্তু নয়। বাছাইপর্বের নিয়মরক্ষার ম্যাচে বলিভিয়ার কাছে হার, টোকিওতে জাপানের কাছে এবং বোস্টনে ফ্রান্সের কাছে পরাজয় দলের ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে বারবার সামনে এনেছে।সব মিলিয়ে, এই বিশ্বকাপে মাঠে নামার আগে সেলেসাওদের ঘিরে শতভাগ নিশ্চয়তার চেয়ে আশাবাদই বেশি কাজ করছে। তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আনচেলত্তির বিদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, গত মাসেই তিনি আনন্দের সাথে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত নিজের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন।ভিনিসিয়ুস জুনিয়র: ব্রাজিলের তারকা খেলোয়াড় ক্লাবে দারুণ ফরমে থাকলে জাতীয় দলে এখনো সেই ঝলক পুরোপুরি দেখা যায়নি। ছবি: সংগৃহীত গেল মৌসুমে নিজের চেনা ছন্দের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন ভিনিসিয়ুস। তবুও ২০২৫-২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৩৬টি লিগ ম্যাচে ২১টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ঙ্কর উইঙ্গার হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২৪ সালের ফিফা বর্ষসেরা পুরুষ খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন তিনি। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে আনচেলত্তির দ্বিতীয় মেয়াদে জিতেছেন দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি। আর প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ টিকিট নিশ্চিত করেছিলেন এই তারকাই। তবে ক্লাবের সেই চেনা রূপ জাতীয় দলে এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি। ব্রাজিলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা মাত্র ৯টি, যা ক্লাবের রেকর্ডের তুলনায় বেশ মলিন। সেলেসাওদের হয়ে মাঝেমধ্যে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড বা মাঝের পজিশনে খেলতে গিয়ে বেশ ভুগেছেন তিনি।অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে তাকে আবার তার প্রিয় বাঁ-প্রান্তের উইঙ্গেই ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পজিশনটি তার দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ের ক্ষমতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে সাহায্য করে, যেখান থেকে তিনি বাইলাইন দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের রক্ষণ কাঁপিয়ে দিতে পারেন।বড় ম্যাচের খেলোয়াড় হিসেবে ভিনিসিয়ুসের আলাদা খ্যাতি আছে। সাবেক ফ্ল্যামেঙ্গোর এই তারকা ২০২২ এবং ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের দুটিতেই গোল করেছিলেন। তাই ব্রাজিল যদি এই বিশ্বকাপের শেষদিকের লড়াইয়ে পৌঁছাতে পারে, তবে সেখানে ভিনিসিয়ুস যে নিজের সেরাটা ঢেলে দেবেন, তা বলাই বাহুল্য। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের যেসব তারকার ওপর নজর থাকবে রাফিনিয়া: ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে আটকে যান, তখন ব্রাজিলের আক্রমণভাগ সচল রাখার মূল দায়িত্ব পড়ে রাফিনিয়ার কাঁধে। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার কনমেবল বাছাইপর্বে ৫টি গোল করে সেলেসাওদের সর্বোচ্চ স্কোরার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।বার্সেলোনার হয়ে ২০২৪-২৫ মৌসুমটি তার দুর্দান্ত কেটেছিল। সেবার সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ৩৮টি গোল এবং ২৩টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। তবে স্বাভাবিকভাবেই সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে সেই সংখ্যা কিছুটা কমেছে।আনচেলত্তির প্রিয় ফর্মেশনে তিনি মূলত ডান-প্রান্তের উইঙ্গার হিসেবে খেলেন। তবে বর্তমান কোচের অধীনে প্রায় অর্ধেক সময় তাকে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও মাঠে দেখা গেছে। এই বহুমুখী ক্ষমতার কারণে তিনি মাঠের যেকোনো পজিশন থেকেই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন। ব্রুনো গিমারায়েস: ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ব্রাজিলের সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফর্মার ব্রুনো। