Jagonews24
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল না খেললেও সমর্থকদের উন্মাদনা লাল-সবুজের দেশের পুরোনো ঐতিহ্য। প্রিয় দলকে সমর্থন দিতে অনেকের নানা আয়োজন পাগলামির পর্যায়ে চলে যায়। ফুটবল বিশ্বের দুই জনপ্রিয় দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকে বিভক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। ভিনদেশের জন্য বাংলাদেশের দর্শকদের এই সমর্থন ও ভালোবাসার খবর প্রকাশিত অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সেই সুবাদে বাংলাদেশের পাগল সমর্থকদের কথা পৌঁছে গেছে মেসি-নেইমারদের কানেও। সেই আবেগ, উদ্দীপনা এবং উন্মাদনার ছন্দে কোথায় যেন পতন এবার। ২০২২ সালে কাতারে হওয়া বিশ্বকাপ ও আর একদিন পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের তুলনা করলে বড় একটা পার্থক্য চোখে পড়বে সবার। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ এবং আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙের পতাকায় ছেয়ে যায় যে রাজধানী, সেই শহরে কোথায় যেন উম্মাদনার খামতি । পতাকা-ব্যানারের প্রতিযোগিতা নেই, নেই চেনা সেই মিছিল-শোভাযাত্রা। তবে অনেক গ্রাম অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপ উন্মাদনার খবর আসছে। জমি বিক্রি করে প্রিয় দলের সমর্থনে বিশাল পতাকা তৈরির খবর এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে। তারপরও গত কয়েকটি বিশ্বকাপের সাথে তুলনা করলে এবার উম্মাদনার ছন্দপতন চোখে পড়বেই। ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের খেলা। দেশের ফুটবল দিন দিন তলানিতে নামলেও বিশ্বকাপ আসলে বোঝাই যায় না ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০০ এর কাছাকাছি। আমরা যদি কাতার বিশ্বকাপের সময়ের কথাগুলো স্মৃতিপটে ফিরিয়ে আনি, তাহলে চোখে ভেসে উঠবে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের এক অবিস্মরণীয় উৎসবের দৃশ্য। রাস্তায়-রাস্তায়, বিল্ডিংয়ের ছাদে আর গাছের মগডালে পতাকা, ব্যানার এবং টিভির সামনে রাত জেগে বিশ্বকাপ উদযাপন। শহরের উচ্ছ্বাসের ঢেউ যেমন ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম-গঞ্জে, তেমন গ্রামের উল্লাসও চলে পাল্লা দিয়ে। কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা রোমাঞ্চ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো আয়োজিত বিশ্বকাপে সেই আগের মতো উন্মাদনার তীব্রতা নেই। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। পতাকা-ব্যানারের প্রতিযোগিতা কম, রাস্তায় উৎসব অনেকটা ম্লান। কেন এই ভাটা? বিভিন্ন পেশা ও মতের মানুষদের সাথে আলোচনা করে বোঝা গেছে, এবার উন্মাদনার বড় একটা ধাক্কা ছিল সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা। মাত্র দুই-তিনদিন আগে এ দেশের ফুটবলপাগল মানুষ নিশ্চিত হয়েছেন, তারা টেলিভিশনে খেলা দেখতে পারবেন। তারপর থেকে আমেজ একটু একটু বাড়তে শুরু করেছে। তবে সেটা আগের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় এখনো অনেক কম। বিশ্বকাপ শুরু হলে এই আমেজটা কোথায় দাঁড়ায়, সেটা সময়ের জন্যই অপেক্ষায় থাকতে হবে। আরেকটা বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক চাপ। অনেকে আবার এটাকেই সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করেন। দেশের অর্থনীতি সংকটে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি মিলিয়ে দেশে দারিদ্রতা বেড়েছে। মানুষের কাছে অতিরিক্ত খরচের টাকা কমে গেছে। অনেকের কাছেই এখন পতাকা-ব্যানার ও জার্সি কিনে এবং জমায়েত হয়ে বিশ্বকাপ উদযাপন স্রেফ বিলাসিতা। বিশ্বকাপ ঘিরে যে সব জায়গা জমে উঠে দারুণভাবে তার অন্যতম, টিএসসি। এখনো তেমন কোনো বড় আয়োজন চোখে পড়েনি সেখানে। ম্যাচের সময়টা দর্শকদের জন্য বড় একটা ফ্যাক্টর। বিশ্বকাপের এবারের আসর উত্তর আমেরিকায়। যে কারণে ম্যাচ যেমন আছে গভীর রাতে, তেমন আছে সকাল সকালেও। শিক্ষালয়ে গমনকারী ছাত্র-ছাত্রী এবং অফিস গমনকারী মানুষের পক্ষে সকালের অনেক খেলাই দেখা সম্ভব নয়। কাজের ফাঁকে মুঠোফোন দিয়ে খেলার আপডেট নেওয়ার ওপরই নির্ভর হয়ে পড়বেন অনেকে। দেশের রাজনৈতিক একটা প্রেক্ষাপট আছে, যেটাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মানুষের মনোযোগ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, চাকরিতেই বেশি। ফুটবল উৎসবের চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটাই প্রাধান্য পাচ্ছে অনেকের কাছে। আরেকটা কারণ, সেভাবে তারকা উঠে না আসা। ৪৮ দলের বড় টুর্নামেন্ট হলেও নির্দিষ্ট কোনো ‘মেসি ম্যাজিক’ বা একক তারকার আকর্ষণ এখনো ততটা তৈরি হয়নি। