Jagonews24
দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এটি হতে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় বাজেট। বড় বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যেও এযাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেটের ঘাটতিও দাঁড়াচ্ছে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তব্যে ঘোষণা দিতে পারেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনগণের আর্থিক পুনরুদ্ধার ও কল্যাণ নিশ্চিত করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই এই বাজেটের মূল দর্শন। মধ্যমেয়াদে রাজস্ব আদায়ে গতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে মাঝারি ঝুঁকি থেকে নিম্ন ঝুঁকির ক্রেডিট রেটিং-এ ফিরিয়ে আনার কথাও বলতে পারেন অর্থমন্ত্রী। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব ও বৈদেশিক অনুদান থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। আরও পড়ুন বাংলাদেশের জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো মোট রাজস্বের মধ্যে করদাতা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরকে এর আগে কখনো এতো বড় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়নি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর রাজস্ব থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা। পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এবং এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরকে এর আগে কখনো এতো বড় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়নি। আরও পড়ুন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে কী দাওয়াই নিয়ে আসছেন অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পুনরাবৃত্ত ব্যয় ৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য মোট ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ ৩ লাখ কোটি টাকা। এছাড়া বিভিন্ন স্কিম, বিশেষ প্রকল্প এবং খাদ্যের বিনিময়ে কর্মসূচির জন্যও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে বাজেটে অনুদান বাদ দিলে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এতো বড় বাজেট ঘাটতি এর আগে কখনো ধরা হয়নি। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে অনুদান বাদে ঘাটতি ধরা হয় ২ লাখ কোটি টাকা। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে অনুদান বাদে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেবে। বৈদেশিক ঋণ থেকে নিট অর্থায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এজন্য নতুন করে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে, বিপরীতে পরিশোধ করা হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। আরও পড়ুন বিদেশি বিনিয়োগ আনলে দেড় শতাংশ কমিশন দেওয়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে নিট ঋণ নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, উন্নয়ন ব্যয়ের গতি বাড়ানো এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকেন্দ্রিক একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী এবার বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ঘোষণা দিতে পারেন। যা ঋণ ঝুঁকি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সহায়ক হবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ পর্যায়ক্রমে হ্রাস করার কথাও জানাবেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে করপোরেট বন্ড, মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইত্যাদির প্রবর্তনের মাধ্যমে বন্ড বাজারকে অধিকতর বৈচিত্র্যময় ও সক্রিয় করা হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দ দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই দুটি খাতে যথাক্রমে জিডিপির ২ শতাংশ এবং ১ দশমিক ০১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের পরিমাণ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা দাঁড়াতে পারে, যা চলতি বছরের বরাদ্দ ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা (জিডিপর ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ) থেকে অনেক বেশি। সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতি যেগুলো মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন, সেগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার ঘোষণা আসতে পারে নতুন বাজেটে শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়াও বস্ত্র, রেল, প্রতিরক্ষা, কৃষি, মৎস্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এসব মন্ত্রণালয় পরিচালিত শিক্ষা/কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দ সমন্বয়ে হিসাব করা হয়েছে। আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দ্বিমুখী চাপে বরাদ্দ বাড়ছে স্বাস্থ্য খাতে একইভাবে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশের বাজেট বরাদ্দে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অন্যান্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত স্বাস্থ্য উদ্যোগ, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং হাসপাতালগুলোতে বরাদ্দ বিবেচনা করা হয়েছে। যেমন- সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পুলিশ অধিদপ্তর পরিচালিত হাসপাতাল এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত স্বাস্থ্যসেবা। এই বরাদ্দ উল্লেখ্যযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হতে পারে, যার ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় চলতি বছরের জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ০১ শতাংশ হবে। আগামীতে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ মানুষের জীবনমান সুরক্ষায় ও সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সেবা প্রদানকারীদের জন্য সম্মানী চালু করেছে। মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক অবস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচিগুলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অন্যান্য বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি সম্প্রসারিত করার কথা বলতে পারেন অর্থমন্ত্রী। কৃষি, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব আগামী অর্থবছরে কৃষি উৎপাদনশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন মূল বিনিয়োগ খাত হিসেবে থাকবে। এছাড়াও এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতি যেগুলো মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন, সেগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার ঘোষণা আসতে পারে নতুন বাজেটে। এমএএস/এমকেআর
Go to News Site