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মাঝমাঠের অপরিহার্য কাণ্ডারি হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২৬ সদস্যের এই স্কোয়াডে তাকেই সবচেয়ে পরিপূর্ণ মিডফিল্ডার বলা যায়। ক্যাসেমিরোর সাথে জুটি বাঁধার পর থেকে ব্রাজিলের জার্সিতে তার পারফর্ম্যান্স আরও উন্নত হয়েছে। এই দুই মিডফিল্ডার মিলে মাঝমাঠে এমন এক অক্ষ তৈরি করেন, যা ম্যাচের আক্রমণ ও রক্ষণ দুই ভাগই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে বিশ্বকাপের মতো ঠাসা সূচিতে ৩৭ দিনে সম্ভাব্য ৭টি ম্যাচ খেলার মতো শারীরিক সক্ষমতা এই জুটির আছে কি না—সেটিই এখন বড় চিন্তার বিষয়। মার্কিনহোস: টানা চারটি বিশ্বকাপ সাইকেলে মার্কিনহোস ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার। পিএসজির হয়ে আরেকটি দারুণ মৌসুম শেষ করে তিনি এবার দলে এসেছেন। ফরাসি লিগ ওয়ানে চোট আর বিশ্রামের কারণে নিয়মিত খেলতে না পারলেও, চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়ে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। তাছাড়া দলের অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্ব মাঠের ভেতর সবাইকে শান্ত ও উজ্জীবিত রাখতে বড় সাহায্য করে। নেইমার: এখনো এক রহস্যের নাম নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের হয়ে ৭৯টি গোল করে তিনি দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সেট-পিস বা ফ্রি-কিক-কর্নার নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা। তবে এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তাকে আদৌ দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে বড় সংশয় আছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে তিনি ব্রাজিলের জার্সি গায়ে জড়াননি। তার ওপর গত মে মাসে পাওয়া গ্রেড-টু ক্যাফ স্ট্রেইন (পায়ের পেশির চোট) তাকে বিশ্বকাপের দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ থেকেই ছিটকে দিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে তিনি ব্রাজিলের জার্সি গায়ে জড়াননি নেইমার। ছবি: সংগৃহীতমরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তিনি যদি ফিট হতে না পারেন, তবে মেডিকেল টিম আগামী ২০ জুন হাইতির বিপক্ষে ম্যাচের জন্য তাকে প্রস্তুত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে ম্যাচগুলোতে তিনি শুরুর একাদশে থাকবেন, নাকি কেবল শেষ মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামবেন— তা এখনো দেখার বিষয়।ক্যাসেমিরো: মাইকেল ক্যারিকের অধীনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিজের ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন ক্যাসেমিরো। রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর ক্লাব ফুটবলে এত চেনা ছন্দে তাকে আর দেখা যায়নি। বিশ্বকাপের মতো একটি কঠিন ও ব্যস্ত সূচিতে মাঠ জুড়ে দৌড়ে খেলার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার আছে কি না— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে মাঠে তার ফুটবল বুদ্ধি ও চতুরতা যে একটুও কমেনি, তা বলাই বাহুল্য। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তিনজন ভিন্ন ভিন্ন কোচের অধীনে কনমেবল অঞ্চলের ১৮টি বাছাইপর্বের ম্যাচের মধ্যে ৫টি জয়, ২টি ড্র এবং ৬টি হার— এটি ছিল এই শতাব্দীতে ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে পারফর্ম্যান্স। তবে এই ১৮ ম্যাচের মধ্যে কার্লো আনচেলত্তি ডাগআউটে ছিলেন মাত্র ৪টি ম্যাচে।তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্রাজিলের শুরুটা হয়েছিল ইকুয়েডরের সাথে ০-০ গোলের ড্র দিয়ে। এরপর ঘরের মাঠে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে এবং মারাকানা স্টেডিয়ামে চিলেকে ৩-০ গোলে হারায় সেলেসাওরা। তবে বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচটি কেবলই নিয়ম রক্ষার হওয়ায় বলিভিয়ার কাছে ১-0 গোলে হেরে যায় তারা।বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হওয়ার পর প্রীতি ম্যাচগুলোর ফলাফল অবশ্য মিশ্র ছিল। একদিকে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-০ গোলে এবং ক্রোয়েশিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে ব্রাজিল, অন্যদিকে জাপান ও ফ্রান্সের কাছে হারের স্বাদও পেতে হয়েছে তাদের।