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকরা উৎসাহী থাকলেও সামগ্রিকভাবে দুই দলেরই হাইপ কম। সেটার বড় কারণ হতে পারে, গত বিশ্বকাপে মেসির হাতে শিরোপা উঠে যাওয়া। এবার আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে তাই হারানোর কিছু নেই। বিশ্বকাপ জিততেই হবে, সেই অপার আকাঙ্ক্ষাও গেছে কমে। অন্যদিকে ব্রাজিলেরও নেইমারের মতো তারকা ইনজুরিতে থাকায় আর ব্রাজিল দলের সাম্প্রতিক ফর্ম আশা জাগানিয়া না হওয়াতে এই দলের সমর্থকরাও তেমন আশাবাদী নন। মূলত বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের হাইপ এই দুই দল ঘিরেই। সেখানে একটু ভাটার টান পড়েছে এবার। তবে উন্মাদনার এই ভাটাকে নেতিবাচক হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। অনেক স্থানে দর্শকদের বিশ্বকাপ দেখার প্রস্তুতি নিয়ে ইতিবাচক খবরও আছে। পুরনো ঢাকাসহ কিছু জায়গায় প্রিয় ফুটবলাদের ম্যুরালসহ জার্সিপড়া মানুষও চোখে পড়ে। ফুটবলের নানা বয়সের সমর্থক থাকে। তবে উন্মাদনা তৈরি করে মূলত তরুণরাই। সেই তরুণরা এখন ফুটবল মাঠ বিমুখ। এমন কি অলিগলিতে ভাগ হয়েও সেভাবে ফুটবল খেলতে দেখা যায় না তরুণদের। ফুটবলের সাথে তরুণদের খেলার সম্পর্ক উম্মাদনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এই প্রজন্মের তরুণরা মোবাইলেই বেশি আসক্ত। এক সময় ছিল যখন একটি টিভির সামনে অনেক দর্শক জড়ো হতেন। এখন তো এক বাসাতেই আছে একাধিক টিভি। আর সবার হাতে স্মার্ট মোবাইলতো আছেই। খেলা দেখা নিয়ে ঘরের মধ্যেই যে নানা আয়োজন থাকতো, সেটা আর দেখা যায় না। এক বাসায় চারজন সদস্য থাকলে দেখা যায় একেকজন একেক রুমে খেলা দেখছেন। আনন্দ, তর্ক-বিতর্ক কমে যাওয়াও উৎসবে ভাটা পড়ার একটি কারণ। বিশ্বকাপের উন্মাদনা এখন মোবাইলের স্ক্রিনেই অনেকটা আটকে গেছে। মাঠে গিয়ে, রাস্তায় নেমে উৎসব না করে অনেকেই মোবাইলে রিলস বানাচ্ছেন, স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নানা ধরনের ছবি বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাড়ছেন। মিছিল-পাল্টা মিছিলের জায়গাটা এখন যেন দখল করে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা রিলস আর স্ট্যাটাসে। তাই তো টিনের চালে বা গাছের ডালে বিশ্বকাপের আমেজ চোখে না পড়লেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ শারীরিক সমাবেশের পরিবর্তে ভার্চুয়াল উদযাপন। লাইভ রিয়্যাকশন, রিলস বানানোই হয়ে উঠেছে মূল উদযাপন। ফলে রাস্তার সেই বড় সমাবেশ কমে গেছে। বাংলাদেশের যুবসমাজে স্মার্টফোন আসক্তি অতি উঁচুতে। স্মার্টফোনে আসক্ত তরুণদের শারীরিকভাবে সক্রিয়তা কম। তারা সাধারণত, বেশি ঘরকেন্দ্রিক। আউটডোরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় খেলা ফুটবলের সব উদযাপন যেন ইনডোরে বন্দী হয়ে যাচ্ছে। তাই বলাই যায়, তরুণদের মোবাইল আসক্তি অবশ্যই উন্মাদনায় ভাটার একটা কারণ। এটা শুধু ফুটবল নয়, সামগ্রিক সামাজিক জীবনের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। উপসংহারে এটাই বলবো, ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। এখনো আছে। প্রকাশের ধরণটা হয়তো বদলেছে। কিছু কারণে এবার উম্মাদনায় একটু ঘাটতি আছে ঠিকই। তবে ফুটবল তো বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে। অনেক সময় জীবনের কঠিন কাস্তবতা চেপে ধরলে উৎসবের রঙ ফিকে হওয়াটা স্বাভাবিক। হয়তো এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশে উৎসবের রঙ সে কারণেই কিছুটা ফিকে। তবে ফুটবল মানুষের হৃদয়ে লেগে আছে। থাকবেই। আর খেলা মাঠে গড়ানোর পর দৃশ্যপট বদলাতেও সময় লাগবে না হয়তো। আরআই/এমএমআর
Go to News Site