Jagonews24
দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে এবং দেশীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্পকে শক্তিশালী করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বড় ধরনের শুল্ক ও কর ছাড়ের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো, ক্যানসারের আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ দেশে তৈরি এবং চিকিৎসা যন্ত্রাংশের কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতেই এই শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আরও পড়ুন স্বাস্থ্য-পুষ্টি-জনসংখ্যা খাতে ৪০৪ মিলিয়ন ডলার দেবে বিশ্বব্যাংক সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকার কী করছে— এটি এখন দেখার বিষয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ হয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসায় নানান উদ্যোগ তো নিতেই হবে। তবে রোগ যেন না হয়, সেজন্যও কার্যকর উদ্যোগ থাকা দরকার। ডায়ালাইসিসের খরচ কমবে ৮০০ টাকা বাজেটের সবচেয়ে বড় ও মানবিক সিদ্ধান্ত এসেছে কিডনি রোগীদের জন্য। ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ার অপরিহার্য সামগ্রী ‘ডায়ালাইসিস ফিল্টার’ আমদানিতে এতদিন উচ্চ করভার ছিল। নতুন বাজেটে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর আরোপিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের এই কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ফলে কিডনি রোগীদের প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমবে, যা দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসাধীন পরিবারগুলোর জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন করে আরও ৯টি কাঁচামাল যুক্ত করা হয়েছে। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দেশে তৈরি ক্যানসারের ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ক্যানসারের ওষুধের জন্য যুক্ত হচ্ছে ৯ কাঁচামাল ক্যানসারের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরও পড়ুন ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমলো হার্টের রিংয়ের দাম ক্যানসারের ওষুধ তৈরির বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন করে আরও ৯টি কাঁচামাল যুক্ত করা হয়েছে। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দেশে তৈরি ক্যানসারের ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওষুধ শিল্পে এপিআই ও মৌলিক কাঁচামালে শুল্ক মুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং স্থানীয়ভাবে ওষুধের কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদনে বড় প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ওষুধ তৈরির মূল উপাদান বা এপিআই উৎপাদনে গতি আনতে নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ওষুধের আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে রেয়াতি সুবিধার আওতায় এনে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ পর্যন্ত মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদনকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা দিচ্ছে সরকার। দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত করতে এই প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আরও পড়ুন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে কী দাওয়াই নিয়ে আসছেন অর্থমন্ত্রী এছাড়াও, মানবিক বিবেচনায় মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত মর্চুয়ারি আমদানিতে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র এক শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড়ের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, সামগ্রিক স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে একে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুস্তাক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সরকার বাজেটে যেসব ছাড় দিয়েছে, সেগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। এর ফলে রোগীরা কিছু সুবিধা পাবেন। কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ করা, শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়। দেশে যেভাবে ক্যানসার ও কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তা কেবল হাসপাতাল বা ডায়ালাইসিস সেন্টার বাড়িয়ে সামাল দেওয়া যাবে না। মানুষ যাতে অসুস্থ কম হয়, সেই জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সচেতনতায় বাজেটে কতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হলো— সেটাই বড় প্রশ্ন। একটি ডায়ালাইসিস ফিল্টারে হয়তো ৮০০ টাকা কমবে, কিন্তু রোগীকে যদি সেই ডায়ালাইসিস করতে গ্রাম থেকে দূর-দূরান্তের শহরে আসতে হয়, তবে তার যাতায়াত ভাড়ায় চলে যাবে কয়েক হাজার টাকা। এর ওপর রয়েছে হাসপাতালের দালাল, সিরিয়াল পাওয়ার জন্য ঘুসের ভোগান্তি এবং বাইরে থেকে ওষুধ কেনার বাড়তি খরচ।— জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুস্তাক হোসেন তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। টাঙ্গাইলে দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির যে পাইলট প্রজেক্টটি হয়েছিল, বছরের পর বছর পার হলেও তা দেশব্যাপী বিস্তৃত করা যায়নি। এবারের বাজেটে আমরা দেখতে চেয়েছিলাম তৃণমূলের দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ও তার বাস্তবায়ন রূপরেখা। আরও পড়ুন বিদেশি বিনিয়োগ আনলে দেড় শতাংশ কমিশন দেওয়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবার সংকট তুলে ধরে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, একটি ডায়ালাইসিস ফিল্টারে হয়তো ৮০০ টাকা কমবে, কিন্তু রোগীকে যদি সেই ডায়ালাইসিস করতে গ্রাম থেকে দূর-দূরান্তের শহরে আসতে হয়, তবে তার যাতায়াত ভাড়ায় চলে যাবে কয়েক হাজার টাকা। এর ওপর রয়েছে হাসপাতালের দালাল, সিরিয়াল পাওয়ার জন্য ঘুসের ভোগান্তি এবং বাইরে থেকে ওষুধ কেনার বাড়তি খরচ। ফলে এই কর ছাড়ের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাবে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। এসময় তিনি গ্রামীণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ক্যানসার বা কিডনি রোগ যাতে জটিল রূপ না নেয়, সেজন্য উপজেলা পর্যায় বা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেই প্রাথমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন— কমিউনিটি ক্লিনিকে যদি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ‘ক্রিয়েটিনিন’ চটজলদি দেখে নেওয়া যায়, তবে একজন মানুষ শুরুতেই জানতে পারবেন তার কিডনিতে সমস্যা হচ্ছে কি না। সে অনুযায়ী তিনি সাবধান হবেন এবং উপজেলা হাসপাতালে গিয়ে শুরুতেই চিকিৎসা নিতে পারবেন। বড় বড় যন্ত্রপাতি আমদানির সুবিধা কেবল আমদানিকারক ও শহরের হাসপাতালগুলোর ব্যবসায়িক লাভ বাড়াবে, যদি না আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে পারি। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে এই বাজেটের বড় বড় কর ছাড়ের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। এসইউজে/কেএসআর
Go to News Site