তবে বিশ্বকাপ মিশন শুরুর ঠিক আগে, গত ৩১ মে পানামার বিপক্ষে ৬-২ গোলের বিশাল জয় দলটির আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এরপর ক্লিভল্যান্ডে মিশরের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়টি আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের রেকর্ডকে ১২ ম্যাচে ৭টি জয়ে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। কার্লো আনচেলত্তি: ব্রাজিলের রেকর্ড, মে ২০২৫ থেকে বর্তমানম্যাচজয়ড্রহার১২৭২৩গোল করেছেগোল হজম করেছেক্লিন শিটজয়ের হার২৬১১৪৫৮% ব্রাজিলের বিশ্বকাপ রেকর্ড ১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে ব্রাজিল। একমাত্র দেশ হিসেবে তাদের এই অনন্য রেকর্ড রয়েছে। এখন পর্যন্ত ২২ বার অংশ নিয়ে তারা জিতেছে পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি— যা এই প্রতিযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাসে যেকোনো দেশের চেয়ে সর্বোচ্চ।তাদের এই বিশ্বজয়গুলো এসেছিল ১৯৫৮, ১৯৬, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে। এর মধ্যে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পেলে, জাইরজিনহো এবং রিভেলিনোদের সেই দলটিকে এখনো সর্বকালের সেরা জাতীয় দল হিসেবে গণ্য করা হয়।তবে শেষবার ২০০২ সালে শিরোপা জেতার পর থেকে গত ২৪ বছরের ইতিহাস কেবলই যন্ত্রণাদায়ক বিদায়ের গল্প। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে চতুর্থ হওয়া। সেবার বেলো হরিজন্তের এস্তাদিও মিনেইরোতে সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের সেই হার সম্ভবত বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল।এ ছাড়া ২০০৬ সালে ফ্রান্স এবং ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের হারগুলোও ছিল বেশ পীড়াদায়ক। আর সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে মার্কিনহোসের নেওয়া শেষ শটটি পোস্টে লাগলে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল সেলেসাওদের।বিশ্বকাপের মঞ্চে ১১৪টি ম্যাচ খেলে ব্রাজিলের সর্বমোট রেকর্ড হলো ৭৬টি জয়, ১৯টি ড্র এবং ১৯টি হার। এই ম্যাচগুলোতে তারা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে ২৩৭ বার, আর গোল হজম করেছে ১০৮টি। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ রেকর্ডবছরআয়োজক দেশফলাফলম্যাচগোল (করা)গোল (খাওয়)উল্লেখযোগ্য১৯৩০উরুগুয়েগ্রুপ পর্ব২৫২ ১৯৩৪ইতালিপ্রথম রাউন্ড১১৩ ১৯৩৮ফ্রান্সতৃতীয় স্থান৫১৪১১ ১৯৫০ব্রাজিলরানার্স-আপ৬২২৬ ১৯৫৪সুইজারল্যান্ডকোয়ার্টার ফাইনাল৩৮৫ ১৯৫৮সুইডেনচ্যাম্পিয়ন৬১৬৪ ১৯৬২চিলিচ্যাম্পিয়ন৬১৪৫ ১৯৬৬ইংল্যান্ডগ্রুপ পর্ব৩৪৬ ১৯৭০মেক্সিকোচ্যাম্পিয়ন৬১৯৭ ১৯৭৪পশ্চিম জার্মানিচতুর্থ স্থান৭৬৪ ১৯৭৮আর্জেন্টিনাতৃতীয় স্থান৭১৭৫ ১৯৮২স্পেনদ্বিতীয় রাউন্ড৫১৫৬ ১৯৮৬মেক্সিকোকোয়ার্টার ফাইনাল৫১০৫ ১৯৯০ইতালিশেষ ১৬৪৪২ ১৯৯৪যুক্তরাষ্ট্রচ্যাম্পিয়ন৭১১৩ ১৯৯৮ফ্রান্সরানার্স-আপ৭১৪১০ ২০০২দ. কোরিয়া/জাাপানচ্যাম্পিয়ন৭১৮৪ ২০০৬জার্মানিকোয়ার্টার ফাইনাল৫১০২ ২০১০দ. আফ্রিকাকোয়ার্টার ফাইনাল৫৯৪ ২০১৪ব্রাজিলচতুর্থ স্থান৭১১১৪ ২০১৮রাশিয়াকোয়ার্টার ফাইনাল৫৮৪ ২০২২কাতারকোয়ার্টার ফাইনাল৫৮৩ ২০২৬যুক্তরাষ্ট্র/কানাডা/মেক্সিকো----------২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সম্ভাব্য পারফরম্যান্স পূর্বাভাস ব্রাজিল যে গ্রুপ ‘সি’র চ্যাম্পিয়ন হবে, তা কিছুটা নিশ্চিত বলেই মনে করছেন অনেক সমর্থক। গ্রুপে তাদের প্রধান বাধা কেবল মরক্কো। তবে মরক্কোর বর্তমান দলটিতে ২০২২ সালের সেই কাতার বিশ্বকাপের মতো অতটা ভয়ংকর রূপ আর নেই, যে দল সেবার সেমিফাইনালে খেলেছিল।আসল জটিলতা তৈরি হবে নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার পর। কারণ শেষবার বিশ্বজয়ের পর টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল বা তার আগেই বিদায় নিয়েছে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, মাঠের খেলায় এক ধরনের মানসিক চাপ বা ভয় এখনো দলটিকে তাড়া করে ফিরতে পারে।তবে কোচ আনচেলত্তির আসল দক্ষতাই হলো ব্রাজিলের এই বর্তমান সংকট কাটিয়ে তোলা। টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে তার চেয়ে পারদর্শী ফুটবল বিশ্বে খুব কমই আছেন। নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট ম্যাচ জিতে তিনি এর প্রমাণ দিয়েছেন।বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপের মধ্যে চারবারই ব্রাজিলকে বিদায় নিতে হয়েছে ঠিক কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। তাই এবার সেমিফাইনালে ওঠাই হবে সেলেসাওদের আসল লক্ষ্য, যা প্রমাণ করবে দলটি সত্যি সত্যি আগের চেয়ে এগিয়েছে।দলে প্রতিভার দারুণ ঝলক আর ডাগআউটে অভিজ্ঞ কোচের হাত ধরে ২০০২ সালের পর এবারই প্রথম সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারে ব্রাজিল। আর এই যাত্রায় মূল চালিকাশক্তি হতে পারেন ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়া, যদি তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে পারেন। এই জায়গায় আনচেলত্তির বিশাল অভিজ্ঞতাই এবার বড় ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।ভাগ্যের ছক আর দলের ছন্দ যদি একসাথে মিলে যায়, তবে যেকোনো কিছুই ঘটা সম্ভব। তাই এবার ব্রাজিলের জন্য বিশ্বকাপের পোডিয়ামে (সেরা তিনে) জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্রাজিলের শক্তিব্রাজিলের দুর্বলতাআক্রমণভাগের গভীরতা: বিভিন্ন পজিশনে খেলার মতো ৯ জন ফরোয়ার্ড আছেন এই দলে। এদের মধ্যে তিনজন খেলেন বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদে। আক্রমণভাগের এই অবিশ্বাস্য মান গ্রুপ পর্বের অন্য যেকোনো প্রতিপক্ষের চেয়ে ব্রাজিলকে অনেক এগিয়ে রাখছে। আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা: পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা একজন কোচ খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে লিড ধরে রাখতে হয় আর নকআউট পর্বের ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ২০০২ সালের পর থেকে ব্রাজিল এই কাজটিতেই বারবার ব্যর্থ হয়েছে। গোলপোস্টে অ্যালিসন: তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা শট-স্টপার। টাইব্রেকারে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রেকর্ড বিবেচনায় নিলে, পেনাল্টি শুটআউটে তিনিই হতে পারেন দলের ভাগ্যবিধাতা। ছন্দে থাকা ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়া: দুই উইংয়ে তাদের গতি, আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং টেকনিক্যাল দক্ষতার মেলবন্ধন দুর্দান্ত। গ্রুপ 'সি'-র মধ্যে এটিই নির্দ্বিধায় সবচেয়ে বিপজ্জনক আক্রমণভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের চেনা পরিবেশ: ১৯৯৪ সালে পাসাডেনায় অবিস্মরণীয়ভাবে বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। এবারও গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই তারা খেলবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, যা তাদের চেনা পরিবেশের বাড়তি সুবিধা দেবে।মাঝমাঠের ব্যাকআপ সংকট: তিনটি পজিশনের জন্য স্কোয়াডে আছেন মাত্র পাঁচজন খেলোয়াড়। এর মধ্যে ক্যাসেমিরোর বয়স ৩৪ এবং ফ্যাবিনিও খেলছেন সৌদি আরবে। ফলে ব্রুনো গিমারায়েসের একটিমাত্র চোট পুরো দলের ছক ও ভারসাম্য ওলটপালট করে দিতে পারে। নেইমারের ফিটনেস: গ্রেড-টু ক্যাফ স্ট্রেইনের কারণে তিনি বিশ্বকাপের দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ থেকেই ছিটকে গেছেন। ফলে প্রথম ম্যাচে তাকে পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। মেডিকেল টিম তার ফেরার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করতে চাচ্ছে না। এর অর্থ হলো, হাইতি ম্যাচ বা তার পরেও তার খেলার সুযোগ সীমিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভিনিসিয়ুসের রেকর্ড: দেশের হয়ে ৪৯ ম্যাচে মাত্র ৯ গোল— এই পরিসংখ্যান কোনোভাবেই তার ক্লাবের চেনা ফর্মের সাথে মেলে না। বিশ্বকাপে তিনি সত্যিই নিজের নামের বিচার করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। বাছাইপর্বের ভঙ্গুরতা: কনমেবল অঞ্চলে ৬টি হার এবং '৭+' গোল ব্যবধান নিয়ে ব্রাজিল পঞ্চম স্থানে থেকে শেষ করেছে। ১৯৯৬ সালে বাছাইপর্বের বর্তমান ফরম্যাট চালু হওয়ার পর এটিই ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে রেকর্ড। পেনাল্টির অতীত ইতিহাস: ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। সেবার পেনাল্টি মিস করা অধিনায়ক মার্কিনহোসই এবারও দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা দলে এক ধরনের মানসিক চাপ বা ভয় তৈরি করে রাখতে পারে।
Go to